১০৫তম জন্মবর্ষে ‘গণমনের জাদুকর’ নিবারণ পণ্ডিতকে স্মরণ

0
201

মাঝে বসে নিবারণ পণ্ডিত 

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

বয়স তখন দশ কি এগারো। জীবনধারণের সংজ্ঞা বদলে দিল বাবার মৃত্যু। কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুলের পড়া ছেড়ে দিয়ে বিড়ি কারখানায় কাজ নিল কিশোর। সেই সময় থেকে বুঝতে পারল মালিক-শ্রমিকের দুর্বিনীত সম্পর্ক। রাগ আর দুঃখ উগরে দিতে খাতা-কলম হয়ে উঠল প্রধান অস্ত্র। প্রথম লেখা সহকর্মীদের উপরে মানসিক শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে।

কিশোরবেলার সেই সব লেখা ক্রমে গানে রূপ পেল। আর এই গান কোথা থেকে এল? পিতা ভগবানচন্দ্র পণ্ডিত সগড়া গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। মা বিন্দুবাসিনী ভালো গাইতেন। সেই গান নিবারণকে উৎসাহিত করত। গ্রামীণ সংগীতের আবর্তে নিবারণের বাল্য-কৈশোর কেটেছে। গ্রামে গ্রামে যে কীর্তন, বাউল গানের আসর বসত সেখানে নিত্য যাতায়াত ছিল। সেই আসরের গান শুনে গান ও গাইয়েদের জন্য গান লেখা শুরু করল। গ্রামে যাঁরা পালাগান, কথকতা, কীর্তন করতেন তাঁদের জন্য গান লিখে দিতেন। এই ভাবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল ‘জনযুদ্ধের ডাক’-এর কবি নিবারণ পণ্ডিতের।

১৯১২, ২৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সগড়া গ্রামে জন্ম নিবারণের। বিড়ি বাঁধতে গিয়ে মহাজনি চক্রান্তে জড়িয়ে পড়ায় ভোগ করলেন শোষণের যন্ত্রণা। বাজিতপুরে এক আসরে গাইতে উঠে দেখেন সামনের আসনে বসে সেই অত্যাচারী সমাজপতি, যাঁর কুখ্যাতি গ্রামে গ্রামে। তাঁকে দেখেই গান বেঁধে ফেললেন। আসর প্রায় শেষ, হইহই পড়ে গেল। শ্রোতারা দু’ভাগ। উচ্চবিত্ত, জমিদার আর শাগরেদরা এক দিকে আর অন্য দিকে গরিবগুরবো সঙ্ঘবধ মানুষ। মার খেতে খেতে বেঁচে যান নিবারণ সে দিন। বুঝলেন নির্যাতিত মানুষকে বাঁচানোর জন্য সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদই হল আসল হাতিয়ার।

nibaকৃষকসভা, কমিউনিস্ট পার্টি ও ভারতীয় গণনাট্যের সংস্পর্শে আসার পরে নিজের জীবনের স্পষ্ট দিশা খুঁজে পেলেন নিবারণ। গ্রামবাসীর সঙ্গে গভীর ভাবে মিশে, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকথায় গান লিখলেন। সেই গান মানুষকে শিখিয়ে গড়ে তুললেন স্কোয়াড। সেই দল নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে জনচেতনা বাড়ানোর চেষ্টা করলেন। হয়ে উঠলেন বিপ্লবী শিল্পী। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে নিবারণ লিখলেন ‘জনযুদ্ধের ডাক’। লিখলেই তো হল না, কী ভাবে তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সে সব ছিল সর্বক্ষণের চিন্তা। স্কোয়াডের এক সদস্য ওই সব গান বইয়ের আকারে ছাপিয়ে বিক্রি করার পরামর্শ দেন। তাঁর নিজের কথায়, “জনযুদ্ধের ডাক’ কবিতাটি প্রথম পাঁচ হাজার ছাপাই ৩৫ টাকা ধার করে। দুই টাকা রিম কাগজ, ছাপা খরচ প্রথম হাজার আট টাকা, পরের প্রতি হাজার চার টাকা হিসেবে পুরো টাকা শেষ হয়ে গেল। বইয়ের দাম ঠিক হল এক টাকা। আমি ৭৫ হাজার ছাপিয়েছিলাম। ৭০ হাজার নিজে বিক্রি করেছি, বাকি পাঁচ হাজার বিনা পয়সায় এদিক ওদিক গিয়েছে।” এর পরেও ধারের টাকা ফেরত এল না। বিক্রির টাকা স্কোয়াড চালানোর কাজে খরচ হল। পরের বই ছাপানোর জন্য এক বিঘা জমি একশো টাকায় বিক্রি করলেন।

দেশ ভাগের পরে নিবারণ চলে যান পূর্ব পাকিস্তানে। সেখানে ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড় অঞ্চলে খাজনা মেটানোর জন্য টংক প্রথার প্রচলন ছিল। এখানেই চাষিরা মহাজনদের কাছে নিঃস্ব হয়ে যেতেন। এর বিরুদ্ধে গান লিখে আন্দোলনে নামেন নিবারণ। জমিদারদের  বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন হাজংরাও। ওই আন্দোলন নিয়েও তিনি গান বাঁধলেন। শেষ পর্যন্ত মুসলিম লিগ সরকারের রোষানলে পড়ে জেলে গেলেন। সেখানে অসহনীয় অত্যাচারের কথা তিনি লিখেছেন। পরে ১৯৫০-এর ডিসেম্বরে ছাড়া পেয়ে ভারতে এসে প্রথমে আলিপুরদুয়ারের এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠেন। সেখান থেকে কামাখ্যাগুড়ি হয়ে দিনহাটা। শেষে কোচবিহারের ডাউয়াগুড়িতে স্থায়ী ভাবে বসবাস।

panগড়িয়ে যাওয়া দিনের সঙ্গে নিবারণের সংসার হল, লেখা কিন্তু থামল না। লিখলেন ‘বাস্তুহারার মরণকান্না’, ‘পুনর্বাসন না নির্বাসন’, ‘খাদ্যের বদলে গুলি’, ‘ভোটের গান’ (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে), ‘হান্ডিবাড়িতে পুলিশের লাঠি চালনা’, ‘উত্তরবঙ্গের বন্যা’ ‘ষড়যন্ত্র’, ‘স্বাধীনতার ডাক’, ‘ময়মনসিংহের জারি গান’ ইত্যাদি। দাম ছিল এক আনা থেকে দু’আনা, যা কৃষকের কেনার ক্ষমতার মধ্যে থাকে। পঞ্চাশের দশকে নতুন জমিদারি আইনে চাষিরা যাতে প্রতারিত না হয় সেই জন্য নিবারণের কলম সচল রইল। কবিতায় লিখলেন ‘জমিদারি ক্রয় লাইনের সারমর্ম’, ‘নয়া আইনের ধারা’, ‘জরিপ ও ভূমি সংস্কার’।

কঠিন দারিদ্র্যে সংসার অচল হয়ে পড়লে গণকবিতা লেখা বন্ধ হয়নি। তাঁর কথায়, ‘ডাউয়াগুড়ির বাবার বাড়িতে থাকি। বাবাকে দেখতাম গাছের নীচে চট বিছিয়ে কবিতা লিখছেন, কখনও বা তাতে সুর দিচ্ছেন। জেলার সঙ্গীতপ্রিয় মানুষেরা বাবার কাছে আসছেন।’ সেই ধারা ছিল নিবারণের রক্তে। তিনি কেবল গীতিকার বা গায়ক ছিলেন না। তিনি ময়মনসিংহ জেলার লতিফাবাদ ইউনিয়ন কৃষক সমিতির সম্পাদকও ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গ্রাম্য ছড়া, কবির গান, যাত্রার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জনযুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে পারবে। ময়মনসিংহের নেত্রকোণায় সারা ভারত কৃষক সম্মেলনে নিবারণবাবুকে দেখে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছিলেন ‘পদ্মকে যেমন দেখতে হয় দিঘির মাঝে তেমন লোককবিকে চিনতে হয় জনতার মাঝে’। এ শুধু কথার কথা ছিল না, কলকাতার সাহিত্য সম্মেলনে গুণীজন সমাবেশে নম্র নিবারণবাবুকে দেখে অনেকেই চমকে উঠেছিলেন। মেলাতে পারছিলেন না নেত্রকোণায় পেশিবহুল, আদুল গায়ে কোমরে গামছা বাঁধা, লুঙ্গি পরা মুসলমান কৃষকদের জারি নাচের মাঝখানে কবিকে দেখে। এমনই ছিলেন গণমনের এই জাদুকর।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here