সংস্কৃত থেকেই কি বাংলার পথ চলা? চলুন যাওয়া যাক বাংলা ভাষার উৎস সন্ধানে

0
678
শক্তি চৌধুরী

হে বাঙ্গালি তুমি কে? কোথা হইতে আসিলে? গুটি কয়েক বিখ্যাত সাহিত্যিককে কুমিরছানার ন্যায় বার বার প্রদর্শন করিয়া নিজেকে যে তুমি শ্রেষ্ঠ বলিয়া ভারতের স্বঘোষিত সাংস্কৃতিক নেতা বলিয়া ঘোষণা করিয়াছ… আইস কিঞ্চিৎ গ্রীবা ঊর্ধ্বমুখী করিয়া পশ্চাতের সহস্র বৎসরের অতিক্রান্ত পথটা একবার দেখি লইবার প্রচেষ্টা করি।

মানবসভ্যতায় ভাষাকে একটি মূল উপাদান বলে ভাষাবিজ্ঞানে মনে করা হয়। তাই আমরাও বাংলার ভাষার উৎস সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি প্রথমে। গুটিকয়েক ইংরেজ ভাষাবিদ বাংলা শব্দকোষে কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের উপস্থিতি দেখেই প্রথমে ঘোষণা করে দেন আমরা সুমহান বৈদিক সংস্কৃতি ও আর্য জাতির অঙ্গ। ব্যাস, আর আমাদের পায় কে? বঙ্গীয় ভাষা তথা সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞদের সেই উদ্বাহু নৃত্য দেখে তো স্বয়ং হিটলার সাহেবও লজ্জা পাওয়ার জোগাড়। কেউ একবারও ভেবে দেখলেন না যে শত শত বছরের মিশ্র সামাজিক ব্যবস্থায় কোনো একটি ভাষার মধ্যে আরেক ভাষার সহজ ও বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দের প্রবেশ খুব অস্বাভাবিক নয়। ‘চেয়ার’, ‘টেবিল’-এর মতো বহু ইংরেজি শব্দ তো বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। তাই বলে কি আমরা ইংরেজের বংশধর হয়ে গেলাম? H.H. Risley তার ‘The Tribes and Castes of Bengal’ গ্রন্থে পরিষ্কার ভাবে দেখিয়েছেন যে কত বিচিত্র জনজাতি তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে মিশে আছে এই বাংলার সভ্যতায়। বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ড. ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্তর চেষ্টায় বাংলা সমাজ ও ভাষার বিবর্তনের এক পরিষ্কার রেখাচিত্র পাই আমরা।

ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলার সমাজের মূল চালিকা শক্তি হিসাবে দেখিয়েছিলেন সমাজের  সব চেয়ে নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ শূদ্র সম্প্রদায় ভুক্ত গোষ্ঠীগুলিকে। নির্মলকুমার বসু তাঁর ‘হিন্দু সমাজের গড়ন’ বইটিতে রাঁচির তামাড় অঞ্চলের মুন্ডা প্রভৃতিদের বর্ণাশ্রমভুক্ত সমাজে প্রবেশের প্রবল প্রচেষ্টার যে রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন, সেখানেই লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক গড়নের মূল প্রেক্ষাপট। আর্থসামাজিক অনিবার্যতার কারণে বর্ণাশ্রমের ধারায় মিশে গেছে একের পর এক জাতি প্রজাতি আর যারা ওই ধারায় মিশতে অস্বীকার করল তারা হয়ে গেল বিছিন্ন বা আদিবাসী। এখানে একটা কথা বলা খুব জরুরি যে ভারতে আদিবাসী বলে কিছু ছিল না। ‘আদিবাসী’ শব্দটি ইংরেজদের আমদানি করা।

আসুন এ বার কিছু তথ্যমূলক ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সমস্ত ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক একটা বিষয়ে একমত যে বৈদিক সভ্যতার শেষ সীমা ছিল বিহারের মিথিলা অর্থাৎ বাংলায় তার প্রবেশ ঘটেনি। নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে বাংলার ব্রাহ্মণ, নম‌ঃশূদ্র, কৈবর্ত ইত্যাদি সকলেরই শারীরিক গঠন ও বর্ণ প্রায় এক। এর থেকে সিদ্ধান্তে আসাই যায় যে বাংলার জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীরা মূলত একই ধারার দু’টি মুখ মাত্র। বিশেষত কোল গোষ্ঠীর সঙ্গে সামাজিক ও ভাষাগোষ্ঠীগত মিল খুব বেশি।

বাংলার স্বাভাবিক উচ্চারণ পদ্ধতি ও ছন্দের বিচার করলে বা লোকসাংস্কৃতিক জীবনে সংস্কৃতের যেটুকু ছোঁয়া পাওয়া যায় তা ভীষণ রকমেরই ভাষাকেন্দ্রিক কিন্তু মানুষের নিত্য ব্যবহারের জীবনের সঙ্গে কোল ভাষাগোষ্ঠীর ছড়া ও সংগীতগুলোর প্রচুর মিল। সংস্কৃত ভাষায় যে কোনো শব্দকে প্রথমে পদে রূপান্তরিত করে ব্যবহারের নিয়ম, যেমন ‘গৃহ’কে ‘গৃহাত’-এ পরিবর্তন করে তবে আমরা প্রয়োগ করি। ‘চাঁদ’ আসে ‘চন্দ্র’ থেকে কিন্তু ‘চাঁদ’কে কখনওই ‘চাঁদেন’ বলা যায় না। এইখানেই কোল ব্যাকরণ খুব সহজেই বাংলা ব্যাকরণের ভিতর ঢুকে পড়ে।

বাংলা ভাষায় ‘বচনের’ প্রয়োগ নিয়েও একই রকম কিছু ভাবনার অবতারণা করা যায়। ‘গুলো’, ‘গুলি’, ‘রা’ মানে বাঘগুলি, তাহারা … বহুবচনে পরিবর্তনের এ আমাদের নিত্যদিননের অভ্যাস। কিন্তু এ তো দ্রাবিড়ীয় বা দক্ষিণ ভারতের ভাষার বৈশিষ্ট্য, কোথা থেকে এল এই দক্ষিণের দাক্ষিণ্য? ‘ওঁরাও’ গোষ্ঠীর নাম আমরা সব্বাই জানি। এরা এই মুহূর্তে সংখ্যার বিচারে বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী। এ ছাড়াও মান্তু, কাকামারার মতো পুরোনো দ্রাবিড়ীয় জাতিগুলোর অস্তিত্ব আজও বর্তমান। এদের ভাষায় তামিল তেলেগুর প্রভাব তো অবশ্যম্ভাবী। ওঁরাও-দের কুরুক ভাষার দু’টি উদাহরণ দেখুন- আল (মানুষ)/ আলর (মানুষরা), মুককা (স্ত্রীলোক)/মুককারা (স্ত্রীলোকরা)।

কোনো একটি সভ্যতার ইতিহাস খুঁজতে গেলে ভাষা যেমন একটি অন্যতম মাধ্যম, আরেকটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ উপায় হছে লোকাচার। বঙ্গ সংস্কৃতির লোকাচারগুলোকে ভালো করে লক্ষ করলেও পেয়ে যাবেন সেই আদিবাসী ঐতিহ্য। না এখানেও কোনো বৈদিক মন্ত্রযোগের ইতিহাস নেই। যেমন পুণ্য ঘট বসানো, তাতে জল ভরা ইত্যাদি আমাদের যে কোনো মঙ্গল অনুষ্ঠানের অঙ্গ। কোল গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে এক ঘট পূজার আদিম রূপ পাওয়া যায়। বাংলায় বিবাহিত মেয়েদের সিঁদুর পরার একটা নিয়ম আছে। এই প্রথাটির মূল কিন্তু কোল সমাজ থেকে। এ ছাড়াও সাঁওতালদের ভিতরেও সিঁদুর-দান ব্যাপারটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বহু আগে থেকেই। রাঢ় বাংলার লাল মাটির সঙ্গে এই সিঁদুর ব্যবহারের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই এঁকে ‘সিম্বল অফ ফারটিলিটি’ হিসাবে ওই আদিবাসীরা ব্যবহার করতেন।

বাংলার ইতিহাস কিন্তু বলে আমরা এক মিশ্র সংস্কৃতির অঙ্গ। কোল, ভিল, মুন্ডার মতো বহু বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো মিশিয়ে দিয়েছে এই সংস্কৃতিতে। আর সেই অসাধারণ মিশ্রণে সব চেয়ে জনপ্রিয় ও সুন্দররাই টিকে আছে কালের নিয়মে। সৃষ্টি হয়েছে এক একক ও অনবদ্য সংস্কৃতির, যাকে সারা পৃথিবী সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সুহৃৎকুমার ভৌমিক (লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ)     

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here