মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

ঝুপ করে কেমন শহরের বুকে নেমে এল একটা আস্ত ডিসেম্বর! সেই সঙ্গে বিকেল গড়ালে একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, ভোরবেলা কম্বল। না, ফলের বাজার উথালপাথাল করলেও কমলালেবুর সেই মনমাতানো গন্ধ নেই। ময়দানে ক্রিকেট আছে, ব্যাডমিন্টন নেই। চিড়িয়াখানায় শহরতলির উপচে পড়া ভিড় নেই। আহা, তবু তো ডিসেম্বর। বছর শেষের মাস। উৎসবের মাস। এ মাসে কলকাতাকে মায়াবী লাগে বড়ো। শহরের আনাচে কানাচে লেগে থাকা ইতিহাস কথা বলে ওঠে। সে রকমই কিছু ইতিহাস পাঠকদের সামনে সাজিয়ে রাখার কথা ভাবছে খবর অনলাইন। শহর চেনার এই তো সময়। আসুন, বেরিয়ে পড়ি।

প্রথম গন্তব্য সেন্ট জন’স চার্চ

রাজভবনের পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই গির্জা। ঠিকানা ২/২ কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০০১। বয়স ২৩০ বছর। শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব এই জমি দান করেছিলেন ইংরেজদের। সেন্ট জন’স চার্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন গভর্নর জেনেরাল ওয়ারেন হেস্টিংস। সালটা ১৭৮৪। গির্জা তৈরির কাজ শেষ হলে ১৭৮৭ সালে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। লন্ডনের ‘সেন্ট মার্টিন ইন দ্য ফিল্ডস’ চার্চের আদলে তৈরি করা হয় এই গির্জা। স্থপতি ছিলেন ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর জেমস আগ।


গির্জার মাথায় ১৭৪ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা ঘড়িটা সোয়া দুশো বছর ধরে কালের হিসেব রেখে চলেছে অনবরত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থেকে সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এসেছে ভারত। এক সময় এসেছে স্বাধীনতা। নেই নেই করে বছর দশেক হল, সিনিয়র সিটিজেনের তকমা লেগেছে তার গায়েও। ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে একটু একটু করে বুড়ো হয়েছে সেই ঘড়ি। মূলত ইট আর পাথর দিয়ে তৈরি সেন্ট জন’স কলকাতার তৃতীয় প্রাচীন গির্জা। আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন? গির্জা তৈরির কাজে ব্যবহৃত পাথর এসেছে কোথা থেকে? মধ্যযুগের গৌড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে। এক ইতিহাসের ফসিল থেকে আরেক ইতিহাসের জন্ম।


গির্জার ভেতরে ঢুকে সারি সারি চেয়ার পেরিয়ে একদম সামনে চলে গেলে চোখে পড়বে এক মস্ত বড় পাইপ অর্গান। উনিশ শতকের প্রথম দিকের কোনো এক সময়কার (খুব সম্ভবত ১৮২৪-২৬-এর মধ্যে)। কলকাতা শহরে এর চেয়ে পুরোনো পাইপ অর্গান এখন রয়েছে কি না, জানা নেই। ডান দিকে রাখা পিয়ানোটি এখনকার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই সেখানে হাত চলে গেছে জনি পূর্তি-র। রোজ নতুন নতুন সুর তুলছেন পিয়ানোয়। সেই কবে থেকে দেখে আসছি। শেষ যে দিন গেলাম, ওঁর আঙুলের ছোঁয়ায় তখন প্রাণ পেয়েছে ফ্রান্সিস লাই-এর ‘লাভ স্টোরি’-র সুর।


হলের বাঁ দিকে দেওয়াল জুড়ে রয়েছে ‘দ্য লাস্ট সাপার’, জার্মান শিল্পী জোহান জোফানির আঁকা। না, দ্য ভিঞ্চির ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সে ছবির নকল নয় এটি। মজার ব্যাপার, যিশু এবং তাঁর ১২ জন শিষ্যের মুখ কিন্তু আঁকা হয়েছে কলকাতার তৎকালীন প্রভাবশালী মানুষের মুখের আদলে। ছবির মাঝে যিশু বলে ভুল করবেন যাকে, ওটি আসলে গ্রিক ফাদার পার্থেনিও। যিশুর একেবারে পাশে যিনি, জন হতে পারেন, মেরিও হতে পারেন। সে সময়কার এক পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের আদলে আঁকা সেই মুখ।


গির্জা চত্বরে রয়েছে বেশ কিছু সমাধি। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জব চার্নকের নাম। উহু, জব নয়, জোব চার্নক। বাঙালির ভুল শুধরোতে শুধরোতে ফেলুদা ক্লান্ত। সে যাই হোক, জোবাস চার্নক কলকাতা এসেছিলেন ১৬৯০-এর মার্চ মাস নাগাদ। কলিকাতা, সুতানটি আর গোবিন্দপুর এই তিনটি গ্রাম তাঁরই আবিষ্কার। ইতিহাসের পাতায় তখন থেকেই ঢুকে পড়ল কলকাতা। এই জোব চার্নকের মৃত্যুর সালটা নিয়ে মতান্তর রয়েছে। ১৬৯২ থেকে ৯৩-এর মধ্যে কোনো এক সময়ে মৃত্যু হয় তাঁর। কলকাতার আবিষ্কর্তা কিন্তু ৩২০ বছর ধরে ঘুমিয়ে রয়েছেন কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটের বুকেই। সেন্ট জন’স চার্চের চত্বরেই। কী হল, গোলমেলে ঠেকছে কোথাও? হিসেবটা ঠিক…। তাই তো! গির্জা ২৩০ বছরের পুরোনো, এ দিকে জোবের সমাধি ৩২০ বছরের। কী ভাবে সম্ভব? ভালো খেয়াল করেছেন তো। একটা কথা বলাই হয়নি। গির্জা হয়েছে অনেক পরে, তার আগে ওই অঞ্চল ছিল ইংরেজদের সমাধিস্থল। আরও অনেক ইতিহাস কিন্তু না বলা থাকল আজ। খুঁজে নিন না। বিপ্লব স্পন্দিত রক্তে নিজেকে লেনিন ভাবার মাস পেরোল সদ্য। এই মাসটায় না হয় চার্নক হয়ে উঠুন।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here