বস্তার ও রাষ্ট্রযন্ত্র / ৫

0
194

সায়ন্তনী অধিকারী:

উন্নয়ন। সাম্প্রতিক কালে বহু ব্যবহৃত এই শব্দটি দেশের অন্যান্য অংশের মতোই বস্তার তথা ছত্তীসগঢ় এলাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু উন্নয়ন বলতে কি শুধুমাত্র প্রশস্ত রাজপথ, চকচকে শপিং মল, নানা রকম বাহারি গাড়ির সারি বোঝায়? বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের একটি গরিবপ্রধান দেশের ক্ষেত্রে? উন্নয়নের সঙ্গে দেশের বৃহত্তর শ্রেণির উন্নতি জড়িয়ে না থাকলে সেই  উন্নয়ন দেশের পক্ষে কতটা দরকারি? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের বোধহয় এত দিনে জানা হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের স্বার্থ সাধারণের স্বার্থের, এমনকি প্রকৃত অর্থে দেশের স্বার্থের পরিপন্থী, এবং যখনই এই দুই স্বার্থের সংঘাত ঘটে, বিভিন্ন ভাবে নিপীড়িত হন সাধারণ মানুষই। বস্তারও এই নিয়মের ব্যাতিক্রম নয়।

আরও পড়ুন: বস্তার ও রাষ্ট্রযন্ত্র / ৪

বিজ্ঞাপন

ছত্তীসগঢ় অঞ্চলটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধশালী। এ ছাড়া এই রাজ্যের বনজ সম্পদও কম না। ঐতিহাসিক কালপর্ব থেকে তা রক্ষণাবেক্ষণ ও ভোগ করার অলিখিত অধিকার রয়েছে আদিবাসীদের। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার এই অধিকারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছেন। বস্তারে আকরিক লোহা ও বক্সাইটের প্রাচুর্য রয়েছে, যা বিভিন্ন শিল্প, বিশেষত ভারী শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজন। আর তাই, বিভিন্ন প্রোজেক্টের অন্তর্গত এই মুহূর্তে বস্তার অঞ্চলের প্রায় ৫১% জায়গা। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র, খনি প্রভৃতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং খনিজ সম্পদ অপহৃত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আকরিক লোহা নিষ্কাশন কি তবে সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব? অবশ্যই নয়। কিন্তু একই ভাবে খনিজ সম্পদের সংরক্ষণও জরুরি। বেসরকারি সংস্থা যাঁরা এই অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা কি এই সংরক্ষণ এবং সঠিক মূল্যের পরিবর্তে গ্রহণের নীতি অনুসরণ করছেন? খতিয়ে দেখলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন নয়। বিভিন্ন মাইনিং ও  বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য বস্তার তথা ছত্তীসগঢ়ের বিভিন্ন অঞ্চলের জমি চলে যাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে, বেলাগাম ভাবে নিষ্কাসিত হচ্ছে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ। ওই অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাসের সঙ্গে ওয়াকিবহাল অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে উন্নয়নের জন্য কেন সরকার বহুজাতিক ও কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে ওই অঞ্চলগুলিকে তুলে দিচ্ছেন? এর পিছনে কতটা উন্নয়নের সাধু উদ্দেশ্য আছে এবং কতটাই বা আছে প্রভুত পরিমাণে মুনাফা লাভের ইচ্ছা, তা নিয়েও স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে। সেখানেই সন্দেহ জাগে যে আদতে কি মাওবাদের ভয় দেখিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উন্নতির ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে? বার বার মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে অভিযোগ উঠছে সেগুলিকে চাপা দিয়ে রাখার জন্যই কি রাষ্ট্র বনাম মাওবাদের প্রচার করার বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়ছে? আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার হরণকারী বেসরকারি সংস্থাগুলির স্বার্থেই কি তবে কাজ করছে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রযন্ত্র?

প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা…। (শেষ)

(লেখক ইতিহাসের অধ্যাপক)

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here