প্রাথমিকে নিয়োগ ও আদালত-শেষ হয়েও হল না শেষ

0
179

abhi--bhattacharya_editedঅভি ভট্টাচার্য

২০১১ সাল, রাজ্যে পালাবদল হয়ে গেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করেন চল্লিশ হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগ হবে, প্যারাটিচারদের সংরক্ষণ, পিটিটিআই-দের অধিকার ইত্যাদি। ঘোষণাতে স্বপ্ন সফলের গন্ধ পায় শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা, বিশেষ করে  ২০০৫ সাল থেকে ঝুলে থাকা ব্রিজ কোর্স পাঠরত পি টি টি প্রশিক্ষিতরা। সদ্য ২০১০ সালের শিক্ষার অধিকার আইনের কথায় প্রশিক্ষিতদের আগে চাকরি দিয়ে তবে দেওয়া যাবে অপ্রশিক্ষিতদের।

সকলের মনে আশা যখন তুঙ্গে তখন শোনা গেল রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি। ২০১২ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। চৌত্রিশ হাজার শূন্য পদ। প্রায় পঁয়তাল্লিশ লাখ আবেদনপত্র পড়ল। এ দিকে হাইকোর্টে দু’একটি মামলা বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। সিঙ্গল বেঞ্চের স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে ডিভিশন বেঞ্চ বলেন, প্রশিক্ষিতদের আগে চাকরি দিতে হবে, তবে টেট পাশ বাধ্যতামূলক। জোর কদমে পড়াশোনা শুরু কয়েক লাখ পরীক্ষার্থীর। ৩১ মার্চ, ২০১৩ রাজ্যে প্রথম টেট। নামেই টেট, এনসিটিই গাইডলাইন মেনে হয়নি প্রশ্ন, শিশু মনস্তত্ত্বের প্রশ্ন নেই, গণিতের প্রতিটা প্রশ্ন একটা নক্ষত্রে পৌঁছোনোর সমাধানের মতো। মহান সাহিত্যিকরাও ইংরেজির প্রশ্নের উত্তর করতে গুগল সার্চ করবে। পরিবেশবিদ্যাও গাইডলাইন মেনে হয়নি বলে শোরগোল। হাইকোর্টে অবধারিত কেস। এনসিটিই জানায়, কোনো গাইডলাইন মানা হয়নি।

এ দিকে সুপ্রিম কোর্টেও কেস দায়ের। হাইকোর্টের অর্ডারে প্রথম টেটের রেজাল্ট আউট। পাশের হার এক শতাংশ। দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ। দেদার বিতর্ক। পিটিটি এবং ডিএলএড-দের আন্দোলন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়োগ শেষ, ১৬০০০ জন নিযুক্ত।

highlightএ দিকে ‘টেটের প্রশ্নপত্র এনসিটিই গাইডলাইন বহির্ভূত’ কেসের ভিত শক্ত, সমস্ত পয়েন্টে গাইডলাইন নিয়ে ধাক্কা খাচ্ছেন সরকারি আইনজীবীরা। যদিও শেষ অবধি সিঙ্গল বেঞ্চে জয়লাভ রাজ্য সরকারের। দ্বিতীয় টেট হবে শোনা গেল ২০১৪ সালের মার্চে। হল না ।

এরই মধ্যে ছোটো ছোটো আন্দোলন হল চাকরির দাবিতে। নিয়োগ প্রায় বন্ধ। টেটের সময় নিয়ে মামলা হল। ৯০ মিনিটে ১৫০ নম্বর-কে চ্যালেঞ্জ করে। গোটা দেশের নিয়ম অনুযায়ী হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রাজা চ্যাটার্জি নামে এক ডিএলএড প্রশিক্ষিতের করা মামলাতে বলল, টেট নিতে হবে ১৫০ নম্বর ১৫০ মিনিটে। চাকরিপ্রার্থীদের মনে আশা জাগল। কিন্তু তবুও আশঙ্কা, টেট তো এনসিটিই গাইডলাইন মেনে হবে না।

দ্বিতীয় টেট হল ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর। যাই হোক, বোর্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এনসিটিই গাইডলাইন মেনেছে। যাঁরা পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন তাঁরা আশাবাদী হলেন। কিন্তু রেজাল্ট নেই দীর্ঘদিন। ভোট এল। ভোট বড়ো বালাই। টেট নিয়ে মাইক্রোফোনে কথা এল। এক বছর পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয় প্রাথমিক টেটের রেজাল্ট আউট। প্রায় এক লাখ চব্বিশ হাজার জন পাশ। অপেক্ষাকৃত বিতর্ক কম। অনেক প্রশিক্ষিতরা এবং অপ্রশিক্ষিতরা পাশ করেছে। চটজলদি ইন্টারভিউ, ৪১ হাজার শূন্যপদ। যদিও প্রশিক্ষণহীনদের নিয়োগের ক্ষেত্রে এমএইচআরডি-র রিল্যাক্সেসন নেই, তবে হাইকোর্টের অর্ডার আছে। অবশেষে ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি দ্বিতীয় প্রাথমিক টেটের চূড়ান্ত প্যানেল প্রকাশের ঘোষণা। তবে দুর্নীতির বিতর্ক সেই ভাবে না থাকলেও সংরক্ষণ ও প্রশিক্ষিতদের অগ্রাধিকার নিয়ে বিতর্ক চলছে, নতুন কেসও হয়েছে, হাইকোর্টের একটি কেসের রায় অনুযায়ী প্রত্যেকের নিয়োগপত্র শর্তাধীন ঘোষণা করেছে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ। সরকার জানিয়েছে শিক্ষক নিয়োগে কোন অভিযোগ থাকলে তা সরকারকে জানাতে এবং তাঁরা এবিষয়ে পদক্ষেপ করবেন।

আশা, শর্তাধীন নিয়োগপত্র এক সময় শর্তহীন হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের শিক্ষা আইনের পার্থক্যের কারণে ভুগবেন না কোনো চাকুরিপ্রার্থী। তবে, যে ওঠাপড়া এবং সহ-নাগরিকদের প্রশ্ন ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্য দিয়ে টেট পরীক্ষার্থীরা অর্ধযুগ কাটালেন, তাতে নিশ্চিন্ত হতে পারছি কই।

(লেখক একজন সফল পরীক্ষার্থী)

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here