ভোট বিশ্লেষণ: হিন্দু জাতীয়তার প্রচারেই উত্তরপ্রদেশে বাজিমাত বিজেপির

0
167

শৈবাল বিশ্বাস

রামমন্দির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বাকি যে সব সুক্ষ্ম হিন্দুত্বপ্রচারের কৃৎকৌশল এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বে বিজেপি দেখাল তার কি কোনও প্রভাব ভোটের ফলাফলের ওপর পড়েছে? বিশ্লেষকদের কেউ বলছেন বিজেপি এবার মুসলমানদেরও ভোট পেয়েছে তাই সমাজবাদী পার্টি এবং বিএসপির কপাল পুড়েছে। কেউ বা বলছেন, দলিত ও হরিজন ভোটের একটা বড় অংশ নাকি এবার বিজেপি কেড়ে নিয়েছে। অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশের জাতপাত ভিত্তিক রাজনীতিতে বিজেপি জায়গা করে নেওয়ায় বাকিদের অবস্থা খারাপ হয়েছে। কিন্তু অবস্থাটা কি সত্য‌িই তাই নাকি অন্য‌ কিছু ?


এবারের নির্বাচনে ৫৯টি মুসলিম অধ্য‌ুষিত কেন্দ্রে সমাজবাদী পার্টি ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্য‌দিকে বিএসপি পেয়েছে ১৮ শতাংশ ভোট। দু পক্ষ মিলে ভোট পেয়েছ ৪৭ শতাংশ। ২০১২-র লোকসভা নির্বাচনের হিসাব ধরলে দেখা যাবে দু পক্ষের ভোটই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বরং ২০১৪-র নির্বাচনে দু পক্ষের মিলিত ভোট কমে দাঁড়িয়েছিল ৪৩ শতাংশে।


আমাদের ভোটফল পরবর্তী সমীক্ষা বিশ্লেষণ বলছে, হিন্দু ভোটের বড় অংশই বিজেপির হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তার প্রচারে মজেছে। তাই সমাজবাদী পার্টি বা মায়াবতীর দল নিজেদের ভোট ব্য‌াঙ্ক অক্ষুন্ন রেখেও বাকিদের সমর্থন পায়নি। উচ্চহিন্দু থেকে শুরু করে মধ্য‌মবর্গীয়দের বড় অংশ বিশেষ করে জাঠ,ব্রাহ্মণ,কায়স্থ ইত্য‌াদি সম্প্রদায়ের মানুষ মুজফ্‌ফরপুর-পরবর্তী বা মহম্মদ আখলাক কাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয়তার সঙ্গে বিজেপির সুক্ষ্ম হিন্দুত্বের মিশেলে ভরসা রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

উত্তরপ্রদেশের মোট ভোটারের মাত্র ১৯ শতাংশ মুসলমান। সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি এই ভোট নিজেদের দিকে পুরোপুরি টেনে নেওয়ার জন্য‌ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। ফলাফল বের হওয়ার পর একটা মহল থেকে বলা হয়, অখিলেশ ও মায়াবতীর মধ্য‌ে মুসলিম ভোট নাকি আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে। কিংবা এই ভোটের একটা বড় অংশ বিজেপিতে চলে গিয়েছে না হলে এই ফলাফল হয় না। কিন্তু এই বক্তব্য‌র কোনওটাই ঠিক বলে মনে হয় না। এবারের নির্বাচনে ৫৯টি মুসলিম অধ্য‌ুষিত কেন্দ্রে সমাজবাদী পার্টি ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্য‌দিকে বিএসপি পেয়েছে ১৮ শতাংশ ভোট। দু পক্ষ মিলে ভোট পেয়েছ ৪৭ শতাংশ। ২০১২-র লোকসভা নির্বাচনের হিসাব ধরলে দেখা যাবে দু পক্ষের ভোটই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বরং ২০১৪-র নির্বাচনে দু পক্ষের মিলিত ভোট কমে দাঁড়িয়েছিল ৪৩ শতাংশে। ফলে নির্দ্বিধায় বলা যায় মুসলিম ভোট আগে যেখানে পড়তো এখনও সেখানেই পড়েছে। সমাজবাদী পার্টি বা বিএসপির ভোট বিজেপিতে চলে গিয়েছে এমনটা মোটেই সত্য‌ি নয়। এই কেন্দ্রগুলিতে বরং বিজেপির ভোট বেড়ে হয়েছে ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ হিন্দুত্ব প্রচার ও মোদি ঝড়ে অন্য‌ান্য‌ ভোটের বেশিরভাগ অংশই চলে গিয়েছে বিজেপির দিকে। গত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার অল্প কমলেও বেশিরভাগ হিন্দু ভোটই যে বিজেপি পেয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। এই কেন্দ্রগুলির মধ্য‌ে বিজেপি পেয়েছে ৩৯ টি আসন। সমাজবাদী পার্টি ১৭টি এবং বিএসপি কোনও আসন পায়নি। এতে বোঝা যায় সমাজবাদী পার্টি অন্তত মুসলিমদের মধ্য‌ে নিজেদের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।


যেহেতু এবারের নির্বাচনে বিএসপি মাত্র ১৯টি আসন পেয়েছে তাই অনেকে ধরে নিয়েছেন দলিত ভোটের একটা বড় অংশ তাদের থেকে বেরিয়ে বিজেপির দিকে চলে গিয়েছে। কিন্তু ভোটের শতাংশের হিসাবে দেখা যাচ্ছে বিএসপি এবার ২৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০১২-র বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। কিন্তু ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি।


বিজেপি ও বিএসপির মধ্য‌ে জোর তরজা বেঁধে গিয়েছে দলিত ভোটের ভাগ নিয়ে। বিশেষ করে যাদবদের বাদ দিয়ে বাকি দলিত ভোট কোথায় গেল তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিচার। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্য‌ার ২১ শতাংশ দলিত সম্প্রদায়ের। যেহেতু এবারের নির্বাচনে বিএসপি মাত্র ১৯টি আসন পেয়েছে তাই অনেকে ধরে নিয়েছেন দলিত ভোটের একটা বড় অংশ তাদের থেকে বেরিয়ে বিজেপির দিকে চলে গিয়েছে। কিন্তু ভোটের শতাংশের হিসাবে দেখা যাচ্ছে বিএসপি এবার ২৪ শতাংশ ভোট পেয়েছ। ২০১২-র বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। কিন্তু ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। রাজ্য‌ের ৮৫টি সংরক্ষিত আসনের মধ্য‌ে বিজেপি সবাইকে ছাপিয়ে ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে সমস্ত জাতির ভোটই বিজেপি পেয়েছে যার মধ্য‌ে দলিত ভোটও কিছু থাকতে পারে। কিন্তু বহুজন সমাজ পার্টির ভোট যে কমে গিয়েছে এমনটা কিন্তু মোটেই নয়।

জাঠ ভোটের হিসাব নিয়েও একই রকম বিতর্ক দানা বেঁধেছে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের একটা বড় অংশই জাঠ অধ্য‌ুষিত। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে তারা দুহাত তুলে বিজেপিকে সমর্থন করেছিল। এবারেও সেই পরিস্থিতি বজায় আছে। হরিয়ানার সাম্প্রতিক জাঠ সংরক্ষণ আন্দোলন সত্ত্বেও তারা বিজেপির প্রতি সমর্থনে কোনও ঘাটতি রাখেনি। এবারের নির্বাচনের প্রথম পর্বে এই অঞ্চলের ৭৩টি আসনের মধ্য‌ে বিজেপি পেয়েছে ৪৭ শতাংশ ভোট। ২০১২-তে তারা জাঠ অধ্য‌ুষিত অঞ্চলে পেয়েছিল মাত্র ১৬ শতাংশ ভোট। অন্য‌দিকে জাঠ নেতা অজিত সিংয়ের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় লোকদল ২০১২-তে পেয়েছিল ১১ শতাংশ ভোট এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে। তবে শুধু যে তাদেরই ভোট কমেছে তা নয়, এই অঞ্চলে সমাজবাদী পার্টি,বিএসপি- সবারই ভোট উল্লেখযোগ্য‌ভাবে কমেছে যা থেকে বোঝা যায় জাঠ কৃষকদের মধ্য‌েও আর সমস্ত কিছুর চেয়ে হিন্দু জাতীয়তার আবেগই সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here