ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত

0
236

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

শীত-তপ্ত দুপুরে মাদকতার মায়াজাল ছড়িয়ে দূর থেকে ভেসে আসছে রবি-কথার গানখানি। অনেক দিনের মনের মানুষ যেন এলে কে। কে এসেছিল, আর কে বা আসবে? এই মাতাল করা প্রান্তিক পথে সে এক রাখালিয়া বীণা বাজায় তন্ত্রীতে। সে যে পুষ্প-পাগল, রঙের আগলভাঙা প্রেম-তরঙ্গের বসন্ত।

হে বসন্ত, ফাগুন হাওয়ায় মত্ত হয়ে মানব-কুটিরের মনে তুলছ সুরের ঝরনা। উড়ে যায় তোমার উত্তরি, ওগো নবীন রাজা, তোমার পথ ছেয়েছে আগুন পলাশ, তোমার পথ চেয়ে আছে রাধা। হলুদ বরণ অঙ্গে সে আজ সেজেছে শিমূলের মালায়। সাদা পাপড়ির নাগেশ্বরের সুগন্ধে বুকে তার প্রবল প্রতাপ। ঋতুর কড়াকড়ি ভালো লাগে না এই বলে দিলাম বাপু। যে সব ফুলের সাজি সাজিয়ে দ্বারে দ্বারে নাড়া দিচ্ছ, সেখানে তোমার পালা বদলের রাঙা চোখ দেখিও না। অত সব নিয়ম মানতে নারাজ এই প্রান্তর, এই মন, এই শরীর।

মাধবী সে দিন আঙিনায় নবজাতক ধানের গায়ে সোনার রোদ এঁকে দিতে দিতে মধুময় মন্ত্র উচ্চারণ করছিল। দক্ষিণ হাওয়াকে জাগিয়ে তোলার নিবিড় আমন্ত্রণ জানিয়ে শাল-মহুয়া-শিরীষের বনে হারিয়ে গেল আপন মনে। আসলে এই বসন্তে হারিয়ে যাওয়াটাই উদ্দেশ্য-প্রধান। কাঁঠালিচাঁপার দেহ জুড়ে যখন দেখা দেয় পাকা কাঁঠালের গন্ধবাহী সবুজাভ সাদা ফুলের সমারোহ, তখন কি এক বারও মনে হয় না এই ফুলের বনে হারিয়ে যেতে যেতে বসন্ত তোমার এলিয়ে পড়া উত্তরিকে জড়িয়ে নিই নিজের অঙ্গে? পড়ে থাক যত কূটকচালি। থাক পড়ে গৃহস্থ। আমি চললাম সেখানে দোয়েল কোয়েলের বিরামহীন শিসে যেখানে অশোক গাছে রঙের প্রলাপে মাতাল হয়েছে মৌমাছি!

বিনা কারণে মনে দোলা লাগাতে ওস্তাদ ঋতুরাজ বসন্ত। আমার আকাশ-চাওয়া রঙিন স্বপ্ন-মাখা চোখে ধরা দেয় কৈশোরের কোলাহল। চাঁপার ডালে ডালে পাতার গোড়ায় ফোটে হলুদ সাদা ফুল৷ করবীর মৌসুমও এসে পড়ে তরতরিয়ে। বড় বড় থোকায় ধরে রক্ত, শ্বেত বা পদ্মকরবী। মনে পড়ে সেই নাচের কথা। হলুদ শাড়িতে আর রক্ত করবীতে সেজে ‘তুমি কোন পথে যে এলে পথিক, আমি দেখি নাই তোমারে’ দেখে তোমার মনে মাতন লেগেছিল। এই গান গেয়ে প্রেমে পড়েনি, এমন মানুষ খুব কম আছে। এখানেই রবি-কবির জয়।

প্রেমের ধ্বজা উড়িয়ে বসন্ত তার আদর ছড়ায় আকাশে-বাতাসে। তাই তো এখানে কোকিল ডাকে বারো মাস। এখানে জল জমে বারো মাস। এই জলে পদ্ম-শালুক নাই বা ফুটল, নাই বা ভাসল হাঁস। এখানে বসন্তের চিরদিনের বাস। এখানের মানুষ ভালোবাসতে জানে। ভালোবাসা তার মননে, চেতনায়, বইমেলায়। ধুলোয়, ধোঁয়ায়, বাসের ভিড়ে, অটোর লাইনে। বসন্ত, আদিতেই বলা আছে তুমি মুখ ভার কোরো না আর। আমরা চলব আপন মতে। তোমার আসার পথে এক পথভোলা আছে গো। সে রাজার বাড়ির উৎসবের ধ্বনি শোনার জন্য ব্যাকুল। সে আমের মঞ্জরী নিয়ে যাবে শান্তির নিকেতনে। যাবে ছৌনাচের ছন্দে, ধামসার বাদ্যে, লালমাটির ঘরে রমণীর খোঁপায়, নদ-নদীর কাছে। সেখানে রঙের তুমুল কোলাহলে, গগনজোড়া তুমুল আয়োজন। বাতাসে যে প্রেম বইছে, তার বার্তা গানে গানে দিয়ে আসবে মধুর মিলন ঘটানোর জন্য।

পথিক তুমি কি পথ ভুলেছ? তোমার মনের গুঞ্জন থামেনি? শয়ন ছেড়ে চেয়ে থাকি, পাইনে দেখা তোমার। আরে পথিক, তোমার ভাষা বোঝা দায়। মৃদুমন্দ দোল দিয়ে যায় বকুল-হেনার বন। এমন ভোলা হলে চলবে? তুমি যে কবির বসন্ত, তোমার সারা শরীর থেকে লুকিয়ে ঝরে পাগল ঝোরা। নতুন যৌবনের দূত, অফুরানের আঁচল মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েছ। কালের যৌবনপ্রবাহ হয়ে শাসন করছ জীর্ণ বিরহকে। রাজার রাজা তুমি হে গন্ধরসিক। বড় ভুল হয়ে যায়। মাঘীপূর্ণিমার রাতে কাঙাল শূন্য হাতে ঘুরে বেরিয়েছে। বাঁশি তার সুর তুলেছে সরষেখেতে। হলুদ বসন্ত আজ দ্বারে, ধরার মন তাই উতলা।

এ শহর, এ নগর, এ প্রান্তর। যেটুকু ট্রামলাইন আছে, তার শরীর ছুঁয়ে আছে প্রেম। যত দিন অ্যাকাডেমি থাকবে তার চেয়ার ঘিরে থাকবে প্রেম। সদন-নন্দনে প্রেম থাকুক প্রবল ভাবে। বসন্ত খেলে যাক খেলার মাঠে, প্রেমের জোয়ারে প্রতাপ দেখাক গঙ্গা। নদীর বুকে প্রেমের গল্প আঁকা আছে বহু নাগরিকের। পদাতিক কবির সেই দুরন্ত বার্তা কংক্রিটের গায়ে ঝাপটা দেয় ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’।  

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here