১০০ কোটির মানহানি মামলা ও স্বাধীন গণমাধ্য‌মের ভূমিকা

0
6964
the wire
saibal biswas
শৈবাল বিশ্বাস

বহু সাংবাদিক এবং গণমাধ্য‌ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্য‌ক্তি মনে করেন সংবাদের জগত এখন পুরোপুরি  কর্পোরেট-শাসিত। অর্থাৎ পুঁজির দাক্ষিণ্য‌ ছাড়া গণমাধ্য‌ম প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফলে সেই কর্পোরেট সংস্থাটির মালিকের স্বার্থের সঙ্গে তথ্য‌ চয়ন ও তথ্য‌ পরিবেশন অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

এই পরিবেশ থেকে ভিন্ন পথে যাত্রা করার জন্য‌ই স্বাধীন গণমাধ্য‌ম বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া ভাবনাটির জন্ম। এই মুহূর্তে দেশে এই ভাবনার বহু সংবাদমাধ্য‌ম রয়েছে তার মধ্য‌ে ট্রাস্ট ও সমবায়চালিত গোটা কয়েক প্রিন্ট মিডিয়া বাদ দিলে বাকিটা অর্থাৎ বেশির ভাগ অংশটাই অনলাইন মিডিয়া। বস্তুতপক্ষে এ ধরনের মিডিয়ার ধারণাটি বাঁচিয়ে রেখেছে অনলাইন পোর্টালগুলি।

সম্প্রতি এই ধরনের একটি অনলাইন পোর্টাল দ্য ওয়্য‌ারের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর পুত্র জয় শাহ। উপলক্ষ, দ্য ওয়্য‌ার-এ প্রকাশিত রোহিনী সিংয়ের একটি প্রবন্ধ, যাতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, জয় শাহ মাত্র দু’ বছরে ১৬ হাজার গুণ ব্য‌বসা বাড়ালেন কী ভাবে?

স্বাধীন গণমাধ্য‌ম বলেই তিনি এই প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেলেন আর স্বাধীন গণমাধ্য‌ম বলেই অন্য‌ ভাবে শায়েস্তা করা যাবে না ধরে নিয়ে সরাসরি মানহানি মামলার পথে চলে গেলেন বিজেপি নেতৃত্ব।

বলা বাহুল্য‌, স্বাধীন গণমাধ্য‌ম বলেই তিনি এই প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেলেন আর স্বাধীন গণমাধ্য‌ম বলেই অন্য‌ ভাবে শায়েস্তা করা যাবে না ধরে নিয়ে সরাসরি মানহানি মামলার পথে চলে গেলেন বিজেপি নেতৃত্ব। এর আগে ইকনমিক অ্য‌ান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় নরেন্দ্র মোদী-ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি গৌতম আদানির ব্য‌বসা বৃদ্ধি নিয়ে লেখা প্রকাশ করেছিলেন পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা। তাঁর চাকরি চলে যায়। দ্য ওয়্য‌ারের সাম্প্রতিক প্রবন্ধটির লেখিকা রোহিনীর জীবনেও এমন ঘটনা ঘটেছে। দ্য ওয়্য‌ার-এ তিনি সম্প্রতি লেখালেখি শুরু করেছেন। এর আগে তিনি ছিলেন ইকনমিক টাইমসের লখনউ প্রতিবেদক। অখিলেশ যাদবের হয়ে নির্বাচনের আগে তিনি একের পর এক লেখা লিখে গেছেন যার সারবস্তু জেনে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব স্বয়ং। কোনো এক অজানা কারণে রোহিনীকে ইকনমিক টাইমস ছাড়তে হয়। অনেকে বলেন, ইকনমিক টাইমস আয়োজিত গ্লোবাল বিজনেস সামিটে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী অস্বীকার করেছিলেন। নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এই অজুহাতে তিনি যাননি। হয়তো বা কর্তৃপক্ষর কাছে তাঁর না যাওয়ার অন্য‌ রকম মানে বেরিয়েছিল। সাবধানী মালিকপক্ষ হয়তো তারই জেরে কিছু ‘সাহসী’ পদক্ষেপ করেছিল।

 আরও পড়ুন: অমিত-পুত্রের খবর ফাঁস করে সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনস্থার শিকার সাংবাদিক, অভিযোগ

দ্য ওয়্য‌ারের তো তেমন পিছুটান নেই। আসলে কর্পোরেট গণমাধ্য‌মের কয়েক জন উচ্চপদস্থ সাংবাদিক মিলে নিছক বিবেকের টানে এই প্রতিষ্ঠানটি করেছেন। এর সম্পাদক তিনজন — দ্য হিন্দু’র প্রাক্তন সম্পাদক সিদ্ধার্থ বরদারাজন, মুম্বইয়ের ডিএনএ পত্রিকার অন্য‌তম সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভাটিয়া ও ইকনমিক টাইমস, দ্য হিন্দুর নিয়মিত লেখক-তালিকায় থাকা প্রখ্য‌াত অথর্নীতি বিশেষজ্ঞ এম কে বেণু। দ্য ওয়্য‌ারে পোর্টালটি পরিচালনা করে ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিজম (এফআইএস) নামে একটি সংস্থা। আর এর পিছনে আর্থিক হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্য‌ান্ড পাবলিক স্পিরিটেড মিডিয়া ফাইন্ডেশন বা(আইপিএসএমএফ)। তবে দ্বিতীয় সংস্থাটি দ্য ওয়্য‌ার-এ প্রকাশিত সংবাদের কোনো আইনি দায়িত্ব নেবে না তা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে, উচ্চ পদে থাকা বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ থাকা কয়েক জন সাংবাদিক কর্পোরেট জার্নালিজমের ওপর বিরক্ত হয়ে নিজেদের উদ্য‌োগে এই গণমাধ্য‌মটির জন্ম দিয়েছেন। কাজেই ভয় বা প্রলোভনে একে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

তাই কি বিচারব্য‌বস্থাকে কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা? আগামী দিনে রাষ্ট্র কি এই পথেই স্বাধীন গণমাধ্য‌মের ‘সেবা’ করবে? প্রশ্নগুলো সহজ, তবে উত্তর অজানা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here