বাঙালির মাছ-বিলাসের রূপকার বিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরীকে আমরা ভুলতে বসেছি

0
3210
ছোটন দত্ত গুপ্ত

মাছে-ভাতে বাঙালি! এই উক্তি বাঙালির মেধার আস্ফালনের জন্য নাকি ভোজনরসিক বলে, তা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা করলে বোঝা যাবে। (মৎস্যভুকরা নাকি মেধাবী হয়। বাঙালি এবং জার্মান দুই জাতিই মাছখেকো।) তবে যে আবিষ্কারের জন্য এখনও একশো-দেড়শো টাকায় রুই-কাতলা মাছ পাতে উঠছে, সেই বিজ্ঞানী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ৩ বছর আগে, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৪। তাঁর খোঁজ কে রাখে!

প্রাণীবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত প্রফেসর-কর্মীদের ডাঃ হীরালাল চৌধুরীর খবর রেখে লাভ কী! তাতে তো প্রোমোশন হয় না, ট্রান্সফারও আটকানো যায় না। আজকের বেশির ভাগ গবেষণাও তো শুধু পদোন্নতি ও ডক্টরেট লেখাটা নামের আগে বসানোর জন্য। জাপানের খ্যাতনামা মৎস্যবিজ্ঞানী ডাঃ কুরোনুমা যতই হীরালালকে ‘প্রণোদিত প্রজননের জনক’ (father of induced breeding) বলে অভিহিত করুন, যতক্ষণ ও-পার থেকে কেউ ‘গড পার্টিকলস্‌’ মতো হইচই না করে, ততক্ষণ কে হীরালাল।

তৎকালীন ফিশারিজের উপ-অধিকর্তা ডাঃ ভাটিয়া কটকের গবেষণাগারে এসে বলেছিলেন, “চৌধুরী, তুমি যদি এ কাজে সফল হও, তবে তো নোবেল পুরস্কার পাবে”।

বদ্ধ পুকুরে কার্প প্রজাতির মাছ ডিম পাড়ে না। এ আবার কী কথা! হ্যাঁ, এটাই কথা। সাধারণ মানুষের ধারণা না থাকাটাই স্বাভাবিক। রুই-কাতলা-মৃগেল-বাটা-খয়রা ও গ্রাসকাপ প্রজাতির মাছ বর্ষাকালে স্রোতযুক্ত জলে ডিম পাড়ে। কার্প প্রজাতির মাছ নিজের হরমোনাল বাধ্যবাধকতার জন্য জমা জলাশয়ে শারীরিক মিলনে অক্ষম, তাই রুই-কাতলা প্রজাতির মাছচাষে ডিমপোনা পেতে চাষিদের বর্ষাকালে নদী-খাল-বিল-বাওড় ও নয়ানজুলি থেকে সংগৃহীত অসম-বয়সি মাছের চারার উপর নির্ভর করতে হত।

পরিবারের সঙ্গে হীরালাল চৌধুরী
বিজ্ঞাপন

প্রফেসর চৌধুরী কটকের মৎস্য গবেষণাগারে মাছের এন্ডক্রাইনোলজি ও ফিজিওলজির ওপর ন’ বছর গবেষণা করার পর ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই কার্প প্রজাতির মাছের ‘প্রণোদিত প্রজনন’-এ সাফল্য লাভ করেন, যা প্রাণীবিজ্ঞানে প্রথম সারির মৌলিক কাজ। ‘প্রণোদিত প্রজনন’-এর ফলে মাছচাষি বর্তমানে এক সঙ্গে সমবয়সি সুস্থ ডিমপোনা তাঁর প্রয়োজনমতো যে কোনো সময়ে চাষের জন্য চাইলেই পাবেন। ১৯৫৬ সালে এই গবেষণা চলাকালীন ভারত সরকারের তৎকালীন ফিশারিজের উপ-অধিকর্তা ডাঃ ভাটিয়া কটকের গবেষণাগারে এসে বলেছিলেন, “চৌধুরী, তুমি যদি এ কাজে সফল হও, তবে তো নোবেল পুরস্কার পাবে”। ডক্টর হীরালালের গবেষণা নোবেল সিম্পোসিয়ামে পাঠানো হয়েছিল কি না জানি না, তবে এ দেশে ১০ জুলাই ‘ফিশ ফার্মার্স ডে’ ঘোষণা ছাড়া পদ্মশ্রী-পদ্মভূষণ-পদ্মবিভূষণ কোনো তকমাই জোটেনি এই আবিষ্কারকের। আর ভারতরত্ন, সে তো দুর অস্ত্‌।

আরও পড়ুন: বেঙ্গল ফরসেপসের স্রষ্টা ডাঃ কেদারনাথ দাসকে সার্ধশতবর্ষে স্মরণ

১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর সিলেটের (সেই সময়ের শ্রীহট্ট) সুরমা ভ্যালিতে (বর্তমানে বাংলাদেশ) হীরালাল চৌধুরীর জন্ম হয়। ম্যাট্রিকুলেশনে চারটি লেটার নিয়ে সিলেটের গোমস্‌ স্কুল থেকে পাশ করেন ১৯৩৭ সালে। এর পর কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যক্ষের (কলেজের মানোন্নয়নে সেই সময় মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তির বিনিময়ে ভর্তি নেওয়া হত) আমন্ত্রণে আইএসসি, বিএসসি (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন) এবং বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় এমএসসি পাশ করেন। যদিও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল অঙ্ক। কিন্তু ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ সরকারের ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’-এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরির নির্দেশনামায় ছিল, সুরমা ভ্যালির বর্ণহিন্দুদের দরখাস্ত গ্রাহ্য হবে না। অর্থাৎ সুরমা ভ্যালির অধিবাসীদের কোনো সরকারি চাকরি দেওয়া হবে না। বিজ্ঞাপনেও তাই-ই লেখা থাকত। সিলেটে তখন কোথাও প্রাণীবিদ্যায় পড়াশোনা শুরু হয়নি। হীরালালকে তাই কলকাতায় এসে জুলজি নিয়ে ভর্তি হতে হয়।

১০ জুলাই ‘ফিশ ফার্মার্স ডে’ ঘোষণা ছাড়া পদ্মশ্রী-পদ্মভূষণ-পদ্মবিভূষণ কোনো তকমাই জোটেনি এই আবিষ্কারকের। আর ভারতরত্ন, সে তো দুর অস্ত্‌।

বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, প্রতিকূলতাই সৃষ্টির উৎস। এমএসসি পাশের পর সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করে দিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সিলেট পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় হীরালাল সহ পাঁচ জন চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেন। এর পর কোনোক্রমে মণিরামপুরে (ব্যারাকপুর) ‘সেন্ট্রাল ইন্ডল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ স্টেশন’ (এখন ইনস্টিটিউশন)-এ জুনিয়র রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দেন।

ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে ইটভাটায় জোয়ারের জলে ভেসে আসা পেটফোলা মাছ ধরে টিপে দিতেই ওভাল শেপের স্বচ্ছ ডিম বেরিয়ে এল – হীরালালের কথায়, “সেই ডিম পাত্রে রাখার কয়েক ঘণ্টা পর জীবনে প্রথম লাইভ দেখতে পেলাম” যা ‘প্রণোদিত প্রজনন’ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। প্রথমে ‘কড়কেবাটা মাছ’-এর ওপর অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে ‘প্রণোদিত প্রজনন’ সফল হয়। এর পর কার্প প্রজাতির মাছের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সংগ্রহ করে (বর্তমানে বাজারে রুই-কাতলা মাছের মাথা থেকে সংগ্রহ করার দৃশ্য অনেকেই দেখে থাকবেন) সেটাকে অ্যালকোহলে প্রসেস করে নিয়ে স্ত্রী-মাছকে দু’ বার এবং পুরুষ মাছকে এক বার ইনজেকশন দিয়ে হাপায় (ব্রিডিং পুলে) ছেড়ে দিলে তারা স্পোর্টিং ক্রিয়া করতে সক্ষম হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্ত্রী-মাছটি ডিম এবং পুরুষ-মাছটি শুক্রাণু নিঃসরণ করে এবং সতেরো থেকে আঠারো ঘণ্টা পর দু’ তিন লক্ষ ডিমপোনা এক সঙ্গে পাওয়া যায় – এই আবিষ্কার কটকে বসে করে সারা বিশ্বে মৎস্য গবেষণায় নতুন পালক জুড়লেন হীরালাল চৌধুরী। এর হাত ধরে বর্তমানে কই-পাবদা-মাগুর সহ বহু মাছের প্রণোদিত প্রজনন করা সম্ভব হয়েছে।

ডিম পোনা

তিনি শুধুমাত্র প্রণোদিত প্রজননেরই জনক নন, পুকুরে মৎস্যোৎপাদনের বৃদ্ধির জন্য নিবিড় মিশ্রচাষের জন্মদাতাও তিনি। মিশ্রচাষ হল একই পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যারা পৃথক জলস্তরে থাকে, যাদের খাদ্যাভ্যাস আলাদা, সেই প্রজাতির মাছ এক সঙ্গে চাষ করলে উৎপাদন পাঁচ-ছয় গুণ বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়াও ডঃ হীরালাল কার্প প্রজাতির বারো রকমের নতুন শংকরীকরণ, আঁতুড় পুকুরের ডিমপোনা কোন কোন পোকার দ্বারা আক্রান্ত এবং বিজ্ঞানসম্মত ভাবে আঁতুড় পুকুর পালনের পদ্ধতির কথা বললেন।

১৯৭৬ সালে বাধ্য হয়ে অবসর নেওয়ার পর এফএও(food and agricultural organisation) থেকে বিশ্ব ব্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন সংস্থার উপদেষ্টা হয়ে সুদান, নাইজেরিয়া, ফিজি, লাওস, মায়ানমার প্রভৃতি বহু দেশে কাজ করেছেন।

মায়ানমারে মিল্ক ও ভাঙন মাছের ওপর প্রণোদিত প্রজনন ও মৎস্যোৎপাদনের সাফল্যের জন্য সে দেশের সরকারের কাছে অতি প্রিয় ও প্রয়োজনের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

তিনি শুধুমাত্র প্রণোদিত প্রজননেরই জনক নন, পুকুরে মৎস্যোৎপাদনের বৃদ্ধির জন্য নিবিড় মিশ্রচাষের জন্মদাতাও তিনি।

প্রফেসর হীরালাল চৌধুরীর অবদান সারা পৃথিবীতে আজকের দিনে অপরিসীম। শুধুমাত্র প্রাণীবিজ্ঞানের গবেষণার জন্যই নয়, খাদ্য সংকট, অপুষ্টি এবং সামুদ্রিক মাছের সীমাহীন উত্তোলন রোধেও এই বিজ্ঞানীর অবদান কম নয়। ১৯৫০-৫১ সালে ভারতে অন্তর্দেশীয় মৎস্যোৎপাদন ছিল ২৯%, সামুদ্রিক মৎস্য উত্তোলন ছিল ৭১%। সেখানে ২০১৩-১৪ সালে অন্তর্দেশীয় মৎস্যোৎপাদন ৬৪% বৃদ্ধি পায়। আর সামুদ্রিক মাছ ধরা কমে ৩৬% হয়েছে। সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রয়োজনমতো মাছের জোগান সম্ভব হয়েছে ‘প্রণোদিত প্রজনন’ উদ্ভাবনের ফলেই। এত বড় আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে উঃ চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে মাছের বীজের যে বাজার, তা মৎস্যশিল্পে দেখার মতো দ্রষ্টব্য স্থান হতে পারত। সম্ভবত নৈহাটিই ভারতবর্ষের একমাত্র জায়গা যেখানে জল ঠিক ভাবে ব্যবহৃত হয় প্রণোদিত প্রজননের ফলে। আগে নৈহাটি থেকে সারা ভারতবর্ষে ডিমপোনা যেত চাষের জন্য। এখন বিভিন্ন জায়গায় হ্যাচারি হওয়ার জন্য কম ডিমপোনা পাওয়া যায়। তবে নৈহাটির দক্ষ শ্রমিকরা অন্য প্রদেশের হ্যাচারিতে গিয়ে প্রণোদিত প্রজননের কাজ করে আসেন। অন্ধ্রপ্রদেশের বড় রুই-কাতলা মাছ যে আমরা খাই, তার চারামাছ এই নৈহাটি থেকেই যায়। অথচ এই চারামাছেদের আমরা বড়ো করতে অক্ষম।

মানুষ ও মাছের শারীরবৃত্তীয় গঠন একেবারেই আলাদা। ডঃ হীরালাল চৌধুরী এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর তথ্যচিত্রের কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে তাঁর কাজের সঙ্গে ‘টেস্টটিউব বেবি’র স্রষ্টা ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় (দ্বিতীয় টেস্ট টিউবের স্রষ্টা হিসেবে নথিভুক্ত থাকলেও সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষের দাবিতে তিনিই প্রথম)-এর গবেষণার কাজের কোথাও মিল রয়েছে। যদিও ডঃ হীরালালকে প্রফেসর মুখোপাধ্যায়ের মতো আত্মহত্যা করতে হয়নি। বিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরীর অবদানকে এ দেশ মনে রাখবে কি না, তা সময়ই বলবে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here