সৌরভ, দ্রাবিড়ের পর এ বার ফ্রাঞ্চাইসি জগতের নিষ্ঠুর শিকার ধোনি

0
147

wrivuশ্রয়ণ সেন

অতএব প্রমাণিত, শুধু সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা রাহুল দ্রাবিড় নয়, সরানো হতে পারে ধোনিকেও। সেই ধোনি, যিনি কি না আইপিএলে একটি দলে বছরের পর বছর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে গিয়েছেন, সেই ধোনি যিনি অধিনায়ক হিসাবে সেই দলকে অসামান্য সাফল্য দিয়েছেন, যাঁর কথায় প্লেয়াররা তো বটেই, অনেক কর্মকর্তাও দাঁড়িয়েছেন বসেছেন, সেই ধোনিকেও কি না সরে যেতে হল। সরি, সরিয়ে দেওয়া হল।

অবশ্য শনিবার পর্যন্তও তাঁর পৃথিবীটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যা কিছু করবেন, যা সিদ্ধান্ত নেবেন, সব নিজের মর্জিমাফিক। কেউ তাঁকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করতে পারবে না। টেস্ট ছেড়েছেন নিজের ইচ্ছায়, এক দিনের ক্রিকেটের অধিনায়কত্বও ছেড়েছিলেন নিজের মনের কথায়। কিন্তু এ বার সত্যিই তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করল কেউ।

আসলে ফ্র্যাঞ্চাইসি জগতটাই এ রকম। কোনো ক্রিকেটার কত বড়ো, কতো ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, এই সব কোনো ভাবেই বিচার্য হয় না। শুধুমাত্র বিচার্য হবে ফ্র্যাঞ্চাইসি ক্রিকেট বা বকলমে আইপিএলে তাঁর পারফরম্যান্স।

ফ্র্যাঞ্চাইসি ক্রিকেটে একমাত্র যাঁর জায়গা পাকা ছিল, তিনি সচিন তেন্ডুলকর। আসলে সচিনকে সরিয়ে দেবে এমন দুঃসাহস কেউ দেখাতেই পারেনি। তাই প্রথম দু’টি আইপিএলে তিনি বা তাঁর দল মুম্বই ইন্ডিয়ান্স সে ভাবে ভালো খেলতে না পারলেও নিজের জায়গা ধরে রেখেছিলেন তিনি। আইপিএলের তৃতীয় সংস্করণ থেকেই জ্বলে ওঠেন মাস্টার ব্লাস্টার।

ফ্র্যাঞ্চাইসি ক্রিকেটের সব থেকে বড়ো ভুক্তভোগী সৌরভ। প্রথম আইপিএলে অধিনায়ক হিসেবে ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় আইপিএলে কেকেআরের নেতার গদি হারালেন বঙ্গসন্তান। সেই গদি আবার ফিরে পেলেন তৃতীয় আইপিএলের আগে। তৃতীয় আইপিএলে সৌরভ ছিলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। অল্পের জন্য সে বার সেমিফাইনালের মুখ দেখেনি কেকেআর। ব্যস, কোপ পড়ল সৌরভের ওপর। শুধুমাত্র অধিনায়কত্বই নয়, একেবারে দল থেকেই তাড়িয়ে দিল বেঙ্কি মাইসোর নেতৃত্বাধীন কেকেআর ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’। নতুন দল পেলেন সৌরভ, পুনে ওয়ারিওর্স। সেখানে আরও বেশি অসম্মান। ২০১২-তে আইপিএল চলাকালীনই তাঁকে দল থেকে ছেঁটে ফেলার সমস্ত রসদ রেখে দিয়েছিল সহারা গোষ্ঠী। কিন্তু এত বড়ো নামকে হুট করে তাড়িয়ে দেওয়া কি ঠিক? না, টুর্নামেন্টের মাঝে নয়, কয়েক মাস পর সৌরভ নিজেই ঘোষণা করলেন তিনি আর আইপিএল খেলবেন না।

সৌরভের মতো অতটা দুর্ভাগ্য না হলেও, রাহুল দ্রাবিড়কে কম অপমান সহ্য করতে হয়নি তাঁর ফ্র্যাঞ্চাইসি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুতে থাকাকালীন। প্রথম আইপিএলে তো জনসমক্ষে বিজয় মাল্যর রোষের শিকার হন দ্রাবিড়। কোচ বেঙ্কটেশ প্রসাদকে ক্ষমা চাইতে হয় মাল্যর কাছে। ক্রিকেটের সঙ্গে যাঁর কোনো সম্পর্কই নেই, সেই মাল্য কি না ক্রিকেটবিষয়ক জ্ঞান দিচ্ছেন ক্রিকেটের কিংবদন্তিকে! এই অপমান কি দ্রাবিড়ের প্রাপ্য ছিল? পরের আইপিএলে তাঁর অধিনায়কত্ব গেল, দু’বছর পর দল থেকেই বাদ দ্রাবিড়। পরে অবশ্য রাজস্থান রয়্যালসে যোগ্য সম্মানের সঙ্গে খেলেই ক্রিকেটকে চিরতরে বিদায় জানালেন দ্রাবিড়।

ফ্র্যাঞ্চাইসিদের এই ‘পারফর্ম অর পেরিশ’ মন্ত্রের শিকার আরও অনেকেই। হায়দরাবাদ থেকে লক্ষণ, দিল্লি থেকে সহবাগ, পঞ্জাব থেকে পুজারা। গদি কিন্তু মজবুত ছিল ধোনির। হ্যাঁ, এক শীর্ষ কর্মকর্তার আশীর্বাদি হাত সব সময় তাঁর মাথার ওপরে ছিল এটা যেমন সত্যি, ঠিক ততটাই সত্যি আইপিএলে তাঁর পারফরম্যান্স। চেন্নাই সুপারকিংসকে সব সময় সেমিফাইনালের ওপরে নিয়ে গিয়েছেন ধোনি।

অন্য একটা দলের হয়ে মাত্র একটি খারাপ মরশুমে কি এত দিনের সাফল্য ব্যর্থ হয়ে গেল? তাঁকে সরিয়ে যিনি নেতা হলেন সেই স্টিভ স্মিথ কতটা সফল হবেন তার গ্যারান্টি কি কেউ দিয়েছে? দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে স্মিথের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়ার লজ্জাজনক হারের স্মৃতি এখনও টাটকা। আগামী একমাস ভারতে তাঁর কী পরিণতি হতে পারে সেটাই এখনও ঠিক ভাবে বোঝা যাচ্ছে না।  

তবে শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় নয়, ক্রিকেট পেরিয়েও এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনেক বেশি। ধোনির কি মনে পড়ে ন’বছর আগে জানুয়ারির এক অস্ট্রেলীয় দুপুর। ফ্র্যাঞ্চাইসি চক্রান্তের শিকার হওয়ার অনেক আগেই ধোনির নীতির শিকার হয়েছিলেন সৌরভ আর দ্রাবিড়। এক দিনের ক্রিকেট থেকে ছাঁটাই হয়েছিলেন দু’জনে। হোক না এটা আইপিএল, তবুও সরিয়ে দেওয়া তো সরিয়ে দেওয়াই। সৌরভ আর দ্রাবিড় এখন ধোনিকে কী বলবেন?

জীবদ্দশাতেই তো দিয়ে যেতে হল বন্ধু…

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here