অভিনয়ের ‘পরশপাথর’ আজও অম্লান বাঙালির মনে

0

‘পরশপাথর’ ছবিতে। 

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

ইনি হলেন সেই হেঁশেলবাড়ির হলুদ। রঙ দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন এক একটি পদ। বিয়েবাড়ি থেকে মৎস্যমুখ, অন্নপ্রাশন থেকে পৈতে। ষষ্ঠীপুজো থেকে প্রতিমা বিসর্জন – সবেতেই একমেবাদ্বিতীয়ম। এই হলুদ সব কাজেই লাগে।

বিজ্ঞাপন

সকলের প্রয়োজনে লাগছেন। যেখানে এক লহমার দরকার, আবার যেখানে আগাগোড়া, সবেতেই তাঁর অভিনয় অনবদ্য। যেখানে গান তো গান, যেখানে নাচ তো নাচ, অকল্পনীয় উপযোগিতা। গোল গোল চোখ, এক মাথা টাক, অবিন্যস্ত দাঁত আর মোটা ভুঁড়ির মানুষটা হলেন তুলসী চক্রবর্তী।

তিনি কমেডিয়ান না পূর্ণ অভিনেতা, সে সব প্রশ্ন দূরে থাক। নাকি তিনি এক জন দক্ষ বাদ্যশিল্পী! থিয়েটারে ঢোকার আগে তিনি শিখলেন পাখোয়াজ-হারমোনিয়াম-তবলা-খোল। বরং বলা ভালো, নিজের গুণপনাকে আরও পরিশীলিত করলেন। আর ঘষামাজা করলেন নাচ। ‘কবি’ ছবিতে পরিচয় মিলেছে এই ক্ষমতাশালী অভিনেতাকে।

মধ্য হাওড়ার সংকীর্ণ গলি কৈলাস বসু থার্ড লেন। সেখানকার ২ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা সদর্পে হেঁটেছেন অভিনয় জগতের রাজপথে। এই দু’ কামরাওয়ালা দোতলাবাড়িতে ছিল একটি কাঠের আলমারি, পালঙ্ক, কয়েকটি টুল আর একটা আরামকেদারা। মাঝেমধ্যে এখানেই বসত গানের আসর।

tulsi-tolly
টলিউড শিল্পীদের সঙ্গে। রয়েছেন উত্তমকুমার, বিকাশ রায়, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, বনানী চৌধুরী প্রমুখ।

আজ শুক্রবার ৩ মার্চ, তুলসী চক্রবর্তীর ১১৮তম জন্মদিন। কৃষ্ণনগরের গোয়াড়িতে ছিল আদি বাস। বাবা আশুতোষ চক্রবর্তীর রেলের চাকরি, ঘুরতে হত নানা জায়গায়। বাবার অকাল মৃত্যুতে মা নিস্তারিণীদেবীকে নিয়ে কলকাতায় চলে এলেন সদ্য যুবক তুলসীচরণ। জোড়াসাঁকোয় থাকতেন জ্যাঠামশাই প্রসাদ চক্রবর্তী। সেখানেই আশ্রয় মিলল। কিন্তু একটা চাকরি তো চাই। তাই চুপি চুপি যোগ দিলেন বোসেদের সার্কাসে। এর সৌজন্যে কার্নিভালের মজা আর তাৎক্ষণিকতা রপ্ত করেছিলেন ভালো। গিয়েছিলেন রেঙ্গুনেও। কিন্তু সেখানে মন বসল না। ভাগ্যিস, মন বসেনি। তাই তো এমন ‘পরশপাথর’কে আমরা পেলাম। মেসমালিক থেকে পাঠশালার গুরুমশাই অথবা মুদি থেকে ব্যাঙ্কের কেরানি, কখনও গৃহভৃত্য থেকে গাঁজাখোর – যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, ভগীরথের মতো হাসির বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। এক নিরুত্তাপ বিচ্ছিন্নতা অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীর মধ্যে সাজানো ছিল, যিনি অকপটে টালিগঞ্জের ঠিকানায় হাসির কৌমার্য রক্ষা করতেন। তিনিই সেই মানুষ যিনি হাওড়া থেকে ৩২ নম্বর ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে ঝিমোতে ঝিমোতে টালিগঞ্জে আসতেন।

 

সার্কাস থেকে যা শিখলেন, তা তো অভিনয় জীবনে কাজে লাগল, আর শিখেছিলেন অনর্গল উর্দু আর হিন্দি বলা। পরে নিউ থিয়েটার্সে অভিনয় করতে গিয়ে তা-ও কাজে লাগল। চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় প্রেমাংকুর আতর্থীর ‘পুনর্জন্ম’। শেষ ছবি ‘আমি রতন’, মুক্তি পেয়েছিল তাঁর মৃত্যুর ১৮ বছর পরে, ১৯৭৯-তে।

চরিত্র ছোটো না বড়ো, গুরত্ব আছে না নেই, এ সব ভাবতেন না তুলসী চক্রবর্তী। মন-প্রাণ ঢেলে অভিনয় করতেন। ‘শুন বরনারি’-তে ছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে, একটা ট্রেনযাত্রার দৃশ্যে, তাতেই কিস্তিমাত। বিমল রায়ের ‘অঞ্জনগড়’-এ ট্রাক ড্রাইভারের পাশে বসা এক অনামী সংলাপহীন চরিত্র। অভিনয়ে কী ভাবে অসাধ্য সাধন করতেন? এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, “চোখ কান খোলা রাখি, আর সব ধরনের মানুষ দেখে বেড়াই। চরিত্রমতো যখন যাকে দরকার, তাকে তুলে ধরি। এ সব চরিত্র ফুটিয়ে তোলার দরকার হয় নাকি? এ সব তোমার আমার চার পাশে ঘুরছে। যে কোনো একটাকে তুলে এনে নিজের কাঁধে ভর করাও।”

tulsi-indrani
‘ইন্দ্রাণী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে।

তবে চলচ্চিত্রে আসার আগে তুলসীবাবুর মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতার কথা বলার প্রয়োজন আছে বই কি! সার্কাসদল থেকে ফিরে এসে জ্যাঠামশাইয়ের আশ্রয়ে থাকতে হল। শাসনের সোহাগে মিলেছে প্রতি ক্ষণে। প্রথমে ছাপাখানায় কম্পোজিটরের কাজ, সেখান থেকে স্টার থিয়েটারে। জ্যাঠামশাই স্টার থিয়েটারে বাজনা বাজাতেন। ১৯২০ সাল। ছাপাখানায় ছাপানো হত থিয়েটারের নাম, অভিনেতাদের নাম। এ সব দেখে শখ হল, অভিনয় করবেন। জ্যাঠামশাইয়ের রাতের খাবার আনার ফাঁকে পর্দার আড়াল থেকে অভিনয় দেখার সুযোগ হত। তা দেখতে দেখতে সুযোগ জুটে গেল ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে অভিনয় করার। সেটিই মঞ্চে প্রথম অভিনয়। শেষ অভিনয় ‘শ্রেয়সী’।

কানন দেবীকে সিনেমায় নিয়ে এসেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। জহর গাঙ্গুলিকে পথ দেখিয়েছিলেন। স্টার থিয়েটারের নির্দেশক অপরেশ মুখোপাধ্যায়কে ধরে কয়ে জহরের জায়গা করে দিলেন। জহর প্রতিষ্ঠিত হলেন নায়কের চরিত্রে আর তুলসী নায়ক-নায়িকার পাশে থেকে সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন। চলছে ‘রঙমহল’-এ ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ – জহর নায়ক, তুলসী গ্রামের জমিদার। এ ভাবেই ৩১৬টা বাংলা ছবি আর ২৩টা হিন্দি ছবিতে কী অসাধারণ সব ফুল ফুটিয়েছেন।

 

ছোট্টো দু’ কামরার বাড়িতে থাকতেন স্ত্রীকে নিয়ে। উত্তমকুমার-তরুণকুমারদের ‘ছেলে’ বলে ডাকতেন নিঃসন্তান তুলসী। অভিনয় ও গানবাজনার পাশাপাশি সেলাই-ফোঁড়াইয়ে হাত পাকিয়েছিলেন। থিয়েটারে এক বার অন্যের বদলে অভিনয় করতে গিয়ে দেখেন রাজার নাগরা নেই। মোজার ওপর সাজার রঙ লাগিয়ে এঁকে ফেললেন নাগরা।

‘পরশপাথর’ ছবি মুক্তি পাওয়ার আগে তিনি কেমন উদভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। চারিদিকে বড়ো বড়ো পোস্টার, তাতে তাঁর গোল গোল চোখ। আনন্দে উচ্ছ্বসিত মানুষটি নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারতেন না যে পাঞ্জাবির জন্য দর্জি মাপ নিতে আসছে বাড়িতে। আসলে আদ্যন্ত ছাপোষা মানুষ। দিন কাটত স্ত্রীর হাতের তৈরি মাছের ঝোল আর সরু চালের ভাত খেয়ে। তিনি রাতারাতি ভিআইপি বনে গেলেন!

আসলে তুলসীবাবু যে ঘরানার অভিনেতা, তাঁর যৌবন কেটেছে উত্তর কলকাতার যে এলাকায়, তাঁর অভিনয়জীবনের প্রতিটি বাঁকে সেই ছাপ স্পষ্ট হয়ে থাকত। মনে পড়ে ‘সাড়ে চুয়াত্তরে’ পৈতে দিয়ে গা ঘসা – যেন ইয়েহুদি মেনুহিন বেহালায় ছড় টানছেন। এই সূক্ষ্মতা আসমুদ্র হিমাচলে কোনো পার্শ্ব অভিনেতার নেই। তাই তো তুলসী চক্রবর্তীর দ্বারস্থ হতে হয়েছিল সত্যজিৎ রায়, দেবকী বসু, বিমল রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, তপন সিংহকে।

tulsi-panchali
‘পথের পাচালি’-তে প্রসন্ন গুরুমশাই। সঙ্গে অপু-দুর্গা।

টালিগঞ্জের ‘পদাতিক দেবতা’কে প্রণাম জানিয়ে উত্তমকুমার বলেছিলেন, “তাই তো ছবির কাজ পেলেই পরিচালক-প্রযোজককে বলে ওঁকে ডেকে নিই।” জীবননদীর ঘাটে ভেসে বেড়ানো এই স্বয়ম্ভু পার্শ্বচরিত্রটি পঞ্চাশের দশকের ফাটলগুলি দিয়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন এবং নামীদামি শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করে নিজের দিকে সমগ্র আলোটুকু কী ভাবে টেনে নিতেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’, ‘মৃতের মর্ত্যে আগমন’ প্রভৃতি ছবি।

মৃত্যুর পরেও কেটে গেছে ৫৮টা বছর। কিন্তু ‘প্রসন্ন’, ‘পরেশ’কে আজও পুজো করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here