ময়দান পেরিয়ে: দুনিয়া জুড়ে ডার্বির রংমশাল

0
203

himadri-edited-1হিমাদ্রিশেখর সরকার

সকাল সকাল বাজারের দিকে পা বাড়াতেই রান্নাঘর থেকে আওয়াজ পেলাম, “আজ  ইলিশ পাস নাকি দেখিস তো। ডার্বি তো আজ।” বাঙালবাড়ির ছেলে মশাই, তার উপর একটু খেলা পাগল পরিবার, ডার্বির দিন ইলিশ ছাড়া রুচবেনা কিছুই। আপনাদেরও বাড়িতে নিশ্চয়ই আজ ইলিশ কিংবা চিংড়ি। বাংলার বাজারগুলোই কিন্তু আজ বাংলার পরিস্থিতির সঠিক প্রতিচ্ছবি। বছরের প্রথম ডার্বি, তার উপর ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান দুজনেই আই লিগ শীর্ষে। শিলিগুড়িতে তাই আজ নজর থাকবে সারা পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষের। বাঙ্গাল-ঘটি, ইলিশ-চিংড়ি, লোটা-মাচা যে নামেই ডাকুন না কেন, বাঙ্গালির মন থেকে এই একদিনের ফুটবলপ্রেম কেড়ে নেওয়া মেসি-রোনাল্ডো-নেইমারেরও সাধ্য নয়।

কিন্তু একটা সামান্য ফুটবল ম্যাচের এত তাৎপর্য ? হ্যাঁ, এবং শুধু বাংলা নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে এরকম অনেক উন্মাদনার ইতিহাস। লিভারপুলের প্রখ্যাত স্কটিশ ম্যানেজার বিল শ্যাঙ্কলি একবার বলেছিলেন “কিছু মানুষ মনে করেন ফুটবল আসলে জীবন মৃত্যুর মতই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমি বলছি, হ্যাঁ, এটা তার থেকেও বেশি কিছু।” আসলে ডার্বি বলতে বোঝায় কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক পরিসরে অবস্থিত দুটি  দলের খেলাকেই। ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অবশ্যই আর্থিক বিভেদের এক বিচিত্র সংকলনের রূপ বারবার ফুটে উঠেছে এইসব ডার্বিতে। কোথাও সেটা নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত সাধারণ মানুষের লড়াই, কোথাও বা সমাজের উচ্চশ্রেণি বনাম খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণির লড়াই, এমনকি ধর্মীয় প্রভেদের ছবিও ফুটে ওঠে কোনো কোনো ডার্বিতে ।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এমনই কিছু বিখ্যাত ডার্বির গল্প।

নর্থলন্ডন ডার্বি    

north-london-derby   

কথায় বলে খেলার জন্ম বিলেতে। আর সেখানে ডার্বি হবে না তাই কখনো হয় নাকি? যদিও টটেনহ্যাম হটস্প্রার্স আর আর্সেনাল প্রথম মুখোমুখি হয় ১৮৮৭ সালে, কিন্তু এই দুই ক্লাবের তিক্ততা বাড়ে ১৯১৯ সাল ও পরবর্তী সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইংল্যান্ডে প্রথম ডিভিসিন লিগে যখন দুটি দল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন চেলসি ও টটেনহ্যাম হটস্প্রার্সকেই মনোনীত করা হয়। কিন্তু কথিত আছে, আর্সেনাল সেই সময় বাকি দলদের রাজি করিয়ে একটা ভোট করায়, এবং প্রথম ডিভিসনের অনেক দলই টটেনহ্যাম হটস্প্রার্সের পরিবর্তে আর্সেনালকে খেলতে দেওয়ার কথা তোলে। টটেনহ্যাম হটস্প্রার্সের দ্বিতীয় ডিভিসন থেকে প্রথম ডিভিসনে আসতে লেগে যায় আরও একদশক। বঞ্চনার এই লড়াইটাই নর্থলন্ডন ডার্বিতে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করে।
মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়: আর্সেনাল- ৮০, স্পার্স- ৬১, অমীমাংসিত-৫০

মিলান ডার্বি(ডার্বি দি মিলানো)

milan-derby

১৮৯৯ সালে মিলান শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় এসি মিলান ক্লাবটি। মূলত ক্রিকেট ও ফুটবল খেলাই ছিল এদের লক্ষ্য। ১৯০৮ সালে মিলানের ধনী সম্প্রদায় এসি মিলান থেকে সরে এসে নিজেদের স্বতন্ত্র আস্তানা বানায় এবং নাম দেয় ইন্টারনাশিওনালে, বা ইন্টার মিলান। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহানুভূতির ঝুলি উপচে পড়ে এসি মিলানের উপর। ইন্টার মিলান ৬০-৭০-এর দশকে এবং একবিংশ শতকের শুরুর দিকে ইতালি তথা বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করেছে। অপরদিকে, এসি মিলানের রাজত্বকাল ৫০-৬০ এবং অবশ্যই ৯০এর দশক। ইউরোপীয় ফুটবলে রূপকথার শহর হয়ে আছে মিলান। দুদলই আজও একই মাঠ সানসিরোকে ব্যবহার করে থাকে ঘরের মাঠ হিসেবে, কিন্তু ম্যাচের দিন গোটা মিলান জু্ড়ে চলে যুদ্ধ, চাপা উত্তেজনা থেকে ফুটবলপ্রেমীদের গুন্ডামি পর্যন্ত। ডার্বির কলকাতার মতই সেদিন মিলানও ভাগ হয়ে যায় লাল-কালো আর নীল-কালো রঙে।
মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়: এ সি মিলান- ৭৫, ইন্টারমিলান-৭৭, অমীমাংসিত- ৬৫

সুপারক্লাসিকো

boca-vs-river

ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদনার শহর, বুয়েনেস এয়ারেসের এই ডার্বি সম্পর্কে যতটা লেখা যায় ততটাই কম। লা বোকা অঞ্চলের দুই ক্লাব বোকা জুনিয়ার্স ও রিভেরপ্লেটের প্রথম সাক্ষাৎ ১৯১৩ সালে। তারপর থেকে আজও সেই লড়াই চলছে অনবরত। এই ডার্বিতে খেলে গেছেন রুগেরি, মারাদোনা, কেম্পেস, পাসারেল্লা, রিকেলমে, তেভেজ থেকে আজকের দিনের রাদামেল ফালকাও, হিগুইন সকলেই। লাতিন আমেরিকান টাচের সাথে সাথে বিধ্বংসী শারীরিক লড়াই এই ম্যাচটিকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে দেয়। দর্শকদের খেলা চলাকালীন পুরোসময়টা গ্যালারিতে তোলা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে চলে নাচ-গান আর প্রবল মারামারি। পেশীপ্রদর্শনে কোনো দলই পিছপা হয়না।

মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়: বোকা- ৭৬, রিভের- ৬৭, অমীমাংসিত- ৬৫

 ফ্লা-ফ্লু

Torcida_do_flamengo

দর্শক উত্তেজনার পারদ বাকিদের মত উষ্ণ নাহলেও ফ্লা-ফ্লু ফুটবল বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ডার্বির একটি বটেই। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ১৯৬৩ সালে এই ডার্বিতে উপস্থিত জনসংখ্যা (১৯৪৬০৩ জন) আজও ফুটবল বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। ফ্লুমিনেন্সি ও ফ্লামেঙ্গো দুটি ক্লাবই রিও ডি জেনেইরোতে অবস্থিত। ফ্লুমিনেন্সি থেকে বেরিয়া আসা বিক্ষুব্ধ খেলোয়াড়দের নিয়েই শুরু ফ্লামেঙ্গো। ১৯১২ সাল থেকে চলে আসা এই ডার্বির বিশেষত্বই হল যে তা খেলা হয় এক রঙিন মেজাজে। দু’ক্লাবেরই  নিজস্ব স্টেডিয়াম থাকা সত্ত্বেও মারাকানাতে এই ম্যাচ হবার মধ্যেই  প্রকাশ পায় এই ম্যাচের গুরুত্বের বিশালতা । বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান তারকা, অধুনা আমাদের সবার প্রিয় কোচ জিকো, ফ্লামেঙ্গোর জার্সি গায়ে এই ডার্বিতে অংশগ্রহণ করেছেন বহুবার।

flufan

মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়: ফ্লামেঙ্গো- ১৪৬, ফ্লুমিনেন্সি-১২৯, অমীমাংসিত- ১৩০

কেল্টিক – রেঞ্জার্স(ওল্ড ফার্ম ডার্বি)

cel-ran

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের এই ডার্বির আরেক নাম ওল্ড ফার্ম ডার্বি। এই লড়াই মাঠের মত মাঠের বাইরেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় আঙ্গিকেও এই লড়াই-এর প্রচ্ছন্ন প্রভাব দেখা যায় নর্দান আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে। ১৮৮৮ সালে শুরু হওয়া এই ডার্বি শুধুই ব্রিটিশ ও আইরিস-স্কটদের নয়, নয় শুধুমাত্র ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্টদের যুদ্ধ। প্রোটেস্টান্ট মনোভাবাপন্ন রেঞ্জার্স ও ক্যাথলিক মনোভাবাপন্ন কেল্টিকরা নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই বলেই মনে করে থাকেন এই ফুটবল ম্যাচটিকে।

মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়: কেল্টিক-১৪৮, রেঞ্জার্স-১৫৯, অমীমাংসিত- ৯৭

 বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি, তবুও নিজের এই ক্ষুদ্র জানাটুকুই আজ তুলে ধরতে চেষ্টা করছি প্রাণপণ। জানি, মন ভরলনা, কিন্তু সময় আর শব্দসংখ্যার কড়া চোখ রাঙানিকে এই মুহূর্তে উপেক্ষা করতে পারব না। অনেকেই অনেক নাম তুলে প্রশ্ন করবেন, কিন্তু হাল্কা করে মনে করিয়ে দেই, ডার্বির শর্ত অনুযায়ী এল-ক্লাসিকো বা লিভারপুল – ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ডার্বি বলা যায়না। হ্যাঁ, অনেক মিস হল। রোম ডার্বি, মাদ্রিদ ডার্বি, ইস্তাম্বুল ডার্বি, বার্সিলোনা- এস্পানেওল, তুরিন ডার্বি, গ্রিন ডার্বি আরও অনেক অনেক গল্প। কিছু না হোক, কলকাতার মিনিডার্বি (ইস্টবেঙ্গল – মহামেডান, মোহনবাগান – মহামেডান, ইস্টবেঙ্গল – এরিয়ান্স) নিয়েই কিছু লেখা গেল না বিশেষ। অবশ্য বর্তমানের বাজারে এই টিমগুলোর ব্যবধান এতটাই বেশি খুব কম মানুষের স্মৃতিতেই এই নামগুলো উঠে আসবে। যদিও কলকাতা লিগ ছাড়া এই ম্যাচ আর বিশেষ দেখা যায় না এই আই এস এলের যুগে, তবুও এদের ইতিহাস কিন্তু আজও ঈর্ষণীয়। আশা করি আগামি কোনও সুযোগে সেই নিয়েও আরও দুচার কথা লিখে ফেলতে পারবো।

আপাতত নজর থাকুক শিলিগুড়িতে আর বাংলা না হয় ৯০ মিনিটের জন্যে ভাগ হয়ে যাক লাল-হলুদ বা সবুজ-মেরুন রঙে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here