শতবর্ষে রাধিকামোহনের জীবনখাতায় চোখ বোলানো

0
159

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

বেশি শাসনের নিগড়ে বাঁধতে গেলেই পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা। তখন কতই বা বয়স। গরমের ছুটিতে কারশিয়াং-এর বাড়িতে এসেছে তেরো-চোদ্দো বছরের কিশোর। সেখানে গিয়ে বাবা বাঁধালেন এক মহা ঝঞ্ঝাট। কয়েক দিনের মধ্যে বাড়িতে পড়ানোর জন্য রাজশাহি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিয়ে এলেন। স্টেশন থেকে আনার দায়িত্ব পড়ল সেই কিশোরের। শর্টকাট পথ দিয়ে আনার নাম করে খান চারেক পাকদণ্ডি দিয়ে বাড়ি আনলেন যখন, তখন প্রধান শিক্ষকের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। পরের দিন হাঁসফাঁস করতে করতে শিলিগুড়ি ফিরে গেলেন। সেখান থেকে ট্রেন। এ হেন ছাত্র পরবর্তী কালের বিখ্যাত সরোদবাদক রাধিকামোহন মৈত্র।

আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি, জন্মদিনের শতবর্ষে তাঁর জীবনখাতার পাতা পড়ার চেষ্টা করছি।

রাধিকামোহন মৈত্র এক সাংগীতিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ঠাকুরদা ললিতমোহন মৈত্র ছিলেন তবলাবাদক, পিতা ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্র ছিলেন সরোদবাদক, মা বীণাপাণিদেবী খুব ভালো সেতার বাজাতেন। তিনি সেতার শিখেছিলেন ওস্তাদ এনায়েত খানের কাছে। ঠাকুরদার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ছিলেন মহম্মদ আমির খান, যিনি রাধুবাবুর প্রধান গুরু ও শিক্ষক ছিলেন। শাহাজানপুর ঘরানায় অভিষিক্ত বাজনার বাইরে রাধুবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন-এ এমএ ও এলএলবি পাশ করেন। সরোদের পাশাপাশি শৈশবে সেতারবাদক উস্তাদ এনায়েত  খানের বাজনা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। রাধুবাবুর বাদ্যঘরানা সেই সময়ের হিন্দুস্থানী সঙ্গীতসমাজকে ভীষণ ভাবে আলোড়িত করেছিল।

রাজশাহি লোকনাথ হাইস্কুলের ছাত্রের গুণময় জীবনে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। এমন বিচিত্র জীবন নিয়ে কিছু কিছু ভাগ্যবান জন্মগ্রহণ করেন। রাধিকামোহনের বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলেন শাহজানপুরের মহম্মদ আমির খান। জন্মের পরে রাধুবাবু সেই ওস্তাদজির কোলে কোলে ঘুরতেন। আমির খানসাহেব তাঁকে উজাড় করে বিদ্যাদান করেছিলেন। সরোদের বাজ যথাসম্ভব সম্পূর্ণভাবে তাঁকে দিয়ে আয়ত্ত করিয়েছিলেন। কুড়ি-একুশের পূর্ণ যুবক শিক্ষালাভ শেষ করে বসে থাকতে পারলেন না। অনেকেই পরামর্শ দিলেন বাবা আলাউদ্দিনের কাছে যেতে। কিন্তু সন্তান ও শিষ্যদের ওপরে বাবার ভয়ংকর সংশোধনক্রিয়ার জন্য রাধুর শেখা হয়ে ওঠেনি। শেষে গাণ্ডা (নাড়া) বাঁধেন আলাউদ্দিনের গুরু উজির খানসাহেবের বড় নাতি দবির খানের কাছে।

 

সরোদিয়া পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত নিজের গুরুলাভের কথা শোনাচ্ছিলেন -‑ দিনাজপুরে প্রথম সাক্ষাৎ গুরুদেব রাধিকামোহন মৈত্রর সঙ্গে। পুরুষ মানুষ যে অত সুন্দর হয় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। “তখন গুরুদেবের পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর হবে। যথেষ্ট বিখ্যাত হয়েছেন। ঝকঝকে তরোয়ালের মত একটি যন্ত্র নিয়ে নীল রঙের বাইক চড়ে তিনি আমাদের বাড়ি এলেন। এবং বাজালেন। সরোদ যন্ত্রটি প্রথমবার দেখলাম ও শুনলাম। শুনেই বায়না ধরলাম, ওটা শিখব। তখন আমার বয়স দশ-এগারো।” রাধুবাবু ছিলেন সেই ধরনের গুরু যিনি শিষ্য তৈরি করার জন্য বাজি ধরতেন। তার জ্বলন্ত উদাহরণ পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। গুরুদেবের কাছে ৫ হাজার টাকা বাজি ধরেছিলেন বাবা প্রফুল্ল দাশগুপ্ত।

রাধিকামোহনের জমিদারি ছিল রাজশাহি জেলার তালন্দে। তখনকার দিনে বছরে তিন লাখ টাকা আয়। বিয়ের সময় গানবাজনা হয়েছিল। বাইরে থেকে এসেছিলেন সানাইয়ে বিসমিল্লা খান ও তাঁর ভাই। শ্বশুরবাড়ি হল ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে সুষঙ্গে। হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। ছন্দে বাঁধা যাঁর জীবন তিনি যেতে যেতে উপলব্ধি করেছিলেন হাতির চলন থেকে যে ধামার তালটির সৃষ্টি হয়েছিল, তার উপরে চড়লে তবে বোঝা যায়। দেশভাগের বছরেই রাজশাহি ছেড়ে মামাবাড়ি চক্রবেড়িয়ায় চলে আসেন।

রাধুবাবুর জীবনে অনিল রায়চৌধুরী ছিলেন অপরিহার্য। কে এই অনিল? রাধিকামোহনের প্রবীনতম শিষ্য। তিনি ছিলেন রাধুবাবুর সর্বময় একজন অভিভাবক। কে ‘প্রয়াগ’-এর পরীক্ষায় বসবে, কে ‘তানসেন প্রতিযোগিতা’য় বসবে, কে ‘মুরারি সংগীত সম্মেলন’-এ বাজাবে -‑ এই সব ব্যাপারে ছিল তাঁর সর্বক্ষণ চিন্তা ও দৌড়োদৌড়ি। তা ছাড়া রাধুবাবুর সংসারে নানা ফাইমরমাশ, টেস্ট ম্যাচের টিকিট, পোস্তা থেকে নানা মশলা আনা, নতুন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের খোঁজ এবং সমস্ত সাংগীতিক ক্রিয়াকর্মের তিনি ছিলেন ম্যানেজার। কোথাও বাজাতে গেলে তিনি ছিলেন রাধুবাবুর ছায়াসঙ্গী।

highlightপণ্ডিত রবিশঙ্করের লেখায়, তিনি একজন উচ্চস্তরের ধ্রুপদী শিল্পী ছিলেন। নিয়মিত রেডিও, টিভি ও দেশ-বিদেশের নানা সংগীত সম্মেলনে যোগ দিতেন। রাজশাহিতে থাকাকালীন ১৯৩৫ সালে কলকাতার সেনেট হাউসের সম্মেলনে রাধুবাবু ‘নটকেদারা’ বাজিয়েছিলেন। বাবা আলাউদ্দিনের কাছে না শিখলেও বাজনার প্রভাব সরোদিয়া রাধুবাবুর পরিবেশনায় ছিল। ‘ঝংকার’ নামে এক সংগীতচক্র খুলেছিলেন। সেখানে বার কয়েক বাজাতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে আলাপের পর্ব শুরু। জ্ঞানের পরিধি ও সংগীতচিন্তা ছিল গভীর ও বিস্তৃত। ওঁর বাজনার অনেকখানি পাওয়া যায় ওঁর শিষ্য বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মধ্যে।

তাঁর সৃষ্টি ‘ঝংকার’-এর মাসিক অধিবেশন লেগেই থাকত। এমনই এক অধিবেশনে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে সংগত করার জন্য জ্ঞানবাবু এবং রাধুবাবু ঠিক করলেন তবলিয়া কানাই দত্ত বাজাবেন। পন্ডিতজির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সিদ্ধান্তে অটুট রইলেন, এবং বললেন, রবুভাই কানাইকে নিয়ে বসতে হবে। সেই আসরের বাজনা থেকে কানাই দত্ত বিখ্যাত হয়ে গেল। এই ছিল ‘ঝংকার’-এর গুণমান।

তবে ‘ঝংকার’ খোলার অনেক আগে রাজশাহিতে ‘আষাঢ়ে ক্লাব’ নামে একটি সংস্থা গড়ে উঠেছিল রাধিকামোহনের ব্যবস্থাপনায়। পরে ঝগড়াঝাঁটি হওয়ায় বন্ধুরা আলাদা হয়ে গেলে তাঁর ক্লাবের নাম হল ‘স্বতন্ত্রা’। কলকাতার ২৫ নম্বর ডিক্সন লেনের সদর দরজা ছিল সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের জন্য অবারিত। এই বাড়িতে থাকতেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। এই বাড়ি বহু মজার ঘটনার সাক্ষী। এমণ এক দিনের ঘটনা -‑ জ্ঞানবাবুর বাড়ি এসেছেন রাধুবাবু। রাধুবাবুর ডাকে দূর থেকে সাড়া এল ‘ওই যে আমি’। অমন সম্বোধনের মানে কী? মানে খুব সহজ। তিন তলা থেকে ওই ভাবে বলা। তিনি যদি এক তলায় থাকতেন তা হলে বলতেন ‘এই যে আমি’। রাধুবাবুর উত্তর, সত্যি আপনার জ্ঞানপ্রকাশ নাম সার্থক। বলেই গেয়ে উঠলেন ‘জ্ঞান সাবানে না কাচিলে ঘিলুর ময়লা ওঠে না হায়’। বিন্দুমাত্র দেরি না করে তেতলার ঘর থেকে উত্তর এল, ‘রাধুর পাটে আছাড় খেলে ঘিলু একদম ঘেঁটে যায়।’

বাবা আলাউদ্দিন খানসাহেবের কাছে রাধিকামোহন যে স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছেন তা আর কারওর কাছে পাননি। এক অনুষ্ঠানে এক সঙ্গে বাজিয়ে ওঠার পরে নিজের একটি ‘জাওয়া’ (তিনকোণা স্ট্রাইকার যা দিয়ে তারে আঘাত করা হয়) উপহার দিয়েছিলেন। রাধুবাবু তা রুপোর কৌটোয় রেখে দিয়েছিলেন। এমন কৌটোয় না জানি আরও কত কী আছে!

ঋণ স্বীকার:

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: বামনের চন্দ্রস্পর্শাভিলাষ

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here