অমিতাভ না থাকলে পিঙ্কের রিভিউ হত না

0
143

prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

দেখা হয়ে গিয়েছিল রিলিজের দিনই। কিন্তু কী লিখবো, বুঝতে পারছিলাম না। নামজাদা মিডিয়াগুলোয় প্রশংসার ঢল দেখে ঘেঁটে গিয়েছিলাম আরও। লেখাটা মাথায় এনে দিলেন চার রিক্সাচালক। বিশ্বকর্মা পুজোর রাতে প্যান্ডেলের সামনে আকণ্ঠ মদ খেয়ে নাচছিলেন ওঁরা, প্রতি বছর যেমন নাচেন। এ হল সেইসব স্টেপিং, যা নাচের স্কুলে শেখানো হয় না। শিখে নিতে হয় সত্তর-আশির দশকের অমিতাভকে দেখে। জঞ্জির, দিওয়ার, শোলে, লাওয়ারিশ, কুলি, হম, অগ্নিপথ পেরিয়ে তিনি ৭৩ বছরে পৌঁছে যান কিন্তু তাঁর পদক্ষেপগুলো ‘বেটি বাচাও বেটি পড়াও’-এর ভারতে আন্দোলিত হতে থাকে অবিরত। মনে রাখা দরকার, আসমুদ্রহিমাচলের নিহিত পাতাল ছায়া কিন্তু অমিতাভের অবয়ব ফিকে করে মিঠুন, শাহরুখ উদ্‌যাপন সেরে আপাতত সলমনে থিতু। বলতে চাইছি, যে জনগোষ্ঠীর সত্তর দশকের অমিতাভকে ভারি প্রয়োজন ছিল, তারা এখন মজে আছেন হরিণ শিকারির জেল্লায়।

তাদের কাছে কি পৌঁছবে পিঙ্কের বার্তা ? মনে তো হয় না। অত্যাধুনিক বিপণন কৌশলে ছবি রিলিজের দিন অমিতাভ নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথা বলে অনলাইনে শিরোনাম নিয়ে নেন। কিন্তু সেটা যাদের প্রভাবিত করতে, তারা এই কথাগুলো সব শুনে নিয়েছেন। মানে, শামলা গায়ে কোর্টে দাঁড়িয়ে মিস্টার বচ্চন মেয়েদের জন্য যা যা বলেছেন, সেই সব কথাই গত দেড় দশকে বহুবার এসে গিয়েছে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়। প্রবন্ধ, টক শোয়ে অধ্যাপক-অ্যাক্টিভিস্টরা যা অনায়াসে বলে বলে গলায় রক্ত তুলে ফেলছেন, সেইসব কথা বচ্চন দ্য ব্যারিটোন বললে সমাজের কী হবে জানি না তবে দৃঢ় বিশ্বাস ছবি হিট হবে না। কারণ এ ছবির কোনও বিনোদন মূল্য নেই। কোর্টরুম ড্রামা বলে ফিল্ম দুনিয়ায় একটা কথা আছে ঠিকই, তবে এ ছবিতে কোনও ড্রামা নেই। শুধুই কোর্টরুমে অমিতাভের জমকালো জ্ঞানের কথা। ও হ্যাঁ, ব্যারিটোনের কথা বললাম বটে, কিন্তু অমিতাভের গত কয়েকটা ছবিতে ওনার অর্ধেক ডায়লগ আমি বুঝতে পারিনি সিঙ্ক সাউন্ডের দৌলতে। এখানে অবশ্য ওঁর বাইপোলার ডিসঅর্ডার, বিচারক ধৃতিমান চ্যাটার্জির নির্দেশে কখনও কখনও গলা তুলেছেন, আমার চাপ কমেছে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা, ইফতিকারের মত বিচারক বলিউড যে আবার কবে পাবে। বিচারকের আসনে বসে ধৃতিমান যে পরিমাণ রিঅ্যাকশন দিয়েছেন, ভাবা যায় না।

নেহাৎ সুজিত সরকার, অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী দক্ষ লোক তাই বার্তা দিতে দিতে তাপসী পান্নুদের কেসটা জেতাতেও পেরেছেন। একা অনিরুদ্ধ হলে কী হত, কে জানে। ওর যে কটা বাংলা ছবি দেখেছি, সব সময়ই মনে হয়েছে উনি ছবি শেষ করতে পারেন না।

ছবির মূল কথা, মেয়েরা না বললে কাছে ঘেঁষা যাবে না। মেয়েরাও মানুষ, তারাও মদ খেতে পারে মনের আনন্দে বা বেদনায়। পার্টিতে যেতে পারে ছেলেপিলেদের সাথে এবং আরও নানা বিধিবদ্ধ জরুরি কথা। নেহাৎ কথাগুলো অমিতাভ বলেছেন বলে এ ছবির আদৌ রিভিউ লেখা হচ্ছে। আচ্ছা বলুন তো, এসব জরুরি কথা না জেনেই আপনারা এতদিন ধরে শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্স করে চলেছেন!!!

না শুধু অমিতাভেই সুজিতবাবুরা কনফিডেন্স পাননি। মূল অভিযুক্তের বাবাকে রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতাবান দেখিয়েছেন, ছেলেটিকে প্রায় লম্পট দেখিয়েছেন। লম্পট নয়, এমন কোনও ছেলে হোটেলের ঘরে নেশা করে কোনও নেশাগ্রস্ত মহিলার সঙ্গে উপগত হতে গিয়ে মেয়েটির দ্বারা আহত হলে কেমন স্ক্রিপ্ট হত, সেটা জানার চাপ নেননি ক্রিয়েটিভ প্রোডিউসার বা পরিচালক। মাথার ওপর বিগ বি আছেন যে।

অমিতাভের অভিনয় করার তেমন কিছু ছিল না। অসুস্থ বউ-এর সেবা করার অভ্যেস ওনার আগের ছবি তিন-এই হয়েছিল, এবার সেটাই মমতাশঙ্করের সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছেন। বৃদ্ধের বিষণ্ণতার ব্যাপারটাও তাই। কেন অমিতাভ মর্নিংওয়াকে বা ব্যালকনি থেকে এমনিতেই তাপসী পান্নু, কৃতী কুলহারি, আন্দ্রে তারিয়াং-দের দিকে তাকিয়ে থাকতেন আমি বুঝিনি। তিন অভিনেত্রী যেটুকু করেছেন, ওটুকু না করলে আর সিনেমা করতে আসা কেন। রাজবীরের বন্ধুর ছোট্ট চরিত্রে নজর কেড়েছেন বিজয় ভার্মা। তবে সেরা অভিনয়টা যিনি করেছেন, তার জন্য কোনও হাততালি বরাদ্দ নেই। পরাজিত আইনজীবী পীয়ূষ মিশ্র। হ্যাটস অফ।

সব মিলিয়ে পিঙ্ক একটি অতি সাধারণ মানের সিনেমা। যদি বিপণন কৌশলে পয়সা উঠে খানিক বেশি হয়ে যায়, তাহলে নিশ্চয় অমিতাভের আরও আরও না বলা কথা নিয়ে গবেষণা করে চিত্রনাট্য বানাবেন লোকজন। কে বলতে পারে, ওই করতে করতে একদিন রেখা ফের গেয়ে উঠবেন, ইয়ে কাঁহা আ গ্যায়ে হাম। আর শহরতলির সিঙ্গল স্ক্রিনে ছিপি উড়বে, সিটি পড়বে রং বরষের স্মৃতিতে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here