বাঙালির হয় ফেলু নয় Q, ওম পুরীরা হরিয়ানায় জন্মায়…

0
121

debarati_guptaদেবারতি গুপ্ত

এ এক অদ্ভুত সমাপতন। ঘুম থেকে উঠে টুইটারের দৌলতেই প্রথম খবরটা পেলাম গত ৬ জানুয়ারি। ওম পুরী সেদিন সকালেই মারা গেছেন। ডিজিটাল মিডিয়া হাতড়ে ওমের মৃত্যু সম্মন্ধে আরো কিছু খবর বের করার চেষ্টা করতে গিয়ে হোঁচট খেলাম আরেকটা খবরে। পরিচালক Q-র  ডবল ফেলুদা সিনেমা প্রসঙ্গে ‘F**k Manik’  মন্তব্য এবং তাতে প্রতিক্রিয়ার ঝড়।

আমি ওম পুরী ভক্ত হিসেবে খবরটিতে পাত্তা না দিয়ে সেই দিনটা ওম সম্মন্ধীয় যাবতীয় খবরে নিজেকে নিয়োগ করলাম। ইউ টিউব হাতড়ে ওমের বিভিন্ন ছবির অংশ দেখে, সাম্প্রতিক কালে ওনার করা কিছু বিতর্ক সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক মন্তব্য পড়ে এবং ফোন করে বন্ধু বান্ধবের কাছে ওম চর্চা শুরু করে বাঙালি সুলভ আদিখ্যেতা পূর্ণ স্মৃতিচারণে নিজেকে আপ্লুত রাখলাম। শুতে যাবার আগে একবার ফেসবুক খুলে দেখি হোম পেজটি Q আক্রমণে রক্তাক্ত… ওম পুরী নিয়ে দু–একটি পোস্টের বেশি নজরে পড়লো না। অথচ টিভির খবরে সমস্ত রাজনৈতিক ঘোটালাকে ছাপিয়ে গেছিলেন ওম পুরী। তবে কি ফেসবুক এমন এক অভিনেতার মৃত্যুকে তোয়াক্কা করে না! নাকি Q এর গল্পটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা হয়তো উত্তেজক!?

পরদিন থেকে শুরু হল পালটা গুলি বর্ষণ। যারা Q পন্থী তারা এই প্রতিক্রিয়াশীল পাবলিককে তো ধুয়ে দিলেন বটেই আবার Q- এর মন্তব্যের সমর্থনে সত্যজিত রায়ের ছবিকেও তুলো ধোনা করতে শুরু করলেন। কেউ লিখলেন সত্যজিত সর্বসাকুল্যে তিন – চারটি ভাল ছবি বানিয়েছিলেন। কেউ বললেন বাঙালির সত্যজিত আদিখ্যেতা নিপাত যাক এবং তার সঙ্গে মানিক, ফেলু, বাবু সবাই নিপাত যাক ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে একজনের পোস্ট পড়ে বেশ মজা লাগলো। পরিচালক সুব্রত সেন। ইংরিজিতে লেখা সুব্রতদার পোস্টের বাংলা সারাংশ খানিকটা এরকম; “পুরো ঘটনাটি যেন ঈশ্বরবাদী আর ঘোর নাস্তিকদের লড়াই। নাস্তিকরা নিজেদের অবস্থানে অটল থাকতে F**k God বলতেই পারে আর তা শুনে আস্তিকরা খেপে উঠবেই। আমি অজ্ঞেয়বাদী (agnostic) হওয়ার সুবাদে এদের লড়াই বেশ উপভোগ করছি।” লেখাটা পড়ে মনে হল সুব্রতদার সঙ্গে একবার কথা বলে দেখি। সুব্রতদা একটুও বিচলিত না হয়ে যা বললেন তা মোটামুটি এরকম-সত্যজিত খুব বড়ো ফিল্ম মেকার কিন্তু উনি ঈশ্বর তো নন যে তার কোনকিছুকে কখনো প্রশ্ন করা যাবে না! যেখানে স্বয়ং ঈশ্বরও (যদি থেকে থাকেন) প্রশ্নের অতীত নন। আর একটা কথা বাঙালি ভুলে যাচ্ছে যে Q ও একজন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত পরিচালক। পূজিতার লেখা একটি ব্লগ পড়ে Q তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাত্র। এটা ওর স্টান্ট। ও তো এক জায়গায় বলেছেন যে কথাটা অ্যাকাডেমিক ভাবে বলাই যেত কিন্তু সেক্ষেত্রে এই অভিঘাত তৈরি হত না। তাছাড়া Q এভাবেই কথা বলায় বিশ্বাস করেন। সাবভারসিভ ভাষাতেই নিজেকে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন কারণ উনি মনে করেন এটাই সাধারণ মানুষের ভাষা।

q-post

 

হঠাৎ সঞ্জয়দার কথা মনে পড়লো। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগ থেকে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। মনে হল ওনাকে একবার খুঁচিয়ে দেখা যাক। সঞ্জয়দা শুনে প্রথমেই বললেন, আরে এটা নিয়ে কিছু না কিছু বলতেই হবে? আমি তাও খানিক জোর দিলাম। অগত্যা মুখ খুললেন। বললেন আগেকার সভ্যতার একটা ভাল দিক ছিল। সব কথায় সবাই রিঅ্যাক্ট করত না। আমরা ইদানিং বড্ডো ইন্টারন্যাল মেগালোম্যানিয়াতে ভুগি। সব কথার তো গুরুত্ব দেবার দরকার নেই। এগুলো ওই সেলফি তোলার মতোন সবই আড়াই দিনের খেলা। আমি যদি এখন হেঁড়ে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই তাহলে তুমি আমায় গালাগাল দেবে না রবীন্দ্রনাথকে?… এতে রায়বাবুর কি দোষ… উনি মারাই গেছেন ২৪-২৫ বছর হতে চললো… উনি ওনার সময় দাঁড়িয়ে ওনার কাজ করে চলে গেছেন… সেখান থেকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করে হঠাৎ খবরে চলে আসার প্রবণতাকে নিয়ে মাতামাতি করার কোন মানে হয় না। আজ যারা প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তারাও ওই সেলফি দোষে দুষ্ট।

দুজনেই তাদের জায়গায় ঠিক। না আমি সুব্রতদা আর সঞ্জয়দার কথা বলছি। Q বা মানিকের ঠিক ভুল বিচারের জায়গায় আমি নেই বা সেই জায়গায় নিজেকে রাখিনি। Q- এর মন্তব্য বিস্ফোরক সন্দেহ নেই। বেশিরভাগ বাঙালির মতোন আমাকেও প্রাথমিক ভাবে বিরক্ত ও অস্থির করে তুলেছিল। কিন্তু এটাও তো ঠিক, যে স্থিতাবস্থা চলছে তাতে মাঝে মাঝে চাকে ঢিল মারা প্রয়োজন। ঠিক যেমন ওম পুরীর অকালে চলে যাওয়াটাও হয়তো প্রয়োজন ছিল। ওমের দীর্ঘদিনের সহকর্মী তথা বন্ধু নাসিরুদ্দিন শাহ জানিয়েছেন, ওমের মৃত্যু দুঃখজনক কিন্তু তাঁর কাছে খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। নানান ব্যক্তিগত কারণে অবসাদগ্রস্ত ওম ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু ওমের শেষজীবন আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ছিল কি? সাম্প্রতিক কালে উনি যেসব রাজনৈতিক মন্তব্য করেছিলেন তার জন্য তাকে প্রচুর আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া (এই মাধ্যমটি তো আবার আলাদা করে নিজের কাঁধে অনেক দায়িত্ব নিয়ে নেয়) তো বটেই রাজনৈতিক আক্রমণও ছিল। আর হবে নাই বা কেন? উনি মাওবাদীদের প্রতি সমবেদনা দেখিয়ে বলবেন ওরা নাকি যথার্থভাবেই সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করছে! রাজনৈতিক নেতাদের অশিক্ষিত বলে হেয় করা তো সামান্য কাজ, ওম আবার তার নিজস্ব আবেগজাত রাগে পুরো দেশাত্মবোধের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন! “কোন ভারতীয়কে আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়নি!” এ তো যেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরামকে বলা হচ্ছে তোমায় কেউ বাধ্য করেনি ভাই দেশের জন্য প্রাণ দিতে।

আচ্ছা এমন উদাহরণ শুনলে আজকাল কারো মনে হয় না যে চরম হাস্যকর কথা! ক্ষুদিরাম তো মা যা ছিলেন তার ছবি। আর ভারতীয় সেনাবাহিনী তো স্বাধীন আধুনিক স্বচ্ছ ভারতের ছবি। দুই কি মেলে? কিন্তু মেলানোর চেষ্টা বহুদিনের। আর সেই বিরক্তিকর তথা ভুল চেষ্টাকে প্রশ্ন করা হলেই ওমনি ওম পুরী।


আপনি এক সময়ের ভারতের নিউ এজ সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি, বিদেশি ছবিতে অভিনয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন; (যদিও আপনি সিনেমার যে ঘরানার প্রতিনিধিত্ব করতেন তা ডাইনোসর হয়ে গেছে আমাদের বাজারি মস্তির ধুমে!) সেই আপনি কি না দেশাত্মবোধকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন? এসব কেত আপনাদের সত্তর আশির দশকে চলতো। এখন হবে না। কারণ আমরা স্বচ্ছ ভারত বানাচ্ছি। এই ভারতে আপনার ওই এবড়ো খেবড়ো মুখওলা গরিব, নোংরা, নর্দমার বাস্তবতা দেখানো সিনেমাও চলবে না। তাই ভাগ্যিস আপনি অকালে মারা গেলেন! তাই আবার আমরা খানিক অর্ধ সত্য আওড়ালাম। আবার একটি মৃত্যু প্রমাণ করল একটি ভুলতে বসা পূর্ণ সত্যের অস্তিত্ব। ঠিক যেমন Q-এর মন্তব্য এবং তৎপরবর্তী ঝড় প্রমাণ করলো কলকাতা আছে কলকাতাতেই।


তরুণ অভিনেতা ও নাট্যকর্মী জয়রাজ বললেন, “কনটেক্সট থেকে উপড়ে এনে একটা বাক্যকে আলাদা করে দেখা মানে তো সত্যিকে বিকৃত করা। সেটাই হয়ে চলেহে Q কে আক্রমণ করার নামে। আর যারা ওঁকে পর্নোগ্রাফির ডিরেক্টর বলে হুঙ্কার ছাড়ছেন তারা দায়িত্ব নিয়ে এই মন্তব্যগুলো করছেন তো? যারা সত্যজিত রায়কে অপমান করা হয়েছে বলে রেগে গেছেন তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন যে Q এর মন্তব্যে ফা* সত্যজিত না বলে ফা* মানিক কেন বলা হল! আর এই মানিক ভক্তরা আদৌ কতটা সত্যজিতের সিনেমার ভক্ত সেটাও প্রশ্নের ঊর্ধে নয়”।

তাহলে আর কি হাতে রইলো পেন্সিল! বাঙালি রইলো সেই নস্টালজিয়া আঁকড়ে। আর ঠিক সময়মতো হরিয়ানার অর্ধ সত্যের অকাল মৃত্যু হয়ে গেল!

(লেখক চিত্র পরিচালক)

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here