ক্যানসারের লড়াই জিতে এখন রং-তুলি-মাটি নিয়ে মগ্ন আঠারোর অর্পণ

0
1294
পাপিয়া মিত্র

বলে  কী ছেলেটা? ওই মারণরোগের জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে? মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছেশক্তিকে স্রেফ তুড়ি মেরে, কেমোথেরাপির পর্ব শেষ করে সে এখন ব্যস্ত রং-তুলি আর মূর্তি তৈরির কাজে।

সে এক পড়ুয়া, সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা আঠারোর যুবক, অর্পণ সর্দার। খড়িবেড়িয়ার বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ স্কুল থেকে পাশ করেছে কলাবিদ্যা নিয়ে। আসলে এই বয়সটা বড়ো সাংঘাতিক। কঠিন পথে হাঁটার স্বপ্ন দেখায় জীবনকে। নবম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ, মাঝে এক বছর রোগের সঙ্গে লড়াই। এলাকার আর পাঁচটা ছেলের মতো এগিয়ে যাচ্ছিল জীবন। কিন্তু বাধ সাধল জ্বর-বমি আর বুকে ব্যথা। রিপোর্টে ধরা পড়ল রক্তে ক্যানসার। চলল দীর্ঘ লড়াই।

বয়স আঠারো, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলার স্বপ্ন দেখতে জানে, দেখাতে জানে। তাই নিজের চিকিৎসার দায়িত্ব নিজে নিয়েছে একটু অন্য ভাবে। এ বারে পুজোতে তিনটে দুর্গাঠাকুর তৈরি করে ফেলেছে অর্পণ, একটি সাড়ে চার ফুট, একটি দু’ফুট ও একটি এক ফুটের। একটি বিক্রি হয়ে গিয়েছে কলকাতার রোটারি ক্লাবের কাছে। দিনের অন্য সময় মন দেয় রং-তুলিতে। নবম শ্রেণিতে পড়া বোনের দেখভালেও ভুল হয় না তার। কিন্তু এ সবের আগে তো একটা হারিয়ে যেতে বসা জীবন এসে পড়েছিল অর্পণের? চশমার আড়ালে কি চোখটা একটু চিকচিক করে উঠল?

বিজ্ঞাপন

‘২০১২ থেকে ২০১৭-র মাঝের দশ মাসে আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। এই সময় আমার মা, স্কুলের মাস্টারমশাইরা, হাসপাতালের আন্টি-আঙ্কেলরা না থাকলে আমি নিজেকে এই ভাবে খুঁজে পেতাম না’ অনেক কথার মধ্যে এটাই অর্পণের বোধ। অর্পণের মা জয়ন্তী সর্দারের কথায়, “ছেলে নিয়ে তখন দিশেহারা অবস্থা। সম্বল বলতে শ্বশুরের ভিটেখানি আর জমি জায়গা। বিক্রি করলাম গরু, ধানিজমি। চিকিৎসার জন্য তা এক মাসেই শেষ। ছেলের বাবা লোকের বাড়ি মালির কাজ করেন। বাড়িতে তখন ছোটোমেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি। এই অবস্থায় অর্পণের স্কুল না থাকলে ছেলেকে সুস্থ করে ফিরিয়ে আনতে পারতাম না।

স্কুলকে পাশে পেয়েছেন মা ও অর্পণ। কী বলছেন মাস্টারমশাইরা? প্রধানশিক্ষক অপূর্ব কর্মকার জানালেন, প্রথমে খবরটা শুনে খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। এর আগে যখন অন্য কোনো সমস্যা এসেছে নিজেরা সামলে নিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রথম ছাত্র-শিক্ষক মিলে ওর পাশে দাঁড়ালেন। যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তাতেও বেশি দিন টানা যাবে না দেখে প্রসাশনের দ্বারস্থ হন। সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এ দেখা করতে গেলে মনখারাপ নিয়ে ফিরে আসতেন। পরে হাসপাতাল যে ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সত্যি সকলে কৃতজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের আর্ট বিভাগের সাহায্যে ও আবার আঁকতে শুরু করল। আর একটা আঁকার অনুষ্ঠানের পরে শিল্পী সমীর আইচ খুব প্রশংসা করেন একটি ইংরেজি দৈনিকে। সেখান থেকে ওর মনের জোর বেড়ে যায়।

ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে যাওয়ার আগে দু’টো হাসপাতাল ঘুরে ফেলেছিল সে। অসম এক লড়াইয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্থ অর্পণকে এক সন্ধ্যায় পেলেন হাসপাতালের চিকিৎসক সোমা দে। তিনি বললেন, “এই রোগে চিকিৎসার পাশাপাশি, অর্থনৈতিক সমস্যা একটা বড় ভূমিকা নেয়। থাকে মানসিক চ্যালেঞ্জও। প্রথম দিকে অর্পণ খুব মনমরা হয়ে থাকত। ভাবত স্কুলে যেতে পারবে না, পরীক্ষা দিতে আর পারবে না। কেমোথেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি রোগীকে অবসাদ ঘিরে ফেলে। তাই তখন মনের প্রফুল্লতার বিশেষ প্রয়োজন।”

সেই সময় হাসপাতালের আর্ট থেরাপিস্ট পাপড়ি সাহা পাশে দাঁড়ান। কবিতা-গান-আঁকার মাধ্যমে ওকে অন্যমনস্ক রাখার চেষ্টা চলত। সেখান থেকে দেখা গেল অর্পণ খুব ভালো আঁকছে। ২০১৩-তে একটি ধ্যানরত বুদ্ধের ছবি দিল্লিতে দু’ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। এতে ও মনের জোর পায়, আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। রোজগারের টাকায় চিকিৎসা ও নিজেদের লেখাপড়া চলতে থাকে। দশ মাস হাসপাতালের বেডে থেকে সুস্থ হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। ইতিমধ্যে কেমোর কোর্স শেষ করে কম্পিউটর নিয়ে কোর্স করছে। আর্ট কলেজে পড়ার শখটাকে জিইয়ে রেখেছে আপাতত সামনের বছরের জন্য। একটুর জন্য এ বছর হাতছাড়া হয়েছে সুযোগ।

ছেলেবেলায় পাড়ায় মূর্তি গড়া দেখে চিন্তা এলেও সে ভাবে গড়া হয়ে ওঠেনি। মূর্তি গড়ার চিন্তাটা উসকে দিল হাসপাতাল। পাপড়িদেবী ও সোমাদেবীর কথায় অর্পণ নানা মূর্তি গড়তে শুরু করেন। পাশাপাশি সোমাদেবী শক্ত করে ওর হাতটাও ধরে রেখেছেন। নানা পরামর্শ এবং মূর্তি বিক্রির জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ক্যানসার সারভাইভার-পরিবারকে মনে রাখতে হবে পড়াশোনাতে সবাই ভালো হয় না। ভালোবেসে ওরা যে কাজটা করবে সেখানেই ওদের আনন্দ। আর এই আনন্দই সুস্থ হয়ে ওঠার মূলমন্ত্র। তাই অর্পণ নিজের পরিবারের সঙ্গে হাসপাতালের আরও এক মাকে ও অন্য আন্টি-আংকেলদের (চিকিৎসক সোমা দে) এক আসনেই বসাতে চায়।

ইচ্ছে গান শোনা, আর্ট কলেজে পড়া। কিন্তু সিস্টেম নেই শোনার। মোবাইলও একটা সেটা, কখনও মায়ের কাছে কখনও নিজের কাছে। কেমোর লড়াই জিতে আগামী লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষায় অর্পণ।

অর্পণের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ: দক্ষিণ ২৪ পরগণার বৈতা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে বজবজ স্টেশন থেকে অটোতে বিড়লা মোড়। বিড়লা মোড় থেকে ডাঁশপাড়া শিবমন্দির। মোবাইল ৭৬৮৬০৫১৮৮৯

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here