হিউস্টন হোক বা মুম্বই, বিপর্যয়ের মূলে ‘বেহিসাবি উন্নয়ন’

0
833
নীলাঞ্জন দত্ত

হিউস্টন ডুবু ডুবু, মুম্বই ভেসে যায়, বাংলা-বিহার-অসম জলের তলায়। এমন ভুবনভরা জলোচ্ছ্বাস আমরা অনেক দিন দেখিনি। এর মধ্যে একটা ইংরেজি টিভি চ্যানেলে দেখলাম, ‘টক শো’-র সঞ্চালিকা বলছেন, “কাল আমরা ‘গডম্যান’দের দোষ দিচ্ছিলাম (হরিয়ানায় হাঙ্গামার জন্য)। আজ কি এই বিপর্যয়ের জন্য ‘গড’কেই দোষ দেব?”

অথচ ব্যাপারটা এ রকম নয় যে, গড বা প্রকৃতি যা-ই বলুন, আগে থেকে সাবধান করেনি। কিছু বিজ্ঞানী সেই সাবধানবাণী পড়তেও পেরেছিলেন। তাঁরা আমাদের জানিয়েও দিয়েছিলেন যে আগামী দিনে যে বন্যাগুলো আসতে চলেছে, তাদের রূপ অনেক বেশি ভয়াবহ হবে। সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদিও বলে কয়ে আসে না, আমেরিকাতেই হোক বা ভারতে, এই প্লাবন কিন্তু প্রত্যাশিতই ছিল।

তবুও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কারণ, ব্যবস্থা নিতে গেলে আমাদের ‘আধুনিক সভ্যতার’ মূলমন্ত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হত, যা হল, ‘উন্নয়ন’।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টা পশ্চিমবঙ্গের নেতা-নেত্রীদের ‘ম্যান-মেড’ বন্যার তত্ত্বের মতো সরল নয়। বাঁধ থেকে না জানিয়ে জল ছাড়া হয়ে থাকলে তা অবশ্যই দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। কিন্তু জানিয়ে জল ছাড়লেও হয়তো বিপদের এলাকা থেকে লোকজন সরানো যেত (তবে এত লোককে সরানো কি চাট্টিখানি কথা!), বন্যা আটকানো যেত না।

জলবায়ুর পরিবর্তন যে হারে ঘটে চলেছে তাতে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ধরনের ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দ্বিগুণ বাড়তে পারে এবং নগরায়ন যে ভাবে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতের এক একটি বন্যায় এর তিন গুণ ক্ষতি হতে পারে।

২০০৫-এ মুম্বইয়ে অভূতপূর্ব বন্যায় ৫০০ জীবনহানি ঘটেছিল এবং প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল। এর পর ১৩ জন ভারতীয় ও বিদেশি বিজ্ঞানীর একটি দল গবেষণা করে আন্তর্জাতিক ‘ক্লাইম্যাটিক চেঞ্জ’ পত্রিকার জানুয়ারি ২০১১ সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাতে তাঁরা জানান, জলবায়ুর পরিবর্তন যে হারে ঘটে চলেছে তাতে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ধরনের ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দ্বিগুণ বাড়তে পারে এবং নগরায়ন যে ভাবে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতের এক একটি বন্যায় এর তিন গুণ ক্ষতি হতে পারে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের ওপর নজর রাখার জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসেই যে রিপোর্ট দিয়েছিল, তাতে অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া এবং সমুদ্র উঠে আসার ঝুঁকি অনুসারে পৃথিবীর ৫০টি শহরের একটা তালিকা ছিল। মুম্বই তাতে ছিল দু’নম্বরে। এই রিপোর্টে বলা হয়, যদিও মুম্বইতে নতুন নিকাশি ব্যবস্থার কাজ চলছে, সেই কাজ হচ্ছে ভীষণ ঢিমেতালে। আরও বলা হয় যে লাগামছাড়া ‘উন্নয়ন’ এবং নির্বিচারে উপকূলের গাছপালা কেটে ফেলার ফলে এই শহরের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। এখানে বলে নেওয়া যাক, এই ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় কলকাতা আর ঢাকাও আছে।

যাই হোক, এ সব কথায় কেউ কান দেয়নি। এখন আবার মুম্বই ডোবার পর তরজা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, অর্থহীন বিতর্ক চলছে শিবসেনা না বিজেপি না এনসিপি, কে বেশি দায়ী, তা নিয়ে।

একই রকম সতর্কবার্তা ছিল আমেরিকার হিউস্টন, টেক্সাস-এর ক্ষেত্রেও। এবং সেখানেও রাজনৈতিক তরজায় তা তলিয়ে যাচ্ছে। ‘হিউস্টন ক্রনিকল’ পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক ভার্নন লোয়েব ২৯ অগাস্টের ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকায় লিখেছেন, তিনি গত সাড়ে তিন বছরে হিউস্টনে দু’টি বিধ্বংসী বন্যা দেখেছেন এবং এ বারের ‘হারিকেন হার্ভে’ আছড়ে পড়ার পর জলোচ্ছ্বাসও দেখলেন। দেখতে দেখতে ক্রমেই তাঁর মনে হচ্ছে, এ সবের মূলে এমন কিছু আছে, যা টেক্সাস-এর রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট আর হিউস্টন-এর ডেমোক্র্যাট মেয়র সিলভেস্টার টার্নারের দায়ভাগ নিয়ে তরজার থেকে আরও অনেক বড়ো বিষয়। প্রশ্নটা হল, বিশাল একটা উপকূলবর্তী সমভূমি সাফ করে দিয়ে ‘আধুনিক’ নগরের নামে কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে তোলাটা আদৌ বিচক্ষণতার কাজ হয়েছে কিনা।

১৬ জুন ‘দা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা লিখেছিল, কী ভাবে হিউস্টনের উপকূলে গত এক দশকে নতুন নতুন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক শপিং মল, অফিস ব্লক ও আবাসন কমপ্লেক্স। অনেকে আবার অতি চালাকের মতো নিজের বাড়ি এমন ভাবে ‘ডিজাইন’ করেছে, যাতে আপৎকালে বন্যার জল বার করার জন্য নিকাশি ব্যবস্থা থাকে। অথচ কেউ ভাবেনি, গোটা শহরটাই ডুবে গেলে এই ‘নিকাশি ব্যবস্থা’ কী করে কাজ করবে। এ ভাবে কি নিজেও বাঁচা যায়?

“হারিকেন একটা ঝড় মাত্র, তা কোনো বিপর্যয় নয়। বিপর্যয় হল এটাই, যে হিউস্টনের জনসংখ্যা ১৯৯০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিপর্যয় হল এটাই, যে বহু লোকই ছিল অত্যন্ত গরিব, যাদের কোনো বিমাও ছিল না, যাওয়ার মতো কোনো জায়গাও ছিল না। জলবায়ুর পরিবর্তন মানুষকে একটা ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলে এসে বসত করতে বাধ্য করেনি। বিপর্যয়টা আমরাই বেছে নিয়েছি, তার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই।”

২৯ আগস্ট বিবিসির পরিবেশ-প্রতিবেদক ম্যাট ম্যাকগ্রাথ মনে করিয়ে দিয়েছেন, হারিকেন কখন আসবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অতিবৃষ্টি আর সমুদ্র উঠে আসার কারণগুলো যথেষ্ট জোর দিয়েই বলার মতো বৈজ্ঞানিক তথ্য কিন্তু এখন আমাদের হাতে রয়েছে। বায়ুমণ্ডল যত গরম হবে, ততই তা বেশি করে জলীয় বাষ্প ধরে রাখবে। ‘ক্লাউসিউস-ক্ল্যাপেরঁ ইকুয়েশন’ অনুসারে,  তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তার জল ধারণক্ষমতা সাত শতাংশ বাড়বে। এর পর যে এই জলীয় বাষ্প ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে তা আর আশ্চর্য কী।

ঠিক তেমনই, বাতাস গরম হলে সমুদ্রের জলের ওপরের দিকটাও গরম হবে, ফুলতে থাকবে আর উঠে আসবে। ও দিকে আবার গরমের চোটে গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলো গলছে আর জল আরও বাড়ছে। জলোচ্ছ্বাস আটকাবার মতো গাছপালা তো উপকূল থেকে আগেই কেটে সাফ করে ফেলা হয়েছে। তার বদলে শহরকে টেনে আনা হয়েছে একেবারে সাগরকিনারে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নতির হাতছানিতে জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিপদ ডেকে আনা আর কাকে বলে!

লন্ডনের বিপর্যয় বিশেষজ্ঞ ইলান কেলম্যান বিবিসিকে বলেছেন, “হারিকেন একটা ঝড় মাত্র, তা কোনো বিপর্যয় নয়। বিপর্যয় হল এটাই, যে হিউস্টনের জনসংখ্যা ১৯৯০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিপর্যয় হল এটাই, যে বহু লোকই ছিল অত্যন্ত গরিব, যাদের কোনো বিমাও ছিল না, যাওয়ার মতো কোনো জায়গাও ছিল না। জলবায়ুর পরিবর্তন মানুষকে একটা ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলে এসে বসত করতে বাধ্য করেনি। বিপর্যয়টা আমরাই বেছে নিয়েছি, তার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই।”

এই জন্য লন্ডনের ‘ক্লায়েন্ট আর্থ’ আর ওয়াশিংটনের ‘আর্থ অ্যান্ড ওয়াটার ল’-এর মতো পরিবেশ-আইনজীবীদের কিছু সংগঠন প্রশ্ন তুলছে, এই সব তথাকথিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আদৌ ‘অ্যাক্টস অভ গড’ বা ‘ভগবানের মার’ বলে সরকার ও শিল্পপতিরা দায় এড়িয়ে যেতে পারে কিনা। কারণ, তারাই তো উন্নয়নের নামে যেখানে সেখানে যা খুশি তা-ই বানাচ্ছে আর বেশি বেশি করে ‘ফসিল ফুয়েল’ বা তেল আর গ্যাস পুড়িয়ে বাতাসে ‘গ্রিনহাউস গ্যাস’ ছড়িয়ে বায়ুমণ্ডলকে গরম করে তুলছে। তাই এ বার থেকে এই রকম ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে’ জীবন বা সম্পত্তিহানির জন্য তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করা যাবে না কেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো ক্ষমতায় এসেই জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে তাঁর দেশকে বার করে এনেছেন। তাঁর মতে, এ সব ভয়ের কোনো ভিত্তি নেই, এ নিয়ে গবেষণা মানে পয়সার অপচয়।

লোয়েব ডাক দিয়েছেন, প্রকৃতির এ বারের ধ্বংসলীলা থেকে শিক্ষা নিয়ে হিউস্টনই পথ দেখাক। তেল আর গ্যাসের চক্কর থেকে বেরিয়ে এসে এই শহর অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহারে বিশ্বের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠুক। এই বিপন্নতার মুহূর্তই হোক সেই নতুন পথে যাত্রা শুরুর শুভমুহূর্ত।

আমেরিকা বা ভারত, কোথাও কোনো সরকার এ সব কথার কোনো মূল্য দেয় কিনা, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো ক্ষমতায় এসেই জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে তাঁর দেশকে বার করে এনেছেন। তাঁর মতে, এ সব ভয়ের কোনো ভিত্তি নেই, এ নিয়ে গবেষণা মানে পয়সার অপচয়।

আর আমাদের দেশে? ২০১৪-এ এ বারের এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাক্তন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী মানেকা গান্ধী ‘স্টেটসম্যান’ কাগজে তাঁর কলমে লিখেছিলেন, “আর একটা নির্বাচন চলে গেল, এবং আমরা, যারা পরিবেশ ও প্রাণীজগৎ সম্পর্কে নিজেদের সচেতন বলে মনে করি, আর একটা সুযোগ হারালাম।” তাঁর আক্ষেপ, “এ সব নিয়ে কথা বলতে গেলেই মিডিয়া আর অন্য রাজনৈতিক নেতারা প্রগতিবিরোধী বলে ব্যাঙ্গ করে। তাই, এমনকি আমার মতো লোকেরাও হতাশ হয়ে চুপ করে থাকি। একটা সময় আসবে যখন গোটা নির্বাচনটাই হবে জল, আবহাওয়া আর তার প্রভাবে খাদ্যাভাব নিয়ে। কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে যাবে।”

আমরা কি এ ভাবে ডুবতে ডুবতে, ভাসতে ভাসতে, চুপ করে সে দিনের জন্য অপেক্ষা করব?

 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here