প্রবাসীর অন্য চোখে : অভেদ্য বর্ণ/৭

0
164

rubina-chowdhury

টরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।

সৌন্দর্য চেতনার প্রকাশ মানসিক বিকাশে। এটি একটি বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, প্রচলিত নিয়মের বাইরে উপলব্ধির। কর্নিয়া মস্তিষ্কের সংযোগে যা কিছু দেখে, তার সবটুকুই প্রকৃতির শোভা। যে বাগানে বৈচিত্র্য নেই, তা চাষাবাদ, বিহার-বাগিচা নয়। তাই পৃথিবী এত রঙে সেজেছে মনোরঞ্জনের প্রফুল্লতায় চাষাবাদের পাশাপাশি; তা হোক প্রাণীজগত, বনানী বা জলাধার। এমনকি জলেরও ভিন্ন রূপ আছে। প্রতিটি প্রাণীতেই ভিন্ন রঙের আর আকারের খেলা। মানুষ নামের প্রাণীটি তাদেরই অংশ। ধর্মের কাহিনি শুনিয়ে নিজেদের ভিন্ন করতে চাইলেও কিন্তু স্বভাবে, আচরণে বা আকারে অভিন্ন।

আফ্রিকা, আফ্রিকান আমেরিকান, বা আফ্রিকান ক্যারাবিয়ান নারীর আধুনিকীকরণের আরেক নাম ঈমান। সোমালিয়ান এই মডেল শুধুমাত্র আফ্রিকা মহাদেশে নয়, পাশ্চাত্যের কালো নারীদের মাঝে মিশে গেছে আপন নামের সৌন্দর্য মহিমায়। যার প্রকৃত নাম ঈমান মোহাম্মদ আব্দুলমাজিদ। ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস, আস্থা। সেই আস্থায় জড়িয়ে আছে তার নাম আজ সমগ্র কালো আধুনিক নারীর হদয়ে, একাত্মায়। প্রথমে মডেলিং, এরপর অভিনয়, তারপর ব্যবসায়ী। তার ব্যবসার ক্ষেত্রটিই একটি বিপ্লব। মডেল এবং অভিনেত্রী হওয়ার কারণেই অত্যন্ত সৌন্দর্য সচেতন এই নারী কিছুতেই তার প্রসাধনে তৃপ্ত ছিল না। তার প্রসাধন-শিল্পীদের তৈরি টোন কিছুতে তাকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। ঈমান মূল সমস্যা উদ্ভাবন করতে পারল, যা অমুল্য কালো নারীদের কাছেই শুধু নয়, সকলের কাছে। শুধু সেদিকটা কালো নারীদের এবং সকলের নজরের বাইরে ছিল। এর আগে সবাই তাদের কালো হরিণ চোখ দেখেছে, কালো চুলের আঁধার দেখেছে। তাদের অতি যত্নের ত্বক অনেকের কাছে অবজ্ঞার হলেও রুখে দাঁড়িয়েছে এই নারী। ১৯৯৪ সালে তাই শুরু করল তার প্রতিষ্ঠান ‘ঈমান কসমেটিকস’। কালো নারীদের এক আত্মপ্রত্যয়ের দিক সূচনার আবিষ্কার। ঈমান তাদর শেখাল সাদাদের তৈরি প্রসাধন তাদের জন্য নয়, তাদের প্রয়োজন নিজের হাতের নিজের ত্বকের পরিচর্যা, সাজে নিজস্ব ভাবধারা। বেরিয়ে এল সাদার তৈরি নিয়ম ভেঙে।

তার নিজের ভাষ্যমতে, “বাবা-মাকে ধন্যবাদ আমার গলা লম্বা করে জন্ম দেওয়ায়, তাই আমি পৃথিবীকে স্পষ্ট দেখতে পাই।” মডেলিং নিয়ে বলেছে, যখন সে আমেরিকায় যায় ১৯৭৫ সালে, তখন দেখেছে সাদা মডেলদের তুলনায় কালো মডেলদের কম পারিশ্রমিক দেওয়া হত, তাই সে মডেলিংকে বেছে নেয় পেশা হিসাবে। রাষ্ট্রদূত বাবা আর ডাক্তার মায়ের সাথে বিশ্বের অনেক দেশে ছোটোবেলা ঘুরে বিশ্বায়নে অভ্যস্ত ঈমান সোমালি, আরবি, ইংরেজি, ফরাসি ভাষায় দক্ষ। ছড়িয়ে পড়েছে ঈমানের পণ্য পৃথিবীর কালো অধ্যুষিত দেশগুলোতে। বিশেষ করে সারা পৃথিবীতেই ঈমানের প্রসাধন মডেল এবং তারকাদের মাঝেই পরিচিত। প্রথমে নাকি তার পণ্য নিজের উপরে প্রয়োগেই এই প্রসার।

দুই সোমালি আমেরিকান যমজ বোন আয়ান মোহাল্লিম এবং ইডলি মোহাল্লিম, যারা কিনা ‘মাটানো ফ্যাশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ঈমান ২০১২ সালে এই দুই তরুণীকে তার কোম্পানির গ্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করে উৎসাহিত করেছে। এমন উৎসাহ পেলে এগিয়ে আসবে অনেকেই।

ঈমান এই বিষয়গুলোকে তুলে ধরার জন্য বই লিখেছে দুটি, ‘আই অ্যাম ঈমান’ এবং ‘দ্য বিউটি অফ কালার’।

তার দুটি বিষয় আমাকে টানল, তার পণ্যের মূল্য এবং তার একটি উক্তি। পণ্যের মানে যে মূল্য হওয়ার কথা, তার থেকে, বাজারে সমতূল্য মানের পণ্যের মূল্যের থেকে অনেক কম করে দাম রেখেছে সে। উদ্দেশ্য একটিই, আফ্রিকা উপমহাদেশের আর্থিক অবস্থা। সেদিকটা মাথায় রেখেই মূল্য নির্ধারণ করেছে। বিষয়টি আমাকে অভিভূত শুধু করেনি, নাড়া দিয়েছে অন্তরে। আমাদের মতো প্রবাসীদের সন্তানদের নিজের দেশের পরিচয় জানা খুব প্রয়োজন। তারা যেন নিজের পূর্ব প্রজন্মের দেশটিকে ভুলে না যায়। তাদের কৃতিত্বে তাদের বাবা-মায়ের দেশ আপন স্নেহে আনন্দে ভাসে। তার মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে, তাদের শেখাতে হবে। যে কাজ করেই তারা কৃতী হোক না কেন, যেন সেই সব দরিদ্র দেশ সামান্য হলেও হিসাব বুঝে পায়। আমরা যারা বিদেশের মাটিতে ভাগ্য অন্বেষণে আসি, সবটুকু নিয়ে আসি নিজের দেশ থেকেই। আমাদের সন্তানরা আমাদের দিনরাত্রি পরিশ্রমের ফসল। উন্নত দেশের বুকে সুযোগ সুবিধায় তাদের কৃতিত্বের ভাগের অধিকার আমাদের দেশগুলো শতভাগ রাখে। কিন্তু কম পরিবারই সে শিক্ষা সন্তানদের দিতে পারে।

এরপর আসি তার উক্তিটিতে, “প্রশান্তি ঝড় থেকে মুক্তি পেয়ে নয়, ঝড়ের মাঝেই খোঁজো”। এমন আত্মপ্রত্যয়ীরাই পৃথিবীকে নতুন দিক দেখাতে পারে। স্ফূলিঙ্গের মতো এরা ছড়িয়ে পড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে। পৃথিবীর যেখানেই জন্ম নিক না কেন, এদের তাপে পুড়ে ছারখার হয় ভেদাভেদের অর্থহীন প্রচলিত প্রথা। আজকের প্রজন্মের কালো বর্ণের নরনারী যখন নিজেদের কালো বর্ণের কারণে হীনম্মন্যতার পরিবর্তে বরং গর্বিত, তাদের এই পথের প্রদর্শকের একজন হয়ে আছে ঈমান। তুমি যা, তাতেই তুমি, এই ভাবটিই আত্মসম্মানের, নিজেকে দেখে চেনার নতুন আয়না।

(চলবে)   

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here