ছেড়ে চলে গেলেও, তুমি থাকবে হৃদমাঝারেই

0

শ্রয়ণ সেন:

বছর চারেক আগের কথা। শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছি। উঠেছি সবুজবন রিসোর্টে। সন্ধ্যায় হঠাৎ করে কানে ভেসে এল লোকসংগীত। ব্যাস, নিজেকে আর ঘরে বেঁধে রাখতে পারলাম না। বাইরে এসে এক ছুট্টে চলে গেলাম শিল্পীর কাছে। দোতারা নিয়ে একমনে গেয়ে চলেছেন তিনি। এ তো ছিল চার বছর আগের কথা, যত দিন গিয়েছে তত যেন বেশি করে লোকগানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি।

এই আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের অবদান। তিনি কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তাঁর জন্যই এখন লোকসংগীতের প্রতি আমার এত ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন

শহুরে মানুষের মধ্যে মাটির গান পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে তিনি শুরু করলেন লোকগানের ব্যান্ড ‘দোহার’। কাকা অনন্ত ভট্টাচার্যের জন্যই লোকগানে আসা কালিকার। ‘লোক বিচিত্রা’ নামে তাঁর একটি গানের দল ছিল।

১৯৮৬ সালে মাধ্যমিক পাশ করে শিলচরের জিসি কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন কালিকা। কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য চলে আসেন কলকাতায়। সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৮ সালে হঠাৎ করেই কাকা মারা যান।  কাকার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিছু একটা করার কথা ভাবলেন। ১৯৯৯ সালে ৭ আগস্ট যাত্রা শুরু করল তাঁর ব্যান্ড। ‘দোহার’ নামটা দিলেন কালিকাপ্রসাদের শিক্ষক অভীক মজুমদার।

বাংলায় তখন ‘ব্যান্ড’ যুগ শুরু হচ্ছে। মূলত রক গানের ব্যান্ডের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়েই ছিল ‘দোহার’। শহুরে মানুষ তখন রক গানে মেতে, লোকগানের প্রতি তাদের টান তখনও সে ভাবে তৈরি হয়নি।

কালিকা কিন্তু না দমে ‘দোহার’ নিয়েই এগিয়ে গেলেন নতুন উদ্যমে। ধীরে ধীরে পরিচিতি পেতে শুরু করল ‘দোহার’। উত্তর-পূর্ব তথা গোটা বাংলার বাউল-ভাটিয়ালি-চটকা-ঝুমুর-সারিগান-বিহু-সব গানই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এনেছে ‘দোহার’। লোকগানের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করল মানুষ, বলতে দ্বিধা নেই, তার মধ্যে আমিও রয়েছি।

লোকগানকে জনপ্রিয় করার পেছনে বছর দুয়েক হল এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে জি বাংলার ‘সারেগামাপা’। এই মঞ্চে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল এই মানুষটির। গত বছর, তাঁর পথপ্রদর্শনেই লোকশিল্পী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছিলেন মালদার ঋষি বা বারাসতের তীর্থ। এ বারও তো ব্যাপারটা একইরকম ছিল। শান্তিনিকেতনের পৌষালি হোক বা ময়নাগুড়ির উর্মি, সবার পেছনেই ছিল কালিকাপ্রসাদের আশীর্বাদী হাত।

কিছু দিন আগেই কালিকা গিয়েছিলেন গুয়াহাটি। সেখানে মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের ফাঁকে নিজের এবং দোহার সম্পর্কে নানা কথা বলেন কালিকা। কালিকা বলেছিলেন, “আমি বড় হয়েছি দূরবীন শাহ, হাসন রাজা, লালন ফকির, আব্বাসউদ্দিনের গান শুনে।”

শুধুমাত্র দেশীয় বাদ্যযন্ত্র দিয়ে ব্যান্ড তৈরি করা সম্ভব, সে ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল তাঁকে। এখন দেখা যাচ্ছে ঢোল, তবলা, কাঁসা, সারিন্দা, এই সব দেশীয় বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তৈরি ব্যান্ডটিই এখন মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছে।

‘কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যরেই মাঝার’ — হাসন রাজার এই বিখ্যাত গানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল কালিকার কণ্ঠে। তিনি তো একটা ঘরই তো বানানোর স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন ১৯৯৯ সালে। লোকসংগীতের ঘর। যেখানে মানুষ রক গানের পাশাপাশি আগ্রহ দেখাবেন বাংলার মাটির গানের প্রতিও। সেই ঘর তৈরি অনেকটা হয়েও গিয়েছিল। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই চলে গেলেন তিনি।      

ওম পুরীর মৃত্যুর পর শাহরুখ খান বলেছিলেন ‘ঈশ্বরের বাগানটি খুব সুন্দর, উনি শ্রেষ্ঠ ফুলকে নিজের কাছে টেনে নেন’। শাহরুখের কথার সঙ্গে একমত না হয়ে থাকতে পারছি না। বাংলার সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুলটি হঠাৎ করে খসে পড়ে গেল।

কালিকার কণ্ঠে আর শোনা যাবে না শাহ আব্দুল করিমের লেখা ‘গ্রামেরই নৌজওয়ান/হিন্দু মুসলমান’। শোনা যাবে না ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ বা ‘জলে না জিইয়ো, কলঙ্কিনী রাধা’। যে কণ্ঠে গানগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সেই কণ্ঠটাই তো হারিয়ে গেল চিরকালের মতো।

তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবে চিরকাল।

(তথ্য সহায়তা: অরূপ চক্রবর্তী, গুয়াহাটি)

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here