এখন যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা নাকি দারুণ অভিনয় করেন: চিরঞ্জিত

0
302

(প্রায় চল্লিশ বছর ধরে প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসে বেঁচে আছেন বাংলা সিনেমার সঙ্গে। শুরু থেকেই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সফল নায়ক। সাধারণ মানুষের প্রিয় হিরো, পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে অন্য ধারার চলচ্চিত্রেও তিনি সফল অভিনেতা। তাঁর চিত্র-পরিচালনায় তৈরি হওয়া সিনেমাও পেয়েছে বাণিজ্যিক সাফল্য। যদিও কৈশোর থেকে তাঁর বেড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে যে সিনেমার স্বপ্ন তিনি মনে মনে লালন করেছেন, নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন তা থেকে গিয়েছে প্রায় অধরাই। দূরদর্শনের সংবাদপাঠক হিসেবে শুরু করে দু’শোর বেশি সিনেমার তারকা হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী চষে ফেলেছেন বাংলা সিনেমার অন্তরমহল, অলিগলি থেকে বহির্জগত। ‘খবর অনলাইন’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে উঠে এল বাংলা সিনেমার আজ-কাল-পরশুর ফ্রেম-টু-ফ্রেম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষ পর্ব।)

  • হিন্দি বাণিজ্যিক সিনেমার চরিত্র বদলাচ্ছে। সেটা এখন বাস্তববাদী সিনেমার কাছাকাছি হচ্ছে, বাংলায় কেন নয়?

চির: এখানে সিনেমার ইকনমিক্সটা দেখতে হবে। ধরা যাক ‘দঙ্গল’ আমির খানের ছবি রিলিজ হচ্ছে পৃথিবী জুড়ে ৫৬০৩টে প্রেক্ষাগৃহে, যেখানে বাংলা সিনেমার সর্বোচ্চ রিলিজ ২০০টা প্রেক্ষাগৃহে। হিন্দিতে মাল্টিপ্লেক্স পাচ্ছে ৫ হাজারটা সেখানে আমাদের ৯টা। একটা অসম প্রতিযোগিতা। ওখানে দু’ সপ্তাহ চললেই পয়সা উঠে যাচ্ছে, এখানে ৯ সপ্তাহ না চললে সেটা সম্ভব নয়। হিন্দিতে ‘লাঞ্চ বক্স’-এর মতো সিনেমা হচ্ছে যেটা পয়সা ফেরত আনতে পারছে, এখানে সম্ভব হচ্ছে না।

  • কিন্তু আগে বাংলা সিনেমায় কাহিনি চিত্রনাট্য, অভিনয় যে মানের ছিল এখনও কি তাই আছে?

চির: কেন, এখন যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা নাকি দারুণ অভিনয় করেন। ডিরেক্টরদের সম্পর্কে কোথাও এক লাইন সমালোচনা কেউ লিখতে পারবে না। মিডিয়ার বায়াস্‌ড থাকাটা খুব প্রভাব ফেলছে। নাটকও লোকে দেখবে কোন গ্রুপ, কে ডিরেক্টর, মিডিয়া সেটাকে কী ভাবে প্রচার করছে তার ওপর। সিনেমাও তাই। কিন্তু জনগণ তো এখনও আগের মতোই রয়েছে, বদলায়নি – সেটা তো ভাবতে হবে। সে দিন কথা হচ্ছিল। বলা হল, কৌশিক সেনের বাবা শ্যামল সেন অন্য রকম যাত্রা করতেন – সেগুলো হয়তো হিটও করত, যেমন ‘গণদেবতা’। কিন্তু সে সব কখনও ‘সিঁদুর দিও না মুছে’ বা ‘কবরের কান্না’-র মতো হিট নয়। সিনেমাতেও ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ এক বছর টানা হাউসফুল চলেছিল। আজও হাজারটা প্রিন্ট করে চালানো হোক রূপকথার গল্প, দেখবে হাউসফুল আজও যাবে। 

  • দীপক দেখবে?

চির: দীপক ‘বেদের মেয়ে’ দেখেছে দু’ বার, ‘পথের পাঁচালী’ পঁচিশ বার।

  • ৭৯-তে আপনার প্রথম রিলিজ, সেখান থেকে আজ ২০১৭। কোনো পরিবর্তন দর্শকের মধ্যে হয়নি?

চির: একই আছে। সংখ্যায় দর্শক বেড়েছে। যাঁদের নাম-টাম আছে, তাঁদের নাটক, সিনেমায় দর্শক হচ্ছে। কিন্তু বেসিক কিছু বদল হয়নি। জনগণ এক জন ত্রাতাকে চায়। যেমন রামায়ণে রামচন্দ্র।  যে সব কিছু থেকে মুক্তি দেবে, উদ্ধার করবে। সিনেমার নায়কও তাই। সেই জন্য রবিশঙ্কর, বিসমিল্লা যেমন আছেন থাকবেন। কিন্তু ঘরে ঘরে যে সানাইটা বাজবে তাতে ‘দেশ’, ‘মল্লার’ বাজবে ভেবে লাভ নেই। ওখানে দু’ একটা হিন্দি গানও বাজুক। তিনশো পাতার পুজো সংখ্যায় গল্প-উপন্যাস রাখতেই হবে। শুধু কবিতা রাখলে হবে না। ওটা বেশি লোকে পড়বে না। চোদ্দো পাতার কবিতা তিরিশ পাতা হলে হবে না। আর্ট সিনেমাতেও স্টার লাগবে। আর গল্প – বেটার সিনেমা তো এখন গল্প না – ন্যারেটিভ গল্প নিয়ে তৈরি হলে গেল গেল রব উঠবে, নাকি সিনেমা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ‘মাস’ দর্শকেরও তো একটা লজিক আছে। তাঁদের কাছে এই আর্ট সিনেমা মিনিংলেস। অঞ্জন দত্ত নাকি ‘গণেশ টকিজ’ পুরো কমার্শিয়াল বানিয়েছিলেন। মজা হল, যে সীমিত দর্শক এই ছবি দেখেন, তাঁরাও এটা দেখলেন না। কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমাতে যে লোকটা ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন, তাঁকে মিডিয়া জবাই করে দিল। মিডিয়াই তোলে, মিডিয়াই রাখে আবার মিডিয়াই ফেলে দেয়। তারা অঞ্জন চৌধুরীকে বাতিল করে দিল। তাই আজ আর কথা হয় না। ও দিকে আর্ট সিনেমায় একটা লবি চলে। গত তিরিশ বছরে ১০-১২ জন লোক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের বিচারক হয়েছে, তাঁরাই ঠিক করেন নিজেদের মধ্যে কাকে কী দেবেন, পরস্পর পরস্পরকে দেখবেন। সাধারণ দর্শকের এর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।

আরও পড়ুন: ‘সতী’ ছবিতে ৪১ দিন ডেট নিয়ে ৫ হাজার দেবে বলেছিল, করিনি: চিরঞ্জিত

  • বাঙলা বণিজ্যিক ছবির মান কী ভাবে ভালো হবে বা হবে কি?

চির: হবে। ইন্টেলিজেন্ট ছেলেমেয়েগুলোকে এখানে আসতে দাও। কাজ করতে দাও। তবেই হবে। কিন্তু এটাকে হ্যাটার চোখে দেখলে, হেয় করে প্রচার করলে কোনো ভালো ছেলেমেয়ে এখানে আসবে না। সবাই আর্ট সিনেমায় যাবে। চলচ্চিত্র শিল্পের ক্ষতি হবে। (শেষ)

 

 

 

 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here