মেজাজে আন্তর্জাতিক নোবেলজয়ী ইশিগুরোর লেখা পড়ুন, ঠকবেন না

0
6928
kazuo ishiguro

প্রসিত দাস

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কাজুও ইশিগুরো। এ বারের পুরস্কারের দৌড়ে পাল্লা ভারী ছিল বয়সে  প্রবীণ কানাডার খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক মার্গারেট আটউড ও গোটা দুনিয়া জুড়ে বেস্টসেলার জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির। কিন্তু সাহিত্যমহলকে কতকটা তাক লাগিয়েই এ বারের পুরস্কার প্রাপক জন্মসূত্রে জাপানি কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিক ইশিগুরো। এমনকি তিনি স্বয়ং খবরটা শুনে প্রথমটা বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। পরে অবশ্য বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না, কারণ খবর আসে খোদ সুইডিশ অ্যাকাডেমির তরফ থেকে।

ইশিগুরোর আগে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন জাপানের মাত্র দু’জন সাহিত্যিক – ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৯৬৮) ও কেনজাবুরো ওয়ে (১৯৯৪)। ইশিগুরো (জন্ম ১৯৫৪) অবশ্য নেহাত জন্মসূত্রেই জাপানি, বাবা-মায়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলে আসেন পাঁচ বছর বয়সেই, যদিও তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েছেন এর ঢের পরে, ১৯৮৩ সালে। তা ছাড়া কাওয়াবাতা বা ওয়ের লেখায় যে অর্থে জাপানি সত্তার একটা জটিল পরিচয় উঠে আসে তা ইশিগুরোর লেখায় আসে না। লেখেন ইংরেজিতে বলেই শুধু নয়, এই লেখক নানা অর্থেই ঢের বেশি আন্তর্জাতিক। এ দিক থেকে হালফিলের তথাকথিত ভারতীয় ইংরেজি লেখকদের তুলনায় তিনি সম্পূর্ণ ভিন গ্রহের বাসিন্দা। সোজা কথায়, নিজের জাতিগত পরিচয় তাঁর লেখার পুঁজি নয়।

কিন্তু আর শিবের গীত নয়, এ বার সোজাসুজি ইশিগুরোর লেখার ভুবনে প্রবেশ করা যাক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে, তাঁর উপন্যাসে “জগতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের যে বিভ্রম তার অন্তঃস্থলে থাকা অতল গহ্বরের উন্মোচন” ঘটে যায়। স্মৃতির জগৎ তাঁর লেখার অন্যতম উপজীব্য। কিন্তু এ দিক থেকে তাঁকে ঠিক মার্শেল প্রুস্তের আত্মীয় বলা যায় না। প্রুস্তের ‘হারানো সময়ের খোঁজে’-র মতো তাঁর লেখায় আকস্মিক ভাবে পরতে পরতে খুলে যায় না স্মৃতির ঝাঁপি, স্মৃতির অপ্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং তাঁর কথকরা স্মৃতির সফরে বেরোয় কতকটা সচেতন ভাবেই, আর এই সফরে তাদের বর্তমানের ভিত হয়ে ওঠে নড়বড়ে। আবার হয়তো জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ানো কিছু প্রশ্নের উত্তরেরও দেখা মেলে।

খুব বেশি যে লিখেছেন বাষট্টি বছর বয়সি এই লেখক, তা নয়। এখনও পর্যন্ত একটা গল্প সংকলন (‘নকটার্নস’) বাদ দিলে তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা মোটে সাত। এ ছাড়া অবশ্য লিখেছেন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জন্য চিত্রনাট্য, আর হ্যাঁ, গান। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ (১৯৮২)-কে আয়তনে উপন্যাসিকাই বলা চলে। এখানে কথক এক জাপানি ভদ্রমহিলা। তাঁর সাকিন ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চল। সদ্য আত্মহত্যা করেছে তাঁর এক মেয়ে। আরেক মেয়ে যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে তখন সেই সূত্রে তাঁর মনে পড়ে প্রথম যৌবনে নাগাসাকিতে কাটানো দিনগুলোর কথা। সদ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে আসা নাগাসাকির শহরতলিতে প্রতিবেশী এক মহিলা আর তাঁর মেয়ের সঙ্গে এক বিচিত্র বন্ধুত্বের স্মৃতি। শেষমেশ স্মৃতি আর বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ১০০ কোটির মানহানি মামলা ও স্বাধীন গণমাধ্য‌মের ভূমিকা 

সাহিত্যের প্রকরণ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন ইশিগুরো। তবে নিছক খেলা নয়, এর মধ্যে দিয়ে সময়ের নাড়িতে হাত রাখেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে উনিশ শতকি উপন্যাস পড়া প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন: “…তখন যেন কতকটা বোধিলাভের মতোই মনে হল যে আধুনিক জীবনের গল্প বলার জন্যও তো এই একই সব তরিকা কাজে লাগানো যেতে পারে। রাসকলনিকভের বৃদ্ধাকে খুন করার গল্প কিংবা নেপোলিয়নের যুদ্ধগুলোর গল্পই যে লিখতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। স্রেফ এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো নিয়েও তো একটা উপন্যাস লেখা যেতে পারে।” এর সঙ্গেই তাঁর মধ্যে আছে বৈচিত্র্যের খোঁজ। তাই তাঁর এক একটা উপন্যাসে উঠে আসে এক একটা ভুবন, সাহিত্যের এক একটা গোত্রও বটে। এই সূত্রে আমরা তাঁর তিনটে উপন্যাসের কথা আলাদা করে খেয়াল করব।

the remains of the dayসুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে ‘দ্য রিমেইনস অফ দ্য ডে’ (১৯৮৯)-র বিষয়বস্তু ‘স্মৃতি, সময়, বিভ্রম’। এই উপন্যাসের কথক স্টিভেনস নামে এক ইংরেজ খানসামা। সে যেন এক হারানো জগতের প্রতিনিধি। টনটনে তার দায়িত্ববোধ, তার চেয়েও টনটনে তার মর্যাদাবোধ। কিন্তু এই মর্যাদাবোধের খাতিরে সে কি তার জীবনের মানবিক সম্পর্কের দিকগুলোকে উপেক্ষা করেছে? ডায়েরির আদলে লেখা এই উপন্যাসে স্টিভেনসের স্মৃতির সফরে এই প্রশ্নের একটা উত্তর উঠে আসে, তার সঙ্গে উঠে আসে তার প্রাক্তন মনিবের এস্টেটে কাটানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের বছরগুলো, একই এস্টেটের কর্মচারী মিস কেন্টন নাম্নী এক মহিলার সঙ্গে তার বিচিত্র সম্পর্ক। উপন্যাসের শেষে স্টিভেনস নিজেকে পুনরাবিষ্কার করে। এই উপন্যাসের সূত্রেই ইশিগুরোর ম্যান বুকার প্রাপ্তি। হলিউডেও এই উপন্যাস নিয়ে ছবি হয়েছে, মূল চরিত্রে অ্যান্থনি হপকিনস।

when we were orphans‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফ্যানস’ (২০০০) আবার পা রেখেছে গোয়েন্দাকাহিনির পাড়ায়। এই উপন্যাসের কথক ক্রিস্টোফার ব্যাঙ্কস ১৯৩০-এর দশকের বিলেতে একজন প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দা। অথচ তাঁর নিজের জীবনেই একটা অসমাধিত রহস্য রয়ে গিয়েছে। সাংহাইতে তাঁর ছোটোবেলায় কয়েক সপ্তাহের ফারাকে নিখোঁজ হয়ে যান তাঁর বাবা ও মা। তাঁদের খোঁজে ব্যাঙ্কস একদিন পাড়ি জমান ফেলে আসা সাংহাইতে। তার ‘তদন্ত’-এর পরতে পরতে জড়িয়ে যায় উপনিবেশের জগৎ, আফিম ব্যবসা, চিন-জাপান যুদ্ধের মতো ঘটনা। আর উপন্যাস যত এগোয় গোয়েন্দাকাহিনির চেনা ছকটা ততই ওলোটপালোট হয়ে যেতে থাকে। আমাদের চিরচেনা সত্যাণ্বেষী গোয়েন্দাকে কেমন যেন দিশেহারা মনে হয়। শেষে অবশ্য সত্যের একটা হদিশ তিনি পান, তবে তা আসে নেহাতই অপ্রত্যাশিত চেহারায়।

আমাদের তালিকায় শেষ উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ (২০০৫) গোত্রে কতকটা কল্পবিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত। হেইলশ্যাম নামে এক বোর্ডিং স্কুলের তিন ছাত্রছাত্রী ক্যাথি, রুথ ও টমির মধ্যে এক জটিল বন্ধুত্বের গল্প আমরা শুনি ক্যাথির জবানিতে। গোড়া থেকেই পাঠক আঁচ পান কোথায় যেন একটা রহস্য আছে, এই স্কুল ঠিক আর পাঁচটা স্কুলের মতো নয়। পরে বোঝা যায় এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আসলে সবাই ক্লোন, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার পর তাদের সকলকেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে হবে। এটাই তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, মৃত্যুরও। এই উপন্যাসে ইশিগুরো আমাদেরকে সটান নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন এক দুঃস্বপ্নলোকের মধ্যে, প্রযুক্তিজাত যে দুঃস্বপ্নলোক আজকের বাস্তবতা, কিন্তু তার মধ্যে বুনে দিয়েছেন কোমল মানবিক অনুভূতিগুলোর গল্পও।

never let me goআজকের দুনিয়ায় যখন চারি দিকে কাঁটাতারের বাড়বাড়ন্ত, যখন ‘শেকড় খোঁজার’ নামে সংস্কৃতি হয়ে উঠছে রক্ষণশীল পরিচয়গুলোকে কায়েম করার রণাঙ্গন, তখন মেজাজে আন্তর্জাতিক এই লেখকের নোবেলপ্রাপ্তি কিছুটা তাৎপর্যপূর্ণ তো বটেই। বাঙালি পাঠক, এঁকে পড়ুন, ঠকবেন না।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here