আজ ১৯ মে, কমলাদের আত্মত্যাগের দিন

0
132

IMG_7247

শম্ভু সেন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, সফিক, জব্বার, বরকতরা। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। সেই আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা তার মর্যাদা আদায় তো করে নিয়েই ছিল, উপরন্তু সেই আন্দোলন আরও এক বৃহত্তর আন্দোলনের বীজ বপন করে দিল। শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল ইতিহাসের আমূল পট পরিবর্তন। ১৯৭১-এ পাকিস্তানের শাসককুলের হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষজন স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিল। জন্ম হল বাংলাদেশের। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি পেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ১৯ মে দিনটাকে আমরা ভুলতে বসেছি। সে ছিল রক্তঝরা আরও একটি দিন। ঠিক ৫৫ বছর আগে ১৯৬১ সালের এই দিনেই বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন ভাষা সৈনিক – দশ জন তরুণ, এক জন তরুণী।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা আর বরাক উপত্যকা নিয়ে আজকের অসম। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা অসমিয়া হলেও করিমগঞ্জ, কাছাড়, শিলচর, হাইলাকান্দি  নিয়ে গড়া বরাক উপত্যকা হল বাঙালিদের এলাকা। দেশবিভাগের এক বছর পর রেফারেফান্ডামের মাধ্যমে সুরমা ভ্যালি (বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ) পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের তিন-চতুর্থাংশ নিয়ে গঠিত বরাক ভ্যালি থেকে যায় অসমে। ১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এত্রিল অসম প্রদেশ কংগ্রেস অসমিয়াকে রাজ্য ভাষা করা নিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। মাস দুয়েক পরে মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা বিধানসভায় ঘোষণা করেন অসমিয়াকে রাজ্যভাষা করা নিয়ে সরকার শীঘ্রই একটি বিল আনছেন। ২ জুলাই শিলচরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’ ডাকা হয়। ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করার জন্য কেন্দ্রকে অনুরোধ করা হল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হল ‘বঙ্গাল খেদাও’। বাংলাভাষীরা দলে দলে অসম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে শুরু করল। ১৯৬০ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতা পালন করল শোক দিবস। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গোবিন্দবল্লভ পন্থকে শান্তিদূত করে পাঠালেন অসমে। পন্থজি ফর্মুলা দিলেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নির্দ্বিধায় তা নাকচ করে দিল। কাছাড়বাসীরা ছুটলেন দিল্লি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার। ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর রাজ্যভাষা বিল পাশ হয়ে গেল অসম বিধানসভায়। নতুন আইনে সমগ্র অসমে সরকারি ভাষা হল অসমিয়া। শুধুমাত্র কাছাড়ে জেলাস্তরে রইল বাংলা ভাষা।

বরাক উপত্যকা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল। ভাষার প্রশ্নে এক মন এক প্রাণ হয়ে শপথ নিল ‘জান দেব, তবু জবান দেব না’। মাতৃভাষার মর্যাদা যে কোনও মূল্যে রক্ষা করার শপথ নিল বরাকের বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে কাছাড় জেলা সম্মেলন আহ্বান করা হল। সম্মেলন থেকে দাবি তোলা হল, ‘বাংলাকে অসমের অন্যতম রাজ্য ভাষা হিসাবে মানতে হবে’। অসম সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে জবাব চাওয়া হল।

অসম সরকার নিরুত্তর। সরাসরি লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হল বরাক। ছাত্র সমাজের ডাকে ১৮ মে করিমগঞ্জ শহরে যে শোভাযাত্রা বেরোল, তা যেন এক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিল। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার দাবিতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যোগ দিল শোভাযাত্রায়। আর সেই শোভাযাত্রার মোকাবিলা করতে সারা জেলা ছেয়ে গেল পুলিশ আর মিলিটারিতে। জারি হল ১৪৪ ধারা। করিমগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের দুই নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন ও নলিনীকান্ত দাস এবং ছাত্রনেতা নিশীথরঞ্জন দাসকে গ্রেফতার করা হল।

১৯ মে। ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত বরাক উপত্যকায় হরতালের ডাক দিল কাছাড় জেলা সংগ্রাম পরিষদ। ডাক উঠল, ট্রেনের চাকা ঘুরবে না, বিমানের পাখা ঘুরবে না, অফিসের তালা খুলবে না। ভোর হতেই সত্যাগ্রহীরা রেললাইন অবরোধ করল, রানওয়ের ওপর শুয়ে পড়ল, দল বেঁধে দাঁড়াল বিভিন্ন অফিসের সামনে। সত্যাগ্রহে উত্তাল হয়ে উঠল শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি, বদরপুর সহ গোটা বরাক উপত্যকা।

বেলা দু’টো, দুপুর গড়িয়ে চলেছে। মাতৃভাষা জিন্দাবাদ ধ্বনিতে শিলচর রেলস্টেশন মুখর। হঠাৎ গুলির আওয়াজ। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল ‘শান্তিরক্ষক’দের রাইফেল থেকে। রক্তে ভেসে গেল শিলচর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে দিতে গুলিতে লুটিয়ে পড়ল ১১টি তাজা প্রাণ। ১৯৬১-এর ১৯ মে জন্ম দিল আরও ১১ জন ভাষাশহিদের – কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, হিতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, কুমুদরঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্র দেব এবং বীরেন্দ্র সূত্রধর। ১৬ বছরের কমলা দু’ দেশের বাংলা ভাষা আন্দোলনে একমাত্র নারী শহিদ।

কমলাদের আত্মবলিদান বৃথা যায়নি। ১৯৬০ সালের অসম ভাষা আইন সংশোধন করা হয়। শহিদের রক্তভেজা বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেল।

’৫২-এর পরে ’৬১। একই ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ন’ বছরের ব্যবধানে দু’টি আন্দোলন দু’টি ভিন্ন দেশে। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। আমরা, বাঙালিরা যেন মনে রাখি, একুশের পাশাপাশি আমাদের একটা উনিশেও আছে। ১৯ মে – কমলাদের আত্মত্যাগের দিন।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here