‘পুলিশ কখনও অন্যায় করে না যতক্ষণ তারা আমার পুলিশ’

0
বিশ্বজিৎ রায় (সাংবাদিক)

২২ মে বামেদের নবান্ন অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও মিছিলকারীদের খন্ডযুদ্ধ কভার করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও পুলিশি লাঠিবাজির শিকার হন। না, লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তার (ঘটনাচক্রে যিনি একসময় আনন্দবাজারে আমার অনুজ সহকর্মী ছিলেন) দাবিমতো ‘পেশাগত ঝুঁকি ও ঝক্কি’-র কারণে গোলমালের মধ্যে পড়ে বেমক্কা মার খাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।  আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। তাই প্রত্যক্ষদর্শী নই। তবে সতীর্থদের কাছে শুনেছি মেয়ো রোডে একটি টিভি চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিক ক্যামেরার সামনে তাঁর ভাষ্যে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে মিছিলকারীদের উপর পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ, এমনকি আহত, রক্তাক্তদের ফেলে মারের কথা বলছিলেন। কাছেই দাঁড়ানো র‍্যাফ বাহিনী তা শুনতে পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের একজন ঐ সাংবাদিককে গালিগালাজ করে এবং চড় মারে। আশেপাশে ছড়ানো অন্য সাংবাদিক-চিত্র সাংবাদিকরা ছুটে আসেন এবং প্রতিবাদ করেন।

এ নিয়ে বিতণ্ডার জেরে সাংবাদিকরা উচ্চস্তরের পুলিশ কর্তাদের উপস্থিতির দাবি করে রাস্তায় বসে পড়েন। দুই কর্তা ডি সি সাঊথ মুরলীধর শর্মা ও অপরাজিতা রাই আলোচনার জন্য হাজির হলেও নিগ্রহকারী অধস্তনদের হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা দুরের কথা, তাদের পক্ষ নিয়ে মারমুখো হয়ে ওঠেন। তাদের নির্দেশে পুলিশ মহিলা-পুরুষ বাছবিচার না করে সাংবাদিকদের ফেলে পেটায়। সঙ্গে কুৎসিত গালিগালাজ। অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। তাদের নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন সহকর্মীরাই। আহত এক সাংবাদিককে জল দেওয়ার অপরাধে বিধান মার্কেটের দোকানদারদেরও পিটুনি জোটে। লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে আসা পুলিসের থেকে বাঁচতে কাছেই প্রেস ক্লাবের তাঁবুতে ঢুকে আশ্রয় নেন আক্রান্ত সাংবাদিকরা। লাঠিচার্জের আগে কাঁদানে গ্যাস তথা লঙ্কা গ্যাসের ঝাঁজে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যারা তাদের শ্রুশ্রূষার জন্য পুলিশের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েও লাভ হয়নি।

অতীতে অজস্র বার এহেন পরিস্থিতিতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সূত্রে ঘটনাক্রম আন্দাজ করতে পারি। মিছিল বা সমাবেশকারী বিরোধী দল ও পুলিশ তথা সরকারি দলের তরফে পারস্পরিক প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পুলিশি উন্মত্ততার পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য করে বিস্তর ইটপাটকেল ছোঁড়া হয়েছে তা টিভিতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকরা তো ইট ছোঁড়েননি। তারা পেশাগত দায়ে পথে নেমে বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের উপর এই হিংস্র আক্রমণ কেন?

বিজ্ঞাপন

এ রাজ্যে, বলা ভাল, গোটা দেশেই পুলিশ শাসক দলের সেবাদাসে পরিণত অনেক কাল ধরেই। শাসকদের নির্দেশে বা তাঁদের খুশি করতে ওপরতলার অফিসাররা আইনি ও বেআইনি নানা উপায়ে বিরোধীদের সভা-সমাবেশ বন্ধ বা মিছিলের পথ আটকানোর নির্দেশ দেন। জনতা এগোতে চাইলে সংঘর্ষ বাঁধে। ইট-পাটকেলের জবাবে লাঠি-গ্যাস- জলকামান, এমনকি গুলি চলে। পুলিশকর্মীরা মার খেলে বা তাঁদের মাথা ফাটলে বাঁধনছাড়া ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী হয়ে ওঠেন। উর্দিধারী ও উর্দিহীন দু তরফেই রক্তক্ষয় বা প্রাণহানি কাম্য নয়। যে হেতু বৈধ অস্ত্র পুলিশের হাতেই, তাই মিছিলে আসা বা না-আসা সাধারণ মানুষ বেশি মার খান এবং প্রাণ হারান।

এরপরের রাজনৈতিক তরজার মর্মার্থ শঙ্খ ঘোষের অমোঘ শব্দে: পুলিশ কখনও অন্যায় করে না যতক্ষণ তারা আমার পুলিশ।

ক্ষমতার নেই কোনও মমতা

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায় ক্ষমতায় আসার আগে অসংখ্যবার রাইটার্স অভিযান/অবরোধ করেছেন। জঙ্গি আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে রাইটার্সের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছেন। কখনও ঢুকে পড়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘরের সামনে সপার্ষদ বসে পড়েছেন। পুলিশ চুলের মুঠি ধরে পিটিয়ে তুলে দিয়েছে।  বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন সিপি এম-এর ক্যাডার ও পুলিশ বাহিনীর হাতে তিনি অসংখ্যবার নিগৃহীত হয়েছেন। তাঁর আন্দোলনের খবর করতে নেমে মার খেয়েছেন সাংবাদিকরাও। এই মেয়ো রোডেই গুলি চলেছে, প্রাণ গিয়েছে তরতাজা ১৩ জন তরুণের। সেদিনও পুলিশ সাংবাদিকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠায়। তখন তাঁর কাছে যা ছিল গণতন্ত্র হত্যা, পুলিশি বর্বরতা, আজ তা তাঁর চোখে ক্ষমতালিপ্সু বিরোধীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের মোকাবিলায় আইনরক্ষকদের ন্যায্য ভূমিকা। পুলিশ কর্তাদের প্রাথমিক আশ্বাসে সাংবাদিকদের আশা ছিল, জেলাসফর থেকে ফিরে সব জেনে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের উপর পুলিশি নির্যাতন নিয়ে খেদ প্রকাশ করবেন । কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি যাওয়ার প্রাক্কালে ফুৎকারে সেই আশা নিভিয়ে দিয়েছেন মমতা।

দোষী পুলিশ কর্মী ও অফিসারদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাওয়ায় ‘গণশক্তি মার্কা প্রশ্নের আমি জবাব দিই না’ বলে প্রশ্নকর্তা একটি জাতীয় চ্যানেলের তরুণ সাংবাদিককে মুখঝামটা দিয়ে থামিয়ে দেন। বস্তুতঃ ঘটনার দিনই মমতা আনন্দবাজারে তাঁর এক অনুগত সাংবাদিককে জানিয়ে দেন, যারা মার খেয়েছে তাঁরা সব গণশক্তির লোক। যেন বিরোধী দলের কাগজের সাংবাদিকদের পেটানোর অধিকার পুলিশের আছে। যদিও পরে দেখা গেছে আহত সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ সিপিএম মুখপত্রের কর্মী নন।

বস্তুত, মতাদর্শ বা ঝান্ডা নির্বিশেষে সমস্ত শাসকদল বা তা তাঁদের নেতাদের মধ্যে এই প্রবণতা কমবেশি মজ্জাগত। এই রাজ্যে এর আগে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ‘আমরা ২৩৫ ওরা ৩৫’ দম্ভোক্তি শুনেছি। পাড়ায় পাড়ায় তাঁর দলের পায়াভারী নেতাদের প্রতাপ সয়েছি। ক্ষমতার মেদ ঝরে যেতে আজ তাঁদের মুখে ফের গণতন্ত্রের কথাও শুনছি। আর মমতা ও তাঁর অনুগামীরা ওঁদের জুতোয় পা গলিয়ে ভাবছেন চিরদিন এমনটাই যাবে। কিন্তু এমনটা চললে পরিবর্তনের পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী। ইতিমধ্যেই মোদি-অমিত শাহ জুটির নেতৃত্বে বি জেপি তথা সঙ্ঘ-পরিবার বঙ্গবিজয়ের জন্য তাল ঠুকছে। বিরোধী দলগুলি এবং মিডিয়ার প্রতি অসহিষ্ণুতায় গেরুয়া বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিলে আখেরে ওঁদেরই পাল্লা ভারী হবে।                          

প্রেস ক্লাবের ভূমিকা

দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই মরিচঝাঁপি থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব পর্যন্ত দেখেছি সাংবাদিকদের মধ্যে দলাদলির জেরে কলকাতা প্রেস ক্লাব ও অন্যান্য পেশাগত মঞ্চগুলিতেও প্রতিবাদ দানা বাঁধতে পারেনি। শাসক শিবিরভুক্তরা ঘটনার গুরুত্ব লঘু করতে চেয়েছেন, প্ররোচনার অভিযোগ তুলেছেন, প্রশাসনিক ও দলীয় স্তরে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করে প্রতিবাদ স্তব্ধ করতে চেয়েছেন। আবার বিরোধীদের হাতে সরকারপক্ষীয়রা মার খেলে তারাই নিন্দায় সরব হওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আমাদের মধ্যে যারা ট্রাপিজের খেলায় দক্ষ তাঁদের ভূমিকা বদল ঘটেছে মাত্র।

প্রেস ক্লাবের নতুন নেতৃত্ব এবারের সাংবাদিক নিগ্রহকে ‘অনভিপ্রেত ও দুর্ভাগ্যজনক’ বলে নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তাতে পদাধিকারীদের স্বাক্ষর ছিল না। সম্পাদককেন্দ্রিক ক্লাব হলেও তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সফরসঙ্গী থাকায় শহরে ছিলেন না। সভাপতিও সপরিবারে দিল্লিতে ছুটিতে থাকায় সহ-সভাপতিকে দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁদের অগোচরে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এমন নয়। তবে কেন তাঁরা বা বকলমে ভারপ্রাপ্তরা সই করলেন না? উত্তর পাইনি। সহ-সভাপতি আহত সাংবাদিকদের দেখতে হাসপাতালে যান। বাম জমানায় এ ধরনের ঘটনায় প্রতিবাদের ধরন ও মাত্রা নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারপন্থী ও বিরোধীদের অনেক রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও ক্লাবে সভা বা মিছিল হয়েছে। এবারও তা ডাকার জন্য সদস্যদের অনেকের আগ্রহ।

কিন্তু ঘটনার দিন ও তার পর সভাপতি ও সম্পাদকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে যে প্রতিক্রিয়া জেনেছি তাতে স্পষ্ট তারা আর এগোবেন না। সভাপতির যুক্তি—প্রতিবাদ সভা ইত্যাদি ডাকার দায় সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলির। ক্লাব বিনোদিনী, সামাজিক মেলামেশার মঞ্চ। প্রতিবাদের নয়। তিনি ও সম্পাদক দুজনেই লালবাজারের এক কর্তার বিবৃতি তথা পুলিশি বাড়াবাড়ির অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসে আস্থা রাখছেন। সম্পাদক জানিয়েছেন, লাঠিচার্জের পর কলকাতা থেকে সহকর্মীদের ফোন পেয়ে তিনি তা মুখ্যমন্ত্রীর গোচরে আনেন। মমতার নির্দেশে প্রশাসনের কর্তাদের কথায় রাতে ঐ পুলিশি আশ্বাসবাণী। সম্পাদকের অভিযোগ, তা সব মিডিয়া সমান ভাবে গুরুত্ব দেয়নি।

বন্ধুস্থানীয় সভাপতির আরও  যুক্তিঃ আই জে এ- এন ইউ জের মতো বড় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি থাকতে সাংবাদিকদের সামাজিক মেলামেশার মঞ্চ ক্লাবকেই কেন প্রতিবাদ সভার দায় নিতে হবে। আমি জানি তিনি ওয়াকিবহাল যে ক্লাবের সংবিধানে ঘোষিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমালার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান এই যুক্তি। সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও রুটি-রুজির উপর সরকারি-বেসরকারি যে কোনও ধরণের আক্রমণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার রয়েছে এই ঘোষণায়।

অনুজ সম্পাদক জানালেন তিনি ক্লাবকে কেন্দ্র করে ‘রাজনৈতিক প্রতিবাদ’- এ বিশ্বাসী নন। এর বদলে তিনি সরকারকে ধরে সাংবাদিকদের পেনশন আর আবাসনের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে চান যেটা নাকি এ ধরনের প্রতিবাদে বড় ধাক্কা খেয়ে যাবে। পেনশন আর আবাসনের ইস্যু সাংবাদিক মহলে জনপ্রিয় সন্দেহ নেই। এ নিয়ে উদ্যোগও সাধুবাদযোগ্য। তবে বাম আমল থেকেই চেষ্টা চলছে। ভোটার মনোরঞ্জনী প্রশ্নে প্রত্যেক বছর নির্বাচিত কমিটি দাবি করে তারা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমার মতো অনেক পুরোনো সদস্যের সন্দেহ, এটা আসলে সব সরকারের আমলেই সাংবাদিকদের বশে রাখতে সরকারের গাজর ও লাঠি নীতির অংশ। খুড়োর কল মাথায় বেঁধে দৌড়ে চলে আমরা যাতে এখনকার মার আর অপমানটা ভুলে থাকি এটা সব শাসকই চান। আর ক্লাবের ভিতরে-বাইরে তাদের অনুগামী বা অনুরাগীরা এটাকে আজকের স্বাধীনতা বনাম ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ইস্যু হিসাবে দাঁড় করান। এতে ওঁদের ভোট পেতে বা বিনা ভোটেই জিতে যেতে সুবিধে হয়। যদি আত্মপ্রবঞ্চনা করে থাকেন তবে হয়তো অচিরেই নিজের ভুল ভাঙবে। আর যদি সকলের চোখে ধুলো দিয়ে মৌরসিপাট্টা রক্ষাই মোক্ষ হয় তবে আজ না হোক কাল মিথ্যেটা ধরা পড়বে।

বাস্তবতা হচ্ছে শহরের সব মত-পথের নানা প্রজন্মের সাংবাদিকদের মিলিত ও সবচেয়ে বড় মঞ্চ, দেশের সব চেয়ে পুরোনো এই প্রেস ক্লাব। ক্লাবের ডাকে বা তাঁর মঞ্চে সমবেত প্রতিবাদের ধার-ভার অনেক বেশি। সেটা দলদাস বা মোসাহেবরা ভালই বোঝে। বাম জমানার তিন দশকে নানা সময়ে ক্লাবের নেতাদের কাছে বারবার এই সব দায়-এড়ানো যুক্তি শুনেছি। এ আমাদের সামূহিক ক্লৈব্য আর ধারাবাহিক অধোগমনের প্রতীক।

আগের জমানায় প্রাক্তন শাসক দলের সদস্য বা অনুরাগীদের তরফে সাংবাদিকদের উপর পুলিশি বা দলীয় ক্যাডারদের হানার ঘটনাকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা বা প্রতিবাদ আটকানো হলে আমরা মানিনি। দলতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা পরিবর্তনের জমানায় কেন মানব? আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা, পেশাগত ঐতিহ্যবোধ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা কী শাসকের ঝান্ডার রং আর পুলিশের ডান্ডার জোর দেখে বদলাবে? হাওয়ামোরগ, ধান্দাবাজ মোসাহেবদের রমরমা আগেও ছিল। তাদের বাধা টপকে আমরা যদি আগে ন্যায্য প্রতিবাদ করতে পারি, এখন কেন পারব না? সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি এবং দোষী অফিসারদের শাস্তির দাবি জানাতে পারব না?

তরুণদের প্রতিবাদ

ক্লাবের নেতাদের তোয়াক্কা না রেখে আক্রান্ত সাংবাদিক-চিত্র সাংবাদিক এবং তাঁদের সহকর্মী-সহমর্মীরা, অধিকাংশই তরুণ ছেলেমেয়ে, লাঠি চার্জের পরদিনই সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে প্রতিবাদ মিছিলে পা মেলান। কোনো সংগঠনের ব্যানার ছাড়াই আকাডেমি থেকে লালবাজার, এই দীর্ঘ পথে পুলিশি নির্মমতার বিরুদ্ধে ধিক্কার উচ্চারিত হয়েছে নীরবতার ভাষায়, কার্টুন, হাতে লেখা পোস্টারে। লালবাজারে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন মিছিলের প্রতিনিধিরা। দাবি জানান, নিগ্রহকারীদের শাস্তি দিতে হবে। বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস নিয়ে ফিরলেও কার্যকর হওয়ার লক্ষণ এখনও নেই। তবু ওঁদের অভিনন্দন। নিজেদের মৌরসিপাট্টা কায়েম করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নেতারা যে ক্লাবকে তরুণ প্রজম্মের সাংবাদিকদের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, ক্লাব যে আজ বিশেষ কিছু সাংবাদিক গোষ্ঠীর তল্পিবাহক, এই প্রতিবাদ তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আমাদের প্রজন্মের ক্লাবকেন্দ্রিক প্রতিবাদভাবনাকেও ওরা বড় ধাক্কা দিতে পেরেছেন।

মিডিয়া বিস্ফোরণের সূত্রে পেশার বৃত্ত ব্যাপক ছড়িয়ে পড়লেও টিভি, ডিজিট্যাল মিডিয়ার যুগে তরুণতর সাংবাদিকদের জন্য ক্লাবের দরজা কার্যত বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এমনকি প্রবীণ চিত্র-সাংবাদিকরা চোখের জল ফেলেও ভোটাধিকার সহ সাধারণ সদস্য পদ পাননি। অথচ অনেক দিন ধরেই পেছন দরজা দিয়ে টাকার জোরে এবং ক্ষমতার বৃত্তে থাকা কর্পোরেট ও রাজনীতির জগতের লোকেরা ঢুকে পড়ছে অবাধে। ক্লাবের সংবিধান বদলে সব মাধ্যমের সব ধরনের সাংবাদিকদের জন্য ক্লাবের সদস্যপদ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব বহু বছর ধরে নানা কায়েমি স্বার্থের চাপে ধামাচাপা পড়ে আছে।

মিডিয়ার ভিতরে-বাইরে নানা বাধা সত্ত্বেও বাংলার সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা চেতনার ঐতিহ্যকে তরুণ প্রজন্ম বয়ে নিয়ে যাবেন এই আশা রাখি। ওঁদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে। পুলিশের তরফে ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট বিলি করা হচ্ছে। বিদেশে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে থাকা ‘এমবেডেড’ সাংবাদিকদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কিন্তু নিজেদের শহরে সভা- সমাবেশ কভার করতে গিয়ে আমাদের হাতের নোটবই- কলম বা ক্যামেরা- বুম, সরকারি ও মিডিয়া হাউসের পরিচয়পত্র কী যথেষ্ট নয়। তার থেকে বড় কথা, এর পিছনে মতলবটা কী? যত দূর জানি, সরকারি পরিচয়পত্রের বিনিময়ে এই জ্যাকেট প্রাপ্তির ব্যবস্থা। বহু সাংবাদিক- চিত্র সাংবাদিকের তা নেই। এ রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার- ঘনিষ্ঠ কিছু সাংবাদিকের কমিটি। এঁরা কোন প্রতিনিধিত্ব মূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে কমিটিতে জায়গা পান না। মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর দলের প্রতি অনুরাগ- প্রদর্শনই এঁদের প্রধান যোগ্যতা।

এখন শোনা যাচ্ছে নবীনদের সরকারি পরিচয়পত্র পেতে সাহায্য করা হবে। বিনিময়ে দাদাদের পথে হাঁটতে হবে। তরুণদের কাছে আবেদন, এই টোপ গিলবেন না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারি পরিচয়পত্র পেশাদার সাংবাদিকের অধিকার, শিরদাঁড়া জমা রাখার মূল্যে কোনও বিশেষ সুবিধা নয়। ভি ভি আই পি নিরাপত্তা বলয়, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত অঞ্চলে ঢুকতে গেলে বিশেষ অভিজ্ঞান লাগে। সেটার প্রেক্ষিত আলাদা। কিন্তু সাধারণ সাংবাদিকতায় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে সরকার-স্বীকৃত হাউসের উর্দিধারী সাংবাদিক আর অসংখ্য অনামী কাগজ-চ্যানেল-ওয়েবসাইটের উর্দিহীন, মুক্তবল্লম সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন সাংবাদিক এবং নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে বিপদজনক হয়ে উঠবে।(সংক্ষেপিত)

ছবি: ফেসবুক এবং ইন্টারনেটের সৌজন্যে

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here