মনের মাঝে হৃদিপদ্মে ডাক দিয়ে যায় যে সকাল

0
164

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

শীতের পরশ নিয়ে আসে আমাদের প্রেমের দিন, সরস্বতী পুজো। কানে কানে কয়ে যায় এই তো বসন্ত এল বলে। আসলে এই পুজো যে বসন্তপঞ্চমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। তাই আকাশে-বাতাসে এক মধুর ধ্বনি গুঞ্জরিত হয়। মাতাল বসন্ত মনমাঝের হৃদিপদ্মকে জাগিয়ে তোলে।

এক দিনের জন্য বড়ো হওয়ার পাসপোর্ট জুটত কপালে। বাগদেবীর বাহনের মতো প্যাকপ্যাক করতে করতে বেরিয়ে পড়া। পরিপাটি শাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে এলোমেলো। তারই ফাঁকে আঁচলটিকে সামলে রাখা। পাড়ার ক্লাবে পুজোর সময় হাতে গুঁজে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া সেই পাঞ্জাবি আজ মনকে বড় ভাবায়। ভিজে ভিজে সেই ভাঁজ করা কাগজটি ভয়ে-যত্নে রাখা ছিল গীতবিতানের মধ্যে। আর আজ! আজ খুঁজে মরি পাতায় পাতায়। আজ আর শীত পড়ে না। এখন আর কাঁপন আসে না। আজ খুঁজে ফেরা সেই রাগিণী, যা ফিরিয়ে দেবে সেই পাঁচালির সুর‑ ‘প্রণাম করিনু আমি সেই সরস্বতীরে/পূজা যার করেছিল সব দেবাসুরে’।

জয় জয় দেবী চরাচর সারে/যুগকুচ শোভিত…আরে না না হচ্ছে না ঠিক করে বলুন। অহো, এক গাল হেসে এক গণ্ডূষ জল পান করে মুখুজ্জ্যেপুরুত পৈতেটাকে ঠিক করে নিয়ে আবার মন্ত্রে মন দেন জয় জয় দেবী চরাচর সারে/কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে…ততক্ষণে মুক্তাহার গলায় দুলছে রাঙাপিসির। মুখুজ্জ্যেপুরুত সেজে সে বছর বাড়িতে পুজোর দায়িত্ব পালন করতে এসেছিলেন পাশের বাড়ির ভুনোদা। শেষ মুহূর্তে পুরোহিত অক্কা পাওয়ায় এই ব্যবস্থা। পাশ করে গেল ভুনোদা। পাকাপাকি ব্যবস্থা হল এই বাড়ির পুজোর পুরোহিতের। শ্বেতবসনা রাঙাপিসিকে দেখে ভুনোদার মন্ত্র ভুল হয়ে যাচ্ছিল। পুজো পর্ব মিটিয়ে রাঙাপিসির পিছু নিল পুরুতঠাকুর ভুনোদা।

সে সব এক দিন ছিল। বাজারে টোপাকুলের গন্ধে প্রেম চাগাড় দিত উথলে ওঠা দুধের মতো। নিভৃতবাসিনী বীণাপাণিরা চৌকাঠ পার হত এই শ্রীপঞ্চমীতেই। সিগারেটের প্রথম টান হিমেল হাওয়ায় ভাসত এই মায়াময় আবহে। আজ আর গোপন থাকবে না কোনও কিছু। এসো দেবী এসো এ আলোকে। ভাবনাগুলো গুলিয়ে যায়। একটু হাতে হাত লাগা, শরীরে শিহরণ জাগা, কিংবা এক সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দিতে গিয়ে ফুলের গায়ে ফুলের ধাক্কা‑ কী রোমাঞ্চ! স্কুলের খিচুড়ি খাওয়ার পংক্তিতে পাশাপাশি বসতে পারাটা স্রেফ একটা বড়োসড়ো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। তার পর মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে যাওয়া আর মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাওয়ায় বিশেষ এক জনের সে কি ব্যাকুলতা! আহা এমন করে এখন কি কেউ আর ভাবে? কেউ আর ভালোবাসে?

হয়তো বাসে, হয়তো না। সেই রাঙাপিসি, সেই নববধূ যে দিন বুঝতে পেরেছিল শ্বশুরবাড়ির পুজোয় অঞ্জলির ফুল দিতে গিয়ে খুড়তুতো দেবরটি আঙু্ল চেপে ধরেছিল, তাতে শুধু কি লজ্জা ছিল? ছিল রাগ? নাকি সামান্য হলেও একটু অনুরাগ! কারণ সেটা আজ আর বলা যায় না। সে তো বহু দিন পার করে বহু যুগ ধরে তিলে তিলে তাকে ভালোবেসে যাওয়া, সে তো ভুল নয়।

বাড়িতে না বলে সরস্বতী পুজোয় হঠাৎ করে দূরে চলে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। সে তো বাঁশরির ডাকে কুঁড়ি ধরে শাখে। করুণ দু’খানি আঁখি কেঁদে কেঁদে বলে ওগো প্রিয়, তৃষিত এ বক্ষ পেতে রেখেছে আঁচল, এখানেই তোমার বাস। আহা এমন কথা বহু দিন শুনিনি। কিন্তু এমন কথা শোনার সময় কোথা? আজকের দিনে প্রেমের দিন উদযাপিত হয় রঙিন মোড়কে, হিরে-পান্না-চুনিতে। ঠিক করে দেওয়া প্রেমের দিন আসে হুল্লোড়-আবহে, চলে যায় দুরন্ত গতিতে। সেই যে সেই সব দিন, সরস্বতী পুজোর ভালোবাসা পূর্ণতা পেত দোলে। কথায় বলে দোলে যদি মনটাই না রঙিন হল তবে কীসের রঙ খেলা?

আজ এমন করে গাইছে আকাশ, মন কেঁপে যায় বার বার। সেই সোনায় মোড়া দিনে কোনও নামীদামি বিশেষ উপহার ছিল না। ছিল একরাশ ভয়ের সঙ্গে ভালো লাগার স্নিগ্ধতা। অপেক্ষায় দিন কাটানো, বসন্ত দ্বারে কি জাগ্রত হবে? আজ ব্যস্তসমস্ত ক্লান্ত দিনে গীতবিতানের পাতায় সেই কাগজের ছোপ মনে এঁকে দেয় আর এক গান‑ ‘আমাদের গেছে যে দিন একবারেই কি গেছে…রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here