আরেক গুজরাতের গল্প বলতে খান আর সিদ্দিকি মুখোমুখি…

0
210

debarati_guptaদেবারতি গুপ্ত

একে গুজরাত, তায় মুসলিম মাফিয়া ডন হিরো; তায় আবার কিসের ধান্দা করে না দেশি মদের! যেখানে এখনও দেশীয় মদের কারবারে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে, যে রাজ্যের হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার ঘা এখনো শুকোয়নি আমাদের প্রজন্মের মাথা থেকে আর অবশ্যই যে রাজ্যের প্রাক্তন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জন গণ মনের অধিনায়ক হয়ে বসেছেন — সেই রাজ্যের রবিনহুডের গল্প কি না রইস! শোনা যায় আশির দশকের কুখ্যাত ডন, মদের ব্যবসায়ী আবদুল লতিফের জীবনের ছায়া নিয়ে রইসের কাহিনি বুনেছেন পরিচালক রাহুল ঢোলাকিয়া। যে আবদুল লতিফের এন্তার যোগাযোগ ছিল দাউদের সঙ্গে। ৯৩-এর মুম্বই ব্লাস্টের আর ডি এক্স চালানকারী হিসেবে যার জেল ও এনকাউন্টারে মৃত্যু হয়। সেই মন্দলোকের ভূমিকায় সবাকার ভাল মন্দের দায়িত্ব নিয়ে এলেন কি না শাহরুখ!

চোখে সুরমা। সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো মোটা কাচের চশমা। মহরমে খালি গায়ে পিঠ চাপড়ানো সিক্স প্যাক নিয়ে। ধান্দার চেয়ে বড়ো কোন ধর্ম নেই এই মন্ত্রের ভারে কঠোর হয়ে যাওয়া চাউনি আর শুধু নায়িকা মাহিরা খানকে দেখে হালকা প্রেম মাখানো হাসি… একেবারে শাহরুখ রইস খান। তবে রইস শুধুই খানের নয়… আছেন এক সিদ্দিকিও। আছেন তিনি রইসকে রইসতর বানাতে। চড়া দাগের ওয়ান লাইনারগুলোকে অনায়াসে বলে দিয়ে নিজের পুলিশি কর্তব্যে স্থির থাকতে। সুরমা, সোনালি ফ্রেম বা সিক্স প্যাক ছাড়াই হিরোর এনকাউন্টার করতে একজন অভিনেতা হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ করতেই হয় রইসের ছায়াসঙ্গী হিসেবে মহম্মদ জিশান আয়ুবের অভিনয়। এছাড়া অতুল কুলকার্নি বা শিবা চাড্ডার মতো অভিনেতারা তো সেই কবে থেকেই ছোটো উপস্থিতিতে মনি মুক্তো ছড়াচ্ছেন, তাই এদের নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই।

পরিচালক ঢোলাকিয়া এর আগে পারজানিয়া বানিয়েছেন। কাজেই নিজের পরিচালনায় রাজনৈতিক সংবেদী ছাপ রাখবেন সেই আশা ছিলই। রইসের প্রথম দিকের একটি ঘটনায় সত্যিই এক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত রূপকের হদিশ পাওয়া যায়। ছোট রইস স্কুলে ব্ল্যাকবোর্ডের কোনো লেখা পড়তে পারছে না আর ম্যাডামের কাছে মার খাচ্ছে। ডাক্তার বলেছে চোখে মাইনাস পাওয়ার এসেছে তাই চশমা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু মায়ের কাছে তখন পয়সা নেই চশমা বানিয়ে দেবার। তাই রাতের অন্ধকারে সঙ্গী সাদিককে নিয়ে সে জাতির জনকের মূর্তির সামনে হাজির হয়। মহাত্মার স্ট্যাচুর চোখ থেকে চশমার ফ্রেম চুরি করতে। যেটা পেলে শুধু কাঁচ বসিয়ে নেবার অপেক্ষা। রইসের সমস্যার সমাধান বাপুর চোখে। এমন এক সেন্স অফ হিউমারে ভাসিয়ে দেবার পর কেন যে ঢোলাকিয়া অতগুলো গানের টালবাহানা করতে গেলেন! সেই বোধ করি মূলধারার দাবি! আর এইভাবে যে ছেলে তার জীবনের প্রথম চশমা জোগাড়ের লড়াইতে নামে তাকে কেউ ব্যাটারি বলে আওয়াজ দিলেই সে ওমনি কুছ কুছ হোতা হ্যায়ের শাহরুখের মতোন ছেলেমানুষ হয়ে যায় কেন? এমন এক রইসকে বারবার বলে দিতে হয় যে ‘ব্যাটারি নহি বোলনে কা?!’ আরে তুমি ছাগল বেচতে এসেই যা অ্যাকশন দেখিয়েছ তাতেই তোমায় আর কেউ কিচ্ছুটি বলার সাহস পাবে না! সে যাক গে… হিন্দি মেইনস্ট্রিম… অমন একটু আধটু হয়! আমি বলার কে? যতই হোক মোটের ওপর বেশ উপভোগ্য সিনেমা। এন্টারটেইনমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে ছোটো খাটো রাজনৈতিক চুটকি।

শোনা যায় স্ক্রিপ্টের প্রথম দশ মিনিট শুনেই নাকি শাহরুখ স্থির করে ফেলেন যে ছবিটা উনি করছেন। এসব শুনলে মনে একটু বাতাস লাগে। কল্পনায় উচাটন হয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে বেশতো বুড়ো আঙুল দেখানো গেল হিন্দু জাতীয়তাবাদকে। গুজরাতের মাটিতে তীব্র পলিটিকালি ইনকারেক্ট এক বীরগাথা — বিজেপিকে কলা দেখানো ছাড়া আর কি! ঠিক ভুলের বিচার করবেন জন গণ মন; সেই ফাঁকে একটু অধিনায়ককে অস্বস্তিতে ফেলে দেখা যাক। আবদুল লতিফদের মতো দেশদ্রোহীদের রবিনহুড করে দেখানো উচিত কি না, এনকাউন্টার করে দেশের শত্রু নিধন করা ঠিক না ভুল; সে কনফিউশন থাক নওয়াজ অভিনীত আই পি এস মজমুদারের মনে! আমরা বরং শাহরুখ খানের মোড়কে আরেকটা গুজরাতের গল্প শুনে আসি।

লেখক চিত্র পরিচালক

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here