সুর-ছন্দ-তাল-লয়ের উৎসব দোল

0

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

দোলের গান নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে নানা স্মৃতি। রবিঠাকুরকে বাদ দিয়ে দোলের গান সম্পূর্ণ হয় না। রঙে রঙে আকশবাতাসকে মাতিয়ে দিয়ে আমাদের কাছে ধরা দেয় বসন্ত। তাই তো কবির ডাক ‘আন গো তোরা কার কী আছে’? আমের বন মঞ্জরীর সাজে রূপবতী। পলাশ নিজের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশের কোণে কোণে। বিদেশিনির বেশে চামেলি আর স্বদেশিনির রূপে বকুল তার সুবাসের মাতন জাগায় রক্তে।

এ সবই ঠিক ছিল। কিন্তু বাধ সাধল আবহাওয়া অফিস। সপ্তাহ খানেক আগে থেকে অকাল বর্ষণের খবর জানাচ্ছিল। কবির বাগান সেজে উঠছিল সময়ের তালে তালে। কিন্তু ওই যে সহ্য করতে পারল না বসন্তকে। তবুও মনে হছে আজ ফাল্গুন যেন কাতর হয়েই বলছে ধারাপাতকে, মিনতি করছে তার রঙ যেন ধুয়েমুছে না দেয়। বনে বনে দোলা দেওয়া তার যে কাজ, তাতে যেন বাধা না পড়ে। একটা রাত বাকি। ‘ও আমার চাঁদের আলো, আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে’ আমার পাগলামিকে প্রশ্রয় দিও, এই কামনা।

বিজ্ঞাপন

দোলের গান মানে হইহই, দোলের গান মানে প্রেমের মাদকতা, দোলের গান মানে ফাগুনের আগুন, আবার দোলের গান মানে বসন্তের চলে যাওয়া। এরই পাশে দোলের গান মানে গোপীনাথজির গান। একা কানাইয়ে কাজ নেই, আছে যুগল প্রাণের স্পন্দন। দোলের কথায় আজ আমারও মনে পড়ছে ‘রঙে রঙে রঙিল আকাশ’। শুধু আকাশ তো নয়! এ মাতন যৌবনের। গানে যদি দোলাতেই না পারলাম মন, তবে এ কীসের দোল খেলা? ‘হোলি খেলোড়ি রাধে শাম হাল কে, খেলোড়ি খেলোড়ি খেলোড়ি…’। মনে করা যাক মানবেন্দ্র গান ধরেছেন, ‘আজকে দোলের হিন্দোল আয়, আয় তোরা কে দিবি দোল’। শুধু দিনে নয়, দোলের রাতে একমাথা আবির নিয়ে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিমানবাবুর বাড়ির গোপীনাথজিকে গান শুনিয়ে চলেছেন ‘হোরি রঙ লাগে আজি গোপিনীর তনুমনে’।

sachinশোনা যাক শচীনকর্তা নিজেকে উষ্ণ করতে চেয়ে কী বলছেন? “আজকাল দোলে আর সেই আকর্ষণ নেই ক্যান? ওইঠ্যা ল্যাখো” বলে, মোহিনী চৌধুরীর দিকে চেয়ে রইলেন। মোহিনী চৌধুরী লিখলেন, ‘না না তেমন তো ঢোল বাজে না/গাজনে যেই লাগত মাতন/পলাশে যে লাগল ফাগুন/তেমন তো ঢোল বাজে না/কই গেল সেই ঢ্যাম কুড়াকুড়/কই গেল সেই দোল/কই সে মাটি, কই সে খেলা/কই সে কলরোল’।

সারা রাত ধরে কোনো কোনো বাড়িতে গানের আসর বসত। ভোর হয়ে আসছে জমিরুদ্দীন খান সাহেব গাইছেন, ‘হোলি খেলে আজ গিরিধারী/ আজ কুনজন মে ম্যাচো দোহাই’। কিংবা কোথাও বসে হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখে ফেলেছেন ‘তরুণ ঊষা খেলছে হোলি আকাশ মধুর সাথে/ মাধবীকে ডাকছে ভ্রমর পলাশ গুলাল হাতে/ জলকে যাবার ছল রাখো সই/ ফেলব ফাগের ফাঁদে’।

বাবা-কাকাদের মুখে শুনেছিলাম ‘কুমকুম মারা’ শব্দ। ব্যাপারটা কী রকম ছিল? শোলার প্যাকেটে থাকত সুগন্ধী আবির। ছুড়ে মারলে সুন্দর এক অনুভূতি। তবে এই উৎসবে যোগ দেওয়ার আগে বাড়িতে শুরু হত দোলের গান। গৃহবাসীর কাছে দ্বার খোলার অনুরোধ, উপরোধ জানিয়ে বেরিয়ে পরা সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে সেজে।

kananকারও কারও বাড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে কাননদেবীর কন্ঠস্বর, ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে, ওগো আমার প্রিয়…’। এই প্রিয়জনের খোঁজ পড়ত পাড়ায় পাড়ায়। একটু আবিরের সঙ্গে একটু ছোঁয়া যেন সেই ‘যেটুকু যায় যে দূরে,  ভাবনা কাঁপায় সুরে’, ব্যাকুল হত প্রাণ। লাল রঙ প্রেমের। তাই লাল আবিরের চাহিদা ছিল প্রবল। পরিবর্তন অনেক এসেছে নানা উৎসবে। আর উৎসব ঘিরে তার যে সমারোহ তারও বদল হয়েছে। আপাত ভাবে যে প্রসঙ্গটার বদল হয়নি তা হল দোলের গান। দোল-উৎসব ঘিরে যে গানের মহড়া চলত, তার যে প্রস্তুতি ছিল, তা কি হারিয়ে গেল? হারায়নি। কেন না বিভিন্ন চ্যানেলে এই উৎসব নিয়ে যখন আজও প্রভাতী বা বৈকালিক আড্ডা হয় তখন ঘুরে ফিরে আসে সেই পুরোনো দিনের গান বা তার কথা। ‘ও পলাশ, ও শিমুল, কেন এ মন মোর মাতালে’ এই সৃষ্টিও তো দেখতে দেখতে কত বছর পেরিয়ে গেল। 

প্রকৃতির অকৃপণ দানকে গ্রহণ করার জন্য বসন্ত তার আঁচল ছড়িয়ে রেখেছে। তাই তো রাস উৎসবের পরেই সাজো সাজো সুর তোলে শ্রীপঞ্চমী। সে এক সময় ছিল যখন সরস্বতী পুজোর পরেই আদাজল খেয়ে লেগে পড়া হত দোলের জন্য। দোল খেলা বা ম্যাড়াপোড়া নিয়ে যেমন মাতামাতি ছিল, পাশাপাশি ছিল দোলের গান নিয়ে চর্চা। ছোটোরা যেমন দোল খেলাতে মেতে উঠত, তেমনই বাড়ির বড়োরা গানের আসর বসাতেন।

উত্তর কলকাতার দোলের চেহারা ছিল অন্য রকম। উৎসবের পাশাপাশি গানের অনুষ্ঠান হত। কোথাও গোপালচন্দ্র লাহিড়ী ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছেন, সঙ্গে আছেন সরোদবাদক রাজেন সেনগুপ্ত। আবার কোথাও বা ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের পাশে জগন্ময় মিত্র বা বাণীকন্ঠ মুখোপাধ্যায়। রাত গভীরে সুবল দাশগুপ্ত, কমল দাশগুপ্ত গেয়ে উঠতেন ‘অব ছোড়ো সইয়া’। উল্টোদিক থেকে বিমান মুখোপাধ্যায় ধরতেন, ‘বধূ চরণ ধরে বারণ করি/ টেনো না আর চোখের টানে/ তোমার পিচকারিতে  রংঝারিতে/ কী গুণ আছে ননদ জানে’।

তবে দোলের আগের রাতেও গানের আসর জমে উঠত। চাঁচরের জন্য ছোটোরা সারা দিন-দুপুর কাঠকুটো জড়ো করে ম্যাড়া তৈরি করল। তাতে গুঁজে দেওয়া হল আলু। পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী রেখে ‘আজ আমাদের ম্যাড়াপোড়া’র ধ্বনি উঠল। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল আলুপোড়া খাওয়ার জন্য। মন্দিরে মন্দিরে গান শুরু হয়ে যেত। একটা সময় ছিল যখন দোলের দিন সকালে এক এক পাড়া থেকে বের হত গানের দল। সবাই মিশে যেত। ঠেলা জোগাড় করে তার ওপরে তুলে দেওয়া হত হারমোনিয়াম। খোলের সংখ্যা থাকত অনেক। আর থাকত বাঁশি ও করতাল। আরও থাকত, মঠ-ফুটকড়াই, ফেণি বাতাসা (চিনির) আর মশলাদার দরবেশ।  

সুর-ছন্দ-তাল-লয় নিয়ে উৎসব কড়া নাড়ে আমাদের দরজায়। আমরা উৎসবের দাস। উৎসব আগেও ছিল, এখনও আছে। যখন যেমন ভাবে উদযাপন করি। এই আর কী!

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here