মুক্কাবাজ: ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলতে বলতে দেখে আসুন সাম্প্রতিক বলিউডের শ্রেষ্ঠ নির্মাণটি

0
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

রামন রাঘব ২.০ বানিয়েছিলেন বছর দুয়েক আগে। সে ছিল এক অচেনা অনুরাগ কাশ্যপ। তার আগে ‘আগলি’ দেখে ইন্টেলেকচুয়াল মুগ্ধতা তৈরি হলেও, কিসের যেন একটা অভাব রয়ে গেছিল। আর বোম্বে ভেলভেট জমেনি। অবশেষে ঘরে ফিরলেন গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের পরিচালক। এবং এক ঢিলে কত পাখি যে মারলেন, তার গোনাগুনতি চলবে এখনও অনেকদিন। টাইগার জিন্দা হ্যায় আর পদ্মাবতের মধ্যবর্তী শূন্যতায় তিনি এমন এক বক্সিং রিং নির্মাণ করলেন, যেখানে লড়াই সহজে শেষ হওয়ার নয়।

আর লড়াইয়ের মহাকাব্য রচনা করতে গেলে কি রামকে টেনে না আনলে চলে। তাই ছবির শুরুতেই শোনা গেল ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি। যে ধ্বনি আজকের ভারতে গরু বহনকারি মুসলমানদের গণধোলাই দিতে ব্যবহার করা হয়। ‘মুক্কাবাজ’-এর নায়ক এমন এক রাজপুত, যার জাত নিয়ে নাকি নিঃসংশয় হওয়া যায় না। অন্তত এমনটাই ধারণা ভগবান দাস মিশ্রর। যে ভগবান দাস উত্তরপ্রদেশের বরেলি জেলার সবচেয়ে বড়ো বক্সিং আখড়ার মালিক, প্রাক্তন বক্সার(খেলার জন্য তাঁর একটা চোখ নষ্ট হয়েছে), বক্সিং সংগঠনের সর্বেসর্বা, জনপ্রতিনিধি এবং সবচেয়ে বড়ো কথা ব্রাহ্মণ। যিনি শুধু আদেশ দেন। আর আদেশ শোনেন ধনী ব্যবসায়ী ‘আগরওয়াল’দের। ক্ষত্রিয়র নীচে থাকে বর্ণগুলির নাম অবধি মুখে নেন না। তাঁর বিস্তীর্ণ প্রভাবের এলাকার মধ্যে রয়েছে নিজের থেকে ১২ বছরের বড়ো দাদা এবং তাঁর পরিবারও। সেই দাদার একমাত্র বোবা মেয়ে সুনয়নীর প্রেমে পড়ে আমাদের মুক্কাবাজ নায়ক শ্রবণ সিং। যে নামী বক্সার হতে চায় এবং মহম্মদ আলি, মাইক টাইসন, ব্রুস লির ভক্ত। ভগবান দাসের সঙ্গে সরাসরি টক্করে জড়িয়ে পড়ে শ্রবণ। তাঁর বক্সার হওয়া এবং সুনয়নীকে বিয়ে করার স্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়েন ভগবান দাসের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করা জিমি শেরগিল। সিনেমা এগোয়। এবং সেই এগোনোর পথে জাতপাত, ক্ষমতা, রাজনীতি, নিষ্ঠুরতার অকৃত্রিম ভারতের সঙ্গে দর্শকদের নির্মোহ ভাবে যুক্ত করে নেন অনুরাগ কাশ্যপ।

সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে অনুরাগ বলেছেন, প্রেমের কাহিনির মুখোশ ছাড়া বলিউডে কোনো জরুরি গল্প বলা যায় না। সেই মুখোশটি এই ছবিতে চমৎকার কাজে লাগিয়েছেন পরিচালক। সেই মুখোশের ছলাকলা দেখতে দেখতে দর্শক যখন মজে গেছেন, তখন কম বুদ্ধির নিচু জাতের শ্রবণ সিং, ‘ভারত মাতা কি জয়’ শ্লোগান বলতে বলতে একের পর এক ঘুষি মেরে নষ্ট করে দিয়েছেন ভগবান দাসের আরেকটা চোখ। দর্শক টের পেয়েছেন নিজের তৈরি করা কাহিনির মুখোশ পরিচালক নিজেই ছিঁড়লেন। আর ‘প্রগতি’ এবং ‘উন্নতি’র পথে ভারতের এগিয়ে চলায় অন্তর্ঘাত করলেন।

বিজ্ঞাপন

বলিউডের সাম্প্রতিক স্পোর্টস ফিল্মগুলির নাম ধরে ধরে সেগুলির বিনির্মাণ করেছেন অনুরাগ, বিনির্মাণ করেছেন বলিউডের স্টারডমেরও। যেমনটা তিনি করে থাকেন বরাবর। আর এই কাজে কাজে তাঁক যোগ্য সঙ্গত করেছেন দুই অসামান্য অভিনেতা বিনীত কুমার সিং ও জোয়া হুসেইন। ছবির নায়ক বিনীত, এই ছবির অন্যতম চিত্রনাট্যকার এবং গীতিকার, এমনকি সুরকারও। বোবা মেয়ের ভূমিকায় জোয়া অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। কোচের ছোটো চরিত্রে রবি কিষেণও দারুণ।

ছবির কোনো কোনো অংশ কিছুটা বড়ো(যেমন রেল দফতরের অফিসারের শ্রবণকে হেনস্থা করার জায়গাগুলো), কিন্তু দক্ষ অনুরাগ তাতে বিনোদনের কিছু কমতি রাখেননি। পাশাপাশি শ্রবণের সমস্যা কিছুটা কমাতে রেখেছেন এক সৎ পুলিশ অফিসারের চরিত্র। যে চাকরির বাধ্যতায় ভগবান দাসের কথা শুনে চলে।

এ সবের বাইরে যেটা বলার, তা হল ছবির গান। প্রতিটি গানই অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত এবং রচিতা আরোরার সুরারোপ নজর কাড়তে বাধ্য।

অনুরাগের অন্যান্য ছবিগুলির তুলনায় অনেক কম ডার্ক হয়েও এ ছবি অনেক বেশি আলোর প্রত্যাশী।

ভারত মাতা কি জয়।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here