কেপিএস গিল মানে শুধু পঞ্জাব নয়, রূপেন দেওল বাজাজ-ও

0
579
সুঅঙ্গনা বসু

‘কে. পি. এস গিল মারা গেছেন’। অফিস থেকে বেরোনোর মুখে চট করে নিউজ আপডেটে চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে বললেন এক সহকর্মী। আমারও প্রথম প্রতিক্রিয়া –  লোক তেমন ভাল ছিল না, রূপেন দেওল বাজাজের সঙ্গে যা করেছিল। উল্টোদিকের প্রতিক্রিয়া – সে তুচ্ছ ব্যাপার, পঞ্জাবকে শান্ত করে তো দিয়েছিল। চুপ করে যাই, এসব নিয়ে আম জনতার সঙ্গে তর্কে যেতে ইচ্ছে করে না আজকাল। কে পি এস গিল শুনলে ওই মহিলার নামই প্রথম মনে পড়ে। এছাড়াও মনে পড়ে মাচিস ছবির সনাতনের কথা। গুলজারের লেখা সংলাপ ওম পুরীর উচ্চারণে – পরিবারে কেউ নেই, কারণ বেশিরভাগ মারা গেছিলেন ৪৭-এ দেশভাগের সময় আর বাকিরা ৮৪-র শিখ দাঙ্গায়। সুতরাং কে পি এস গিল নিয়ে মতান্তর থেকে গেল।

১৯৮৮ সাল। সে বছরই আমির খানের প্রথম ছবি মুক্তি পেয়েছে। উঁচু ক্লাসের এক দিদি বলছিল এ নায়ক নাকি চুম্বকের মত আকর্ষণীয়। স্কুলবাসে শোনা কথাটার যথার্থ মানে ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি তখনও। অর্থাৎ কী না পুরোপুরি বড়ো হইনি। কিন্তু ওই বছরেই হইচই ফেলে দেওয়া রূপেন দেওল বাজাজের ঘটনাটা স্মৃতিতে থেকে গেছে। কেউ বলে দেয়নি এটা মনে রাখো, এটা তোমার সিলেবাসের মধ্যে পড়ে। শরীরের মধ্যে ঢুকিয়ে নাও। তবু খবরটা মনে রয়ে গেল। আবছা, ঝাপসা, বোঝা না বোঝায় মস্তিষ্ক কেন জানি না কখনওই ঝাড়াই বাছাই করে এই নামটাকে ফেলে দেয়নি। আমাদের মধ্যবিত্ত-প্রগতিশীল বাড়ির পরিসরে নিশ্চয়ই খবরটা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কীভাবে ‘বাট স্ল্যাপিং’ (হালকা করে পশ্চাদদেশে বন্ধুত্বপূর্ণ চাপড় মারা) খবরের শিরোনামে এল এবং কেন এই আচরণে মহিলার মর্যাদা লঙ্ঘন করা হয় শুনেছিলাম, সম্যক বুঝিনি। ক্ষমতার রসায়ন সম্পর্কে তখনও কিছুই জানা নেই। তবু এরকম একটা ‘আপাত তুচ্ছ’ ঘটনার প্রতিবাদ করাও যে যথেষ্ট কঠিন কাজ সেটাই বোধহয় ছাপ ফেলে গেছিল অবচেতনে। স্বজাতি রূপেন দেওল বাজাজকে তাই আমি ভুলতে পারলাম না।

দেশ যেদিন তাঁর দক্ষ সন্তান ও অমিত শক্তিধর ‘সুপারকপ’কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাবে, রূপেন দেওল বাজাজের কী মনে হবে জানা নেই, আমার কিন্তু তাঁর মুখটা মনে পড়বে।  প্রার্থনা করব আমার দেশের সার্বভৌমত্বের আলোর নীচে এমন কোনো অন্ধকার যেন খুঁজতে না হয়।

‘সুপারকপ’ কে পি এস গিলের মৃত্যুর খবরগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি শিরোনাম দেখলাম কে পি এস –এর দীর্ঘকালের সহযোগী জুলিও রিবেইরিও-র জবানিতে – “ K P S will always be remembered as the terminator of Khalistani terror”.

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আমার স্মৃতির তাহলে কী হবে? যেদিন ভারত রাষ্ট্র তাঁর ‘সুপারকপ’কে রাজধানীতে গান স্যালুট দেবে সেদিন কী আমার স্মৃতি তাঁর বৈধতা হারাবে? কারণ আমার তো এখনও কে পি এস গিল শুনলে প্রথমে ওই ‘বাট স্ল্যাপিং’ কেসের কথা মনে পড়ে।

১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় রূপেন দেওল বাজাজ মামলায় কে পি এস গিলের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এর পরেও কেস চলে অনেকদিন। ১৯৯৫ সালের ২৫ অক্টোবর আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ব্রট ডাউন আ পেগ’ নামক প্রবন্ধে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ রয়েছে। উল্লেখ আছে রূপেন বাজাজ বলেছিলেন, এটি কোন সাধারণ যৌন হয়রানির ঘটনা নয় – অমিত ক্ষমতা এবং দাম্ভিকতার বোধ থেকেই কে পি এস যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করেছিলেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল এর থেকেও অনেক বেশি কিছু করে তিনি পার পেয়ে যাবেন। ঠিক এই কথারই সমর্থন পাওয়া যায় কে পি এস–এর আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি নথিতে। আউটলুক পত্রিকার ওই প্রবন্ধ জানাচ্ছে নিজের ডিফেন্সে ঘটনাটিকে ‘তুচ্ছ’ বলেই বর্ণনা করেছিলেন সুপারকপ।

আমার এক নারীবাদী পুরুষবন্ধু বললেন গিল সম্পর্কিত যে কোন অবিচুয়ারিতে বাজাজের নাম আসছে, এটাও তো শাস্তি। জীবন চলে গেছে বেশ কিছু বছরের পার। ১৯৮৮ সালে বাজাজের বয়স ছিল ৪২। বয়স আমারো মুখের রেখায়। ক্ষমতার সমীকরণ ভালোই বুঝি। মেয়েরা এখন আরো অনেক বেশি সংখ্যায় বাইরের কাজে আসছেন। কিন্তু ‘তুচ্ছ’ ঘটনা বলে মহিলা অভিযোগকারিণীকে চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কি কমল? আশে পাশে কত ঘটনা ঘটে চলেছে, আমরাই তো বলি ট্যাকল করে নিতে, নরমে গরমে গা বাঁচিয়ে এগিয়ে চলতে। কথা বললে থেমে যেতে হতে পারে তাই অভিযোগকারিণীর ‘ভাল’ চেয়েই তো অন্য পথে সমাধান খোঁজার পরামর্শ দিয়ে দিই – যতক্ষণ সত্যি ‘বড়ো’ কিছু না ঘটছে। অভিযোগ করলে চেনা সমীকরণ বদলে যায়। রূপেন বাজাজ এবং তাঁর স্বামী দুজনেই আইএএস অফিসার ছিলেন। ক্ষমতার অলিন্দে, লবির টানাপোড়েনে এগিয়েছে বিচারের দীর্ঘ পথ। উইকিপিডিয়া বলছে ভারতবর্ষের অন্যতম বহুল প্রচারিত, হাই প্রোফাইল আইনি লড়াই এটি। ঘটনার ১৭ বছর পর ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার চূড়ান্ত রায় দেয়। প্রসঙ্গত, এত দীর্ঘ পথ পেরোনোই মুশকিল অনেক সাধারণ অভিযোগকারিনীর পক্ষে, মাঝপথে হারিয়ে যেতে পারে কেরিয়ার- ইমেজ ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কর্মজীবনের অনেকখানি পার করে এসে বলতে পারি সিংহভাগ পুরুষ সহকর্মী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, ভালবাসা, স্নেহ এবং বন্ধুতা দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। তবু ‘তুচ্ছ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঘটনাগুলিও তো বিচ্ছিন্ন নয়।

হিন্দুস্তান টাইমসের মহিলা সাংবাদিক লিখছেন – গিল সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। আওড়াতেন শেক্সপিয়ার। বিয়ার মাগ হাতে গভীর কথোপকথনে মগ্ন হয়ে যেতেন তিনি। কঠিন সময় হাল ধরেছিলেন পঞ্জাবের। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কে পি এস গিল কোনোদিন মানবাধিকার লঙ্ঘন করেননি। শুধু কড়া হাতে বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের রায় রয়েছে তাই এটা ধরে নিতে পারছি না তিনি কোনদিন নারীর মর্যাদাকে তুচ্ছ ভেবে তা লঙ্ঘন করেননি।

দেশ যেদিন তাঁর দক্ষ সন্তান ও অমিত শক্তিধর ‘সুপারকপ’কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাবে, রূপেন দেওল বাজাজের কী মনে হবে জানা নেই, আমার কিন্তু তাঁর মুখটা মনে পড়বে।  প্রার্থনা করব আমার দেশের সার্বভৌমত্বের আলোর নীচে এমন কোনো অন্ধকার যেন খুঁজতে না হয়।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here