১৫৬তম জন্মদিনে স্মরণ করি শিকাগো-ফেরত স্বামীজির বজবজে পদার্পণের দিনটিকে

0
4015
swami vivekananda
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

বজবজের গঙ্গায় ১৮ ফেব্রুয়ারির রাতে নোঙর করল মোম্বাসা জাহাজ। রাতটুকু জাহাজে কাটিয়ে পরের দিন স্বামীজি নামলেন জেটিঘাটে। বিশ্রাম করলেন বজবজ স্টেশনের প্রথম শ্রেণির কক্ষে। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন সেভিয়ার, মিসেস সেভিয়ার, মিস্টার গডউইন, মিস্টার আনন্দ চারলু, স্বামী নিরঞ্জনানন্দ ও স্বামী শিবানন্দ।

শিকাগো ফেরত স্বামীজির বাংলায় ফেরার কথা সকলের জানা। তৎকালীন মাদ্রাজ, অধুনা চেন্নাই থেকে ‘এস এস মোম্বাসা’ জাহাজে বিদেশি শিষ্যদের নিয়ে ফিরেছেন বিবেকানন্দ। তখনকার আইনে সূর্যাস্তের পর জাহাজ থেকে নামা নিষেধ। বিবেকানন্দ ও তাঁর সঙ্গীরা তাই নামলেন ১৯ তারিখ সকালে, সেখান থেকে বজবজ স্টেশন। সেই সকাল বাংলা তথা বজবজের কাছে এক উজ্জ্বল দিন। প্রতিবারের মতো এই দিনটিকে স্মরণ করে চলেছেন বজবজবাসী সহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এবং আলমবাজার সহ বিভিন্ন মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসীরা।

১২১ বছর আগের সেই সকাল, স্বামীজি যে পথে বজবজ থেকে শিয়ালদহ হয়ে আলমবাজার পৌঁছেছিলেন সেই পথ ধরেই প্রতি বছর সম্মান জানানো হয় পদযাত্রাকে। আয়োজক স্বামী বিবেকানন্দ স্মারক কমিটি বজবজ। বিশ্রামকক্ষে কিছু সময় কাটিয়ে বিবেকানন্দ লোকাল ট্রেনে শিয়ালদহ পৌঁছোন। সেখানে অগণিত মানুষের সংবর্ধনা নিয়ে রিপন কলেজ হয়ে বিডন স্ট্রিটের চারু মিত্রের পারিবারিক সংবর্ধনা গ্রহণ করেন। পরে নন্দলাল বসুর বাড়ি হয়ে যান আলমবাজার। ১৮৯২-তে স্বামীজির গুরুভাইরা এখানেই এসে ওঠেন। তাই আলমবাজারে আসেন তিনি। ১৮৯৮-এর ১৮ মার্চ পর্যন্ত তিনি এখানেই ছিলেন। এখন সেটি শ্রীরামকৃষ্ণ সত্যানন্দ আলমবাজার মঠ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

স্বামীজি রেলকক্ষের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের যে চেয়ারটিতে বসেছিলেন সেটি ফেয়ারলি প্লেসের মিউজিয়ামে আছে। এখন সেখানে বিবেকানন্দের মূর্তি রাখা আছে। ঘটনা ও জায়গাটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তৎকালীন বজবজ পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান গণেশ ঘোষ ১৯৮৫-তে একটি কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির তৎপরতায় আজও একই ভাবে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় ১৯ ফেব্রুয়ারির সকালে।

শিকাগো ধর্মসভার ঐতিহাসিক সাফল্য এবং আমেরিকা ও ইউরোপে ভারতীয় সংস্কৃতির শ্বাশতবাণী প্রচারের পরে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। দিগ্বিজয়ী স্বামীজির দেশে ফিরে আসা ভারতবাসীর মনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। দক্ষিণ ভারতে প্রথম পদার্পণ করে পরাধীন ভারতবাসীকে প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত করে এক নতুন তরঙ্গের আলোড়ন তুলে মুখ ফেরালেন শৈশবের লীলাভূমি বাংলা তথা কলকাতাতে। পথক্লান্ত স্বামীজি বিশামের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি মোম্বাসা জাহাজে কলকাতা অভিমুখে রওনা হলেন। মোহনা পার হয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারির রাতে বজবজে নোঙর করল জাহাজ।

vivekananda special
প্রতি বছর বজবজ থেকে চলে এই বিবেকানন্দ স্পেশ্যাল।

যাওয়ার কথা ছিল খিদিরপুরে। সেইমতো বিশিষ্ট মানুষজনও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তবে এলেন কেন বজবজে? তাঁর জাহাজ বজবজের সেই স্থানে নোঙর করে যেখানে কলকাতা পুনরুদ্ধারে এসে ইংরেজদের তিনটি যুদ্ধজাহাজ নোঙর করেছিল। বজবজ দুর্গ আক্রমণ করে ও জয়লাভ করে বজবজে ইংরেজরা প্রথম সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার সোপান গড়ে। পরের দিন সকালে স্বামীজি যেন বীরদর্পে বজবজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে জানান দিলেন আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ভারত স্বাধীন হবে। তবে যে ভাবে দেশ স্বাধীন হয় সেই ভাবে নয়।

স্বামী বিবেকানন্দের ১৫৬তম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি। ১৯৯৭-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন আধিকারিক তরুণ দত্ত সবুজ সংকেত দেখিয়ে ‘বিবেকানন্দ স্পেশাল পুণ্যবাহন পূর্বরেল’ যাত্রার উদ্বোধন করেন। সে দিন উপস্থিত ছিলেন, শিয়ালদহ শাখার ম্যানেজার রামমোহন ডস, স্বামী গহনানন্দজি মহারাজ ও সংস্থার সভাপতি গণেশ ঘোষ। সেই থেকে প্রতি বছর একটি লোকাল ট্রেন ‘বিবেকানন্দ স্পেশাল’ নাম নিয়ে দু’টি কামরায় রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী ও অতিথি-অভ্যাগতদের নিয়ে বজবজ থেকে শিয়ালদহ আসে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here