যেমন আছেন তিনি, পূরবী গুহ

0
783
পাপিয়া মিত্র

বাড়ির গ্রামোফোনটায় গান চালিয়ে তুলে নেওয়াটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছিল। নিতান্তই শিশুকাল, সুরে সুরে গানটা ঠিকই গাইত মেয়েটি। মেয়েটির যখন ১১ বছর বয়স, তাকে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় হাত ধরে নিয়ে গেলেন সাহিত্যসভায় গান গাওয়ার জন্য। সেই প্রথম বাইরে গান গাওয়া। তবে সেই গান গাওয়া শান্তিনিকেতনে এবং তা শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সামনে।

এর পরে সঙ্গীতসরণি এগিয়ে গিয়েছে। ছাত্রী থেকে সঙ্গীতশিক্ষিকা। মাঝে নানা চড়াই-উতড়াই, দীর্ঘ জীবনপথের পথিক তিনি, আজ বড় ক্লান্ত। বাড়ির বড় বউ একধারে, অপর পারে সঙ্গীতজীবন, সঙ্গে স্কুলশিক্ষিকার দায়িত্ব। মাঝখান থেকে হারিয়ে ফেললেন নিজের সুকন্ঠের মাধুর্য। তিনি সঙ্গীতশিল্পী পূরবী গুহ, আজ তিনি ৮৫।

পথিকের জীবনযাত্রা কেমন ছিল পিছনে তাকানো যাক। বাবা হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মূলত প্রাবন্ধিক, জামশেদপুরের একটি স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু সময়টা ১৯৪২, এক জন শিক্ষককে সব সময় কিছু ছাত্র ঘিরে রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের চোখে তা ভালো ঠেকল না। সন্দেহের বশে ফুলহারি শরিফ জেলে আটকে রাখা হল তাঁকে। তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হল, কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না। তিনমাস পরে ছেড়ে দিল সরকার। কিন্তু একটা শর্তে, সিংভূম জেলায় আর ফিরতে পারবেন না।

বিজ্ঞাপন

এলাকার মানুষজন অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন দত্ত পরিবারকে। তাই ছোটো তিন সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী প্রমীলা দত্তের কোনো অসুবিধা হয়নি। সাত দিন পরে কলকাতায় চলে আসা। তার পর? “বাবা থেকে গেলেও বাকিরা চলে গেলাম পূর্ববঙ্গে”, বলছিলেন পূরবীদেবী। কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর সাবডিভিশনের বাবুরহাট গ্রামে বসবাস। ঠাকুরদা সারদাচরণ দত্ত গ্রামের যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, সেই স্কুলটিকে তিনি প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে পরিণত করেছেন।

আজ এই ৮৫ বছরে এসে অতীতের কোনো কথা মনে রাখতে চাই না

সময় ১৯৪৩, হীরেন্দ্রনাথের এক বন্ধু তখন শান্তিনিকেতনে চাকরি করতেন। তাঁর সাহায্যে শান্তিনিকেতনে পাঠভবনে হীরেন্দ্র চাকরি পেলেন ও কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে অবসর গ্রহণ করেন। সেই বছরেই পুজোর পরে সকলে শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লিতে বসবাস শুরু করলেন। ক্রমে পাঠভবনের ছাত্রী হয়ে উঠলেন পূরবী ও ক্রমে ভাই-বোন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও সঙ্গীতজীবন কাটিয়ে বৈবাহিক জীবনকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতায় পূরবী। এর মাঝে শুরু হয়ে যায় কর্মজীবন।

কর্মজীবনে ঢুকে পড়ার আগে শান্তিনিকেতনের শুরুর জীবন কেমন ছিল?

হীরেন্দ্রনাথের কর্মসূত্রে সকলের গুরুপল্লিতে থাকা। শান্তিনিকেতনের আকাশে-বাতাসে শুধু গান আর গান। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির পিছনে পূরবীদের বসবাস। ছোটোবেলাকার শেখা গান গলা ছেড়ে গাইত। পুজোর পরে কণিকা তখন শান্তিনিকেতনের বাইরে। ফিরে শুনলেন পিছন দিকের বাড়ি থেকে একটি ছোটো মেয়ের গান ভেসে আসছে, খুব ভালো গায়। প্রথম শিক্ষার সূত্রপাত বা প্রথম বাইরে গান গাওয়া কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। তখন সঙ্গীতভবনের অধ্যক্ষ ছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদার। পাঠভবনে ভর্তি না হয়েও প্রথম সাহিত্যসভায় যোগ দেওয়া এবং গান গাওয়া। এর পরে পাঠভবনে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন। ক্রমে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ছাত্রী হয়ে উঠলেন।

সেই সময় নীলিমা সেন, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসাদ সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বেশ কয়েক জনকে নিয়ে দল গড়েছিলেন শৈলজারঞ্জন। সেখানে পূরবী ছিলেন সকলের থেকে ছোটো। তিনিও দলে থেকে নানা জায়গায় অনুষ্ঠান করতেন।

“সঙ্গীতভবন, কলেজ ও পাঠভবনের কিছু বাছাই দলের সঙ্গে আমি গান গাইতাম আর কলকাতা ও দিল্লিতে যে সঙ্গীত সম্মেলন হত তাতেও গান গাইতাম। এত বেশি অনুষ্ঠান হত যে পড়াশোনার কথা আলাদা করে ভাবার অবকাশ ছিল না” — প্রায় একটানা কথাগুলো বলে একটু থামলেন পূরবী। উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে লাগলেন। কিছু মনে পড়ল কি? “‘আর নাইরে বেলা নামল ছায়া ধরণীতে’ ও ‘ডাকব না ডাকব না’, এই দু’টি গান প্রথম বেতারে গাওয়া। আর শৈলজাদা তাঁর একটি প্রিয় গান আমাকে শিখিয়েছিলেন অনেক ছোটোবেলায়, ‘আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে’। ‘ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ গানটিও আমি খুব গাইতাম।”

গান আর নানা অনুষ্ঠানের সঙ্গে বেশ জড়িয়ে পড়লাম। একবার তো বাবা ভীষণ রেগে গেলেন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগের দিন আমার ডাক পড়ায়। বসন্তোৎসবের নাচের জন্য। নন্দলাল বসুর মেয়ে গৌরীদি ও যমুনাদি বাউল আঙ্গিকের নাচ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। নাচ গান নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে প্রতি দিন টিফিনের পরে কোনো ক্লাস করতে পারতাম না।”

শান্তিনিকেতন পূরবীকে এমন ভাবে জড়িয়ে ফেললেও এমএ পাশ করে একবারে চাকরিতে যান। তবে সঙ্গীতের পাশাপাশি পড়াশোনাকে কোনো দিন অবহেলা করেননি। ১৯৫২-তে গ্র্যাজুয়েশনে প্রথম স্থান লাভ ও বিশ্বভারতী থেকে এমএ উত্তীর্ণ। বিষয় ছিল বাংলা।

শান্তিনিকেতন থেকে কর্মস্থল হল ভাগলপুরের কলেজে। অবসর নেওয়ার পরে বাবা হীরেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্বপল্লিতে জ্যেষ্ঠ কন্যা ‘পূরবী’র নামে বাড়ি করেন। মা-বাবা, ভাইবোনেরা থেকে গেলেন পূর্বপল্লিতে। ১৯৫৬-তে চাকরি আর ১৯৭০-এ সাহিত্যিক অরবিন্দ গুহ তথা ইন্দ্রমিত্র-র সঙ্গে বিবাহ। কলকাতায় চলে এলেন পূরবী।

শান্তিনিকেতনে জীবন কাটালেও অত্যন্ত ঘরোয়া ছিলেন শিল্পী পূরবী। কলকাতায় যৌথ সংসারে বড়ো বউয়ের দায়িত্ব পালনে দিন যেতে লাগল। কেউ যেমন এগিয়ে যেতে বলেননি, তেমনই সংসারের কেউ কিছু বন্ধ করতেও বলেননি। তাই সবটা করে আবার চাকরিতে যুক্ত হওয়া। ‘জোকা ব্রতচারী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যাশ্রম’-এ চাকরি। সঙ্গীতশিক্ষিকা হিসেবে ‘সুরঙ্গমা’তে যুক্ত হলেন ১৯৭১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। নিয়মিত রেডিওর অনুষ্ঠান থেকে সরে এলেন ২০০০-এ। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়িতে গানের ক্লাস করা আর স্কুলের চাকরিটা করা। যৌথ সংসার আর নিজের ছোট্টো কন্যা, সব সামলানো মুখের কথা নয়।

“আজ এই ৮৫ বছরে এসে অতীতের কোনো কথা মনে রাখতে চাই না”, অভিমান ঝরে পড়ল পূরবীদেবীর কথায়।

দিনে দিনে চোখের সমস্যা বেড়েছে। তাই গীতবিতান না খুলে খুলে, দেখতে না পেয়ে আজ সব গানই ভুলে যাওয়ার পথে। এক জন শিল্পীর কাছে এ যে কত বেদনার তা সহজেই অনুমেয়।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here