“কে রে ?”

1
415
সোমলেখা

পা টিপে টিপে ঠাকুমার ভাঁড়ার থেকে আচার চুরির দিনগুলো বড়োই সুন্দর ছিল। আমাদের নিজেদের পেটের ভেতর বোধহয় তখন ছিল অনাবিল আনন্দের অসংখ্য ফোয়ারা। মোটা কাচের শিশিতে রাখা কুলের আচার। দুপুরে ভাত খাওয়ার পর মা দু’টো করে সবাইকে কুল দিত আর বলত, “বেশি খেলে পেট ব্যথা করবে”। ওতে কি আর আমাদের মন ভরে? টার্গেট, দুপুরবেলা ঠিক ৩.১৫। বেরিয়ে পড়লাম আমি আর আমার দুই ভাই। পাতকুয়া পেরিয়ে, ঠাকুরঘরের বারান্দা পেরিয়ে ভাঁড়ার ঘর। সেখানে জ্বলজ্বল করছে আচারের বোয়াম। আমাদের ‘হোলি গ্রেইল’। কোনো রকমে গিয়ে, টুলটা টেনে, পা উঁচু করে যেই চারটে বার করেছি, অমনি ঠাকুমার গলা, “কে রে”? আর বোয়ামের ঢাকনা আটকানোর সময় পেলাম না, দে ছুট।

আর ছিল পাতকুয়া, তার পাশে চার পাঁচটা নারকেল গাছ। পাতকুয়ার উপর বিছোনো থাকত একটা জং ধরা তারজালি। সেটা সরিয়ে টলটলে জলে মুখ দেখা ছিল এক নিষিদ্ধ কাজ। ইটের উপর ইট রেখে তার উপরে উঠে উঁকি। আর বাগান থেকে অমনি ভেসে এল মালিকাকার চিৎকার, “কে রে”?

পেয়ারা গাছে ওঠাটা চ্যালেঞ্জ ছিল একটা। যেটা দেখা যায় না এমন একটা গুপ্ত সুপার পাওয়ার ছিল আমাদের মধ্যে। সেটা হল ‘অদৃশ্য লেজ’। গাছে চড়তে আমাদের ভীষণ ভালো লাগত। আর পেয়ারা গাছটা বেশ ডালপালায় ভরা থাকায় ওতে চড়তে বেশ সুবিধে হত। উঠেই ডাঁসা পুরুষ্টু পেয়ারায় কামড়। আর তার পর চলত বাড়ির পাঁচিলের উপর ব্যালেন্স প্র্যাকটিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলা ভাঙল সদ্য ঘুম থেকে ওঠা পাশের বাড়ির কাকিমার বিরক্তিভরা গলায়, “কে রে”?

বিজ্ঞাপন

আমাদের বাড়িটা বেশ বড়ো একটা জায়গা। ছিল বাড়ির পিছনে বাগান আর তার মধ্যে একটা পুকুর। গরমকালে এই জায়গাটা ছিল আমার সব চেয়ে প্রিয়। যখন তখন জলে ঝপাং! সেই সুবাদে আমার নাম হয়েছিল ‘জলপোকা’।

দাদু বলত, সাঁতারের সব চেয়ে সময় ভোরবেলা। কিন্তু কোনো দিনই আমি উঠতে পারতাম না। এক বার ভুল করে ভোরবেলা উঠে পুকুরে নেমে পড়লাম। ডুব-সাঁতার দিতে দিতে মনে হল, পাড় থেকে কে যেন ডাকছে। মাথা তুলে শুনি, দাদু দূর থেকে বলছে, “কে রে”? অন্য বাড়ির কেউ এসেছে মনে করেছিল বোধহয়। কারণ আমার ঘুম ভাঙতে পারে না এটাই ছিল দৃঢ় বিশ্বাস।

এই ‘কে রে’গুলো শুনতে শুনতে বড়ো হয়ে গেলাম কখন। একটা মানুষের বড়ো হয়ে ওঠার পেছনে এই শব্দ দু’টোর বোধহয় অনেক অবদান থাকে। আর কখনও কখনও সেই ‘কে’টাকে খোঁজার তাগিদও তৈরি করে দেয় মনের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here