মাটি মাখা মানুষের আন্দোলন – নূরলদীনের সারাজীবন

1
285

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়
কিছুদিন আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হঠাৎ জানা গেল সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের হাসপাতালে শুয়ে পাঞ্জা কষছেন মারণ ব্যাধির সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গ বাসীদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের নাটক ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত, তাদের কাছে এটা হঠাৎ মন খারাপ করে দেওয়ার মতোই খবর। তবে সৈয়দ হক শুধু বাংলাদেশেরই নন, সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষি মানুষের অন্যতম প্রিয় কথাশিল্পী ও নাট্যকার।
বেশ কিছুদিন ধরেই সৈয়দ হকের অন্যতম বিখ্যাত নাটক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নিয়ে প্রস্তুতিতে মগ্ন ছিলেন কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের পরিচালক কিশোর সেনগুপ্ত ও দলের সহশিল্পীরা। সম্প্রতি যার কয়েকটি অভিনয় হয়ে গেল কলকাতায়। বলাবাহুল্য নাট্যদর্শকরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন এই অভিনয়ের। এই প্রসঙ্গে বলতেই হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নাট্যদলগুলির কাজকম্মে সারা বিশ্বের বিশিষ্ট নাটককাররা যতখানি বন্দিত, প্রতিবেশী নাটককাররা প্রায় ততটাই বিস্মৃত। প্রতিবেশী এবং বাংলাভাষী বলেই হয়তো। নূরলদীন প্রযোজনার জন্য তাই আগাম ধন্যবাদ প্রাপ্য ছিল কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের।
কাব্য, নাটক, ইতিহাস, জীবনী ও কল্পনার মেলবন্ধনে রচিত হয়েছে নাটক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। কুশীলবদের কঠিন পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও নাট্যভাষার উচ্চমানের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে যা মঞ্চে নাট্যের শরীর ধারণ করেছে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এই বাংলায় যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল তখন কোম্পানি নিজেদের অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিকেই আয়ের প্রধান পথ মনে করে। সেই পথের অনিবার্য পরিণতি রূপে দেখা দেয় প্রজাশোষণ, জুলুম, অত্যাচার। এই কাজে বিদেশিদের সঙ্গতকারীর ভূমিকায় যুক্ত হয় চুক্তিভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের স্বত্বপ্রাপ্ত দেশীয় জমিদার ও রাজন্যবর্গ। শোষণ ও অত্যাচারের দাপটে, শাসনের গুঁতোয় দরিদ্র কৃষক ও সাধারণ গরিব মানুষ রাতারাতি, জমি-মাটি, ঘর-গেরস্থালি খুইয়ে নিঃস্ব ভিখারিতে পরিণত হন। প্রতিক্রিয়ায় বাংলার স্থানে স্থানে গরিবের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গণবিদ্রোহে। যেমন বাংলার রংপুর অঞ্চলে। সেখানকার প্রান্তিক, অসহায় মানুষের দল জোট বাঁধেন নূরলদীন নামে এক কৃষককে ঘিরে। তাকে তাদের নেতার মান্যতা দিয়ে। সাধারণ কৃষিজীবী থেকে নূরলদীন হয়ে ওঠেন এক সমান্তরাল প্রশাসনের প্রধান যদিও খুব ক্ষণস্থায়ী হয় সেই বিকল্প ব্যবস্থা এবং নেতা পরিণত হন শহিদে।

nuraldin-1
সাধারণ মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, বিদ্রোহের বর্ণনা বাংলা নাটকে কম নেই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নূরলদীনের মতো সংগ্রামের সঙ্গে সমান্তরালে ব্যক্তিমানস এবং কাব্যময় নাট্যভাষায় প্রতিবাদের আখ্যানের দৃষ্টান্ত বেশি নেই। এর সঙ্গে মিশেষে বাংলার জল-হাওয়া-মাটির গন্ধ মাখা কথ্য ভাষা। যা নাট্যের বড় সম্পদ। এই কাব্যময়তাকে ক্ষতবিক্ষত না করে বিদ্রোহের বলিষ্ঠ বয়ান দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল নির্দেশকের কঠিন দায়িত্ব। নির্দেশক কিশোর সেনগুপ্ত সেই দায়িত্ব একজন পরিণত পরিচালকের সাবলীল দক্ষতায় পালন করেছেন। এই কাজে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রচুর প্রাণশক্তি এবং বিপুল সম্ভাবনাময় এক তরুণ নাট্যফৌজ। তাদের শরীরি অভিনয়ের ভাষা, অফূরন্ত জীবনীশক্তি এই নাট্যের জ্বালানি হয়ে উঠেছে। অভিনয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন নূরলদীন রূপী দীপঙ্কর দাস। অনেকদিন ধরেই তিনি কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের বিভিন্ন নাটকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছেন বিশেষ করে তাদের বিগত প্রযোজনা ‘শান্তমতি কথা’-য়। মঞ্চে দীপঙ্করের শরীরি অভিনয়ের দাপট তাঁকে বাংলা নাটকে গৌতম হালদারের উত্তরসুরী করে তুলছে ক্রমাগত। দুটি স্বল্প পরিসরের চরিত্রে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যথাক্রমে অনুপম চক্রবর্তী (গুডল্যান্ড) ও সুপর্ণা মৈত্র দাস(লিসবেথ)। কিন্তু কাব্যপ্রধান সংলাপ দলগত ভাবে আরও আত্মস্থ হলে তা দর্শকের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে বলে মনে হয়।
নাট্যের নেপথ্য সৃজনে অনেক বিখ্যাত ও গুণী মানুষ যুক্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যেমন মঞ্চ ভাবনায় হিরণ মিত্র এখানে শুধুই একটা নাম। শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান আলোকশিল্পী দীপক মুখোপাধ্যায়ের কাজ যেন কিছুটা সময়ের ভারে ক্লান্ত। সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও চেনা ছকের বাইরে যাওয়ার অবকাশ ছিল। বাংলা কাদা-মাটি-জলের সুর ও শব্দ আরও বৈচিত্রময় ভাবে তুলে আনতে পারতেন ময়ূখ-মৈনাকরা। দেশজ লোকনাট্যের সাদামাটা আদলে গড়ে ওঠা নাট্য উপস্থাপনাটি হয়তো শহুরে প্রসেনিয়াম মঞ্চে আরও আলো-বাতাস দাবি করে। তবে অঙ্গ সঞ্চালনা ও শরীরি অভিনয়ে উপদেষ্টা সুমিত রায় এ নাট্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন। অভিনয়কে কুচকাওয়াজে পরিণত করেননি।

nuraldin-cover
পরিশেষে দু-একটি কথা বলতেই হচ্ছে, যেমন নাটক চলতে চলতে অথবা বিরতি হওয়া মাত্রই হোয়াটস অ্যাপ, টুইটার ও সোশাল নেটওয়ার্কে আক্রান্ত হয়ে পড়া দর্শকে মায়াবী কাব্যময়তার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গান শুনিয়ে আকর্ষণ করা বড় কঠিন। এই কঠিন প্রচেষ্টা করেছেন কিশোর ও তাঁর দলের সকলে। ইতিহাসের কালখণ্ডের মধ্য দিয়ে আঁকতে চেয়েছেন বঞ্চনার চিরকালীন ও সমকালীন আখ্যান। নাটককারের হাত ধরে গড়ে তুলেছেন বেদনার মহাকাব্য। ভয় হয়, শহুরে আমোদপ্রিয় মধ্য ও উচ্চবিত্ত দর্শকের কাছে নাটকটি অভিনয়-আঙ্গিক উপভোগের বিলাসিতা হয়ে যাবে না তো ? উত্তর দেবে সময় তবে একথা এখনই বলা যায় যে, বাংলার সুপরিচিত নাট্যদল ‘কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্র’, কিশোর সেনগুপ্তর নেতৃত্বে যেভাবে নিজেদের শিল্পক্ষমতা বাড়াচ্ছেন তাতে অচিরেই তারা সারা ভারতে সুনাম অর্জন করলে বিস্মিত হবেন না বাংলার নাট্যসমাজ। ভারতীয় নাটকে মাইলফলক স্থাপনকারী ঘাসীরাম বা চরণদাস-এর মানের নাট্য প্রযোজনা আগামী দিনে কলকাতার কাছেই কল্যাণী শহরে প্রযোজিত হতে পারে, এমন স্বপ্ন দেখাই যায়। সবশেষে সমস্ত দর্শকের হয়ে কামনা করি সৈয়দ শামসুল হকের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন। বাংলার মাটিতে বহুদিন শোনা যাক তাঁর শ্বাসের আওয়াজ, জায়মান থাক কলম।

(লেখক নাট্যব্যক্তিত্ব)

ছবি: কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের সৌজন্যে  

(যাঁরা khaboronline.com-এর নাট্য সমালোচনা বিভাগে তাঁদের নাটকের সমালোচনা প্রকাশে আগ্রহী, তাঁরা আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে পারেন editor@khaboronline.com অথবা khabor.online@gmail.com-এ মেল করে। তবে, নাটক নির্বাচন বা সমালোচনা প্রকাশ সম্পাদকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে)

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

  1. আপনার এই উপস্থাপনার মাধ্যমে, আমার মতো আরও অনেক স্বল্পজ্ঞাত মানুষজন এই মহতী প্রচেষ্টার কথা জানতে পারলো । এ জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাই ।
    কল্যানী’র নাট্যগোষ্ঠী যথেষ্ঠ সুপরিচিত ততাঁদের বিভিন্ন নাট্যপ্যজোজনার মাধ্যমে । বাংলাদেশের নাট্যপরিচালক খুবই অসুস্থ , বলে খবর পেলাম । তাঁর যথা সম্ভব ধ্রুত আরগ্য কামনা করি । মানুষের সহমর্মিতা সর্বদা শুভানুধ্যায়ীরূপে আপনাদের সাথে থাকবে – এই বিনীত নিবেদনটুকু রেখে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি । নমস্কার । সব্যসাচী মজুমদার

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here