বস্তার ও রাষ্ট্রযন্ত্র / ১

1
149

sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী:

কিছুদিন আগে কলকাতা লিটেরারি মিটে কানহাইয়া কুমারের বক্তব্যের সময় প্রতিবাদ জানানোর ঘটনা নিয়ে মিডিয়া উত্তাল হয়েছিল। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই আরও একবার সামনে উঠে এল একটি নাম, বস্তার। বস্তুত পক্ষে, বস্তার নিয়ে খুব বেশি চর্চা মেনস্ট্রিম মিডিয়ায় কখনোই দেখা যায় না। এ বারে কিন্তু বস্তার প্রায় বিতর্কের পটভূমির চেহারা নিল। তাতে অন্তত এইটুকু জানা গেল যে,  টাটা সংস্থা তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ নামে বস্তারে ও দেশের অন্যত্র যে ভাবে আদিবাসী বিরোধী অবস্থানে পৌঁছেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কিয়দংশই আছড়ে পড়েছিল তাঁদের আয়োজিত লিটেরারি মিটের একটি পর্বে।

কিন্তু কেন বস্তার নিয়ে প্রতিবাদ? এই প্রশ্ন ওঠা সমীচীন। কারণ বস্তারের ঘটনার খুব সামান্য অংশই আমাদের সামনে আসে। এক ধরনের মিডিয়া ব্ল্যাকআউটের ফলে বস্তারের বাসিন্দাদের উপর ঘটে চলা নিরন্তর পীড়ন সম্পর্কে তাই অনেকেই অবহিত নন। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে বস্তারে কী এমন ঘটল যার ফলস্বরূপ ব্যাহত হল লিটেরারি মিটের একটি পর্ব, যা এমনকি সরাসরি বস্তার সমস্যার সঙ্গে জড়িতও নয়। এই প্রবন্ধে আমি এই প্রশ্নেরই উত্তরে বস্তারে নিরন্তর হয়ে চলা মানবতাবিরোধী প্রক্রিয়া ও তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ গড়ে ওঠা আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত চেহারা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি।

বস্তার সম্পর্কে অনেকেরই কিছু প্রাথমিক ধারণার বাইরে বিশদে জানা নেই। এর প্রধান কারণ হল, বস্তারের খবর বহুল অংশে সেন্সর করা হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও কিছু সাংবাদিকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ বেশ কিছু ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে, যদিও, তার খেসারত হিসেবে সেই সমস্ত সাংবাদিকের কাজ প্রতিদিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাঁদের দিনের পর দিন হুমকি শুনতে হচ্ছে, এমনকি কখনও কখনও তাঁরা কিছু সময়ের জন্য নিখোঁজও হয়ে যাচ্ছেন। সমস্যার এই অংশটি নিয়ে পরের অংশে কথা বলা যাবে, তার আগে এর প্রেক্ষাপট রচনা জরুরি।


সালওয়া জুড়ুম নিষিদ্ধ হওয়ায় যে ছত্তীসগঢ়ের সমস্যার সমাধান হয়েছে তা কিন্তু নয়। বিশেষত বস্তারে বিভিন্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। অ্যামেনস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় বিভাগ সম্প্রতি এই নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন, যার নাম ‘ব্ল্যাক আউট ইন বস্তার’।


বস্তার অধুনা ছত্তীসগঢ়ের অংশ। ছত্তীসগঢ়ের অন্যান্য জেলা যেমন সুকমা, দান্তেওয়াড়া, প্রভৃতির মতোই এই জেলাটিও প্রাকৃতিক সম্পদে সম্পদশালী এবং আদিবাসীদের বাসভূমি। এবং এই প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার ও ব্যবহার নিয়েই সেই ব্রিটিশ শাসন থেকে এই জেলাগুলি বার বার অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ হয়েছে। বারে বারে আঘাত এসেছে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উপর, তাঁদের চিরাচরিত বাসস্থান থেকে তাঁদের উৎখাতের চেষ্টা, সম্পদ ব্যবহার থেকে বিরত করার চেষ্টা প্রভৃতি হয়েছে। পরবর্তীকালেও রাষ্ট্র ও বেসরকারি মুনাফাচালিত সংস্থাগুলি সম্মিলিত ভাবে এই সম্পদের ব্যবহারের প্রচেষ্টা জারি রেখেছে। এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে টাটা এই ধরনেরই একটি সংস্থা, আর তাই টাটাদের আয়োজিত লিটেরারি মিটে প্রতিবাদ হয়েছে। একই সঙ্গে এই স্থানগুলি মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা হিসাবেও চিহ্নিত হয়েছে। কাররও মতে মাওবাদীদের উদ্দেশ্য এই অঞ্চলের সম্পদের অনৈতিক নিষ্কাশন ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিপ্লব। আবার কিছু লোক মনে করেন মাওবাদীরা আদতে এই সম্পদের অংশ লাভের চেষ্টাতেই এই জেলাগুলিতে সক্রিয়। এই দ্বিতীয় মতবাদের সঙ্গে ছত্তীসগঢ় তথা ভারতের বর্তমান সরকারের মতের মিল লক্ষ্যণীয় এবং এই চিন্তারই প্রকাশ ঘটে যখন ২০০৫ সালে ছত্তীসগঢ়ে সালওয়া জুড়ুম শুরু হয়।   

salwa-judum

সালওয়া জুড়ুম যদিও মূলত দান্তেওয়াড়ায় সক্রিয় ছিল, তবুও এই বাহিনী স্থাপনের উদ্দেশ্য এবং তার কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে পরবর্তী ঘটনা পরম্পরাকে অনুধাবন করা সোজা হবে বলে মনে হয়। সালওয়া জুড়ুমের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ যে, মাওবাদী দমনের নামে তা এক ধরনের ভিজিল্যান্ট বাহিনীবিশেষ, যার পিছনে ছত্তীসগঢ় সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। ‘শান্তিস্থাপন’-এর নামে এই বাহিনী প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীদের প্রতি নানা অত্যাচার ও তাঁদের উৎখাতের চেষ্টা করেছে বলে দাবি উঠেছে। বলা হয় যে, এমনকি স্কুলছুট কিশোরের হাতে শান্তিরক্ষার নামে বন্দুক তুলে দেওয়া এই বাহিনীর কাজের অংশ ছিল। এই সমস্ত অভিযোগের সামনে দাঁড়িয়ে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট সালওয়া জুড়ুমকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে।  

সালওয়া জুড়ুম নিষিদ্ধ হওয়ায় যে ছত্তীসগঢ়ের সমস্যার সমাধান হয়েছে তা কিন্তু নয়। বিশেষত বস্তারে বিভিন্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। অ্যামেনস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় বিভাগ সম্প্রতি এই নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন যার নাম ‘ব্ল্যাক আউট ইন বস্তার’। এতে সাম্প্রতিক অতীতে বস্তারে কী ভাবে মিডিয়া ও মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত ব্যক্তিসমূহ বার বার রাষ্ট্রের কোপে পড়েছে তাঁর সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। বারে বারে আঞ্চলিক স্তরে ভিজিল্যান্ট বিভিন্ন দল গঠিত হয়েছে যেমন, সামাজিক একতা মঞ্চ বা মহিলা একতা মঞ্চ। এঁদের মধ্যে অনেকেই সালওয়া জুড়ুমের সদস্য ছিলেন বলে অ্যামেনস্টির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে এবং এঁরা প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার ভঙ্গ ও বিভিন্ন আঞ্চলিক মিডিয়া, উকিল, মানবাধিকার কর্মীদের কন্ঠরোধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিচ্ছেন, বিশেষত যারা আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁদের অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন সবার সামনে। ওই একই রিপোর্টে অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাওবাদী গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের লড়াইয়ে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আদিবাসীরাই, কারণ দু’পক্ষই আদিবাসীদের প্রতি বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার চালাচ্ছেন।

(ক্রমশ)

তথ্যসূত্র:  https://cpjc.wordpress.com/what-is-salwa-judum/

http://www.thehindu.com/news/national/Salwa-Judum-is-illegal-says-Supreme-Court/article13639702.ece

https://www.amnesty.org.in/images/uploads/articles/Chhattisgarh_Campaign_Digest.pdf

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here