এগিয়ে যায় ‘প্রিয় পাঠশালা’, থেকে যায় স্বপ্নের রেশ

1
334

madhumantiমধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

রাতের দিকে সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ঘাঁটতে গিয়ে নজরে এলো খবরটা। চোখে পড়ত না, ছবিটা দেখে আটকে গেলাম। সেই বকুল গাছ, পদ্মপুকুর, বিশাল মাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে লাল সাদা তিনতলা বাড়িটা। আমার ইস্কুল বাড়ি। খবরটা ছবির মতো আরামদায়ক নয়। স্কুলের প্রাথমিক বিভাগে সাড়ে তিনশো কচিকাঁচা সামলাতে রয়েছে মাত্র ২জন শিক্ষিকা। কোনো ক্লাসের সপ্তাহে তিন দিন ছুটি, কারওর বা পাঁচ দিন। সেদিন রাতে ঘুম আসেনি অনেকক্ষণ। আর ঘুমের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম কোনও এক অভয় মাস্টারকে।

আশ্চর্য! পরের সন্ধেতেই মাস্টারের সঙ্গে দেখা হল। সামনাসামনি নয়, মঞ্চে। নাটকের নাম ‘প্রিয় পাঠশালা’। প্রযোজনায় ‘ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং থিয়েটার গ্রুপ’। হেডমাস্টার অভয় বাবু একটু একটু করে সত্যি করেছিলেন তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন। স্বপ্নের নাম পানিমালা প্রাইমারি স্কুল। মাস দুয়েক আগে সাইক্লোন এসে কেড়ে নিয়ে যায় সবটুকু। থাকে শুধু স্কুল বাড়িটা। স্বপ্নের সাথেই ভেসে গিয়েছে মইদুল, মিনতি, কাজলরা। কাকে পড়াবেন তিনি? বকুনির ছলে প্রশ্রয়ই বা দেবেন কাকে? স্কুল, ছাত্রছাত্রী, স্লেট-পেনসিল নিয়েই তো তাঁর বেঁচে থাকা। অতএব আগের মতোই সপ্তাহে ছ’দিন বসতে থাকে স্কুল। মাস্টারের কল্পনায় বেঁচে উঠতে থাকে পানিমালা প্রাথমিকের পড়ুয়ারা।

priyo-pathshala-1

নতুন চাকরি পেয়ে ওই স্কুলেই বহাল হন তমাল মাস্টার। শহুরে আয়েসে অভ্যস্ত তমাল শুরুতেই ধাক্কা খায়। সারা গ্রামে কোনও পাকা বাড়ি নেই, বিদ্যুৎ নেই,  স্কুল শেষে সময় কাটানোর মতো বিনোদনের কোনও রাস্তা নেই। আর স্কুল? হেডমাস্টারের ‘পাগলামি’তে কতোগুলো ছায়ার সঙ্গে ক্লাস করতে হয় তাঁকে। পড়াতে হয় কবিতা, শেখাতে হয় অঙ্ক। পরে অবশ্য তমালের ভাবনায় আসে পরিবর্তন। পানিমালার স্কুলবাড়ি, গ্রাম্যজীবনের সহজ ছন্দ, হেডমাস্টারের স্বপ্ন আঁকড়ে পড়ে থাকা, এসবের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে তমাল। বাস্তবে যদিও তমালরা রাতারাতি বদলে যায় না। বাকি দু’জন শিক্ষকের মতো দিনের দিনই বিকেলের ট্রেনে শহরে ফিরে না গিয়ে কেন থেকে গেল তমাল মাস্টার? সে গল্প না বলাই থেকে গেল।

বিশ্বজিৎ ঘোষ মজুমদারকে বেশ মানিয়েছে তমালের চরিত্রে। শহুরে জীবন ছেড়ে  অদ্ভুতুড়ে গ্রামে এসে পড়া তমালের অস্বস্তি, বিশ্বজিৎ ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই। শেষে যখন তমালও স্বপ্ন দেখছে, ছাত্রদের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে কবিতায়, সেই অভিব্যক্তিতেও তিনি যথেষ্ট সাবলীল। হেডমাস্টারের মেয়ে তাপসীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং নির্দেশক রিমি মজুমদার। তাঁর নির্দেশনা বেশ পরিণত। তবে গ্রাম্য মেয়ের চরিত্রে অতটা দাপুটে না হলেও পারতেন। অল্প সময়ের জন্য মঞ্চে এলেও স্বাতী মুখার্জি চমৎকার। এবার আসি হেডমাস্টারের কথায়। বাবু দত্ত রায় এক কথায় অনবদ্য। চরিত্রটি যেন তাঁর জন্যেই তৈরি। ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের নাটকে স্বপ্ন ছড়াতেই মঞ্চে আসা তাঁর। অভয় মাস্টারের একাকিত্ব, অসহায়তায় ভিজে যায় দর্শক মন।

priyo-pathshala-2

নাটকের শেষ দিকে বেশ কিছু পড়ুয়া আবার ফিরে আসতে থাকে স্কুলে। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে আনার পেছনে অভয় মাস্টারের নিরলস প্রচেষ্টা ফুটিয়ে তোলার একমাত্র রাস্তা কি কয়েকটা সংলাপ? যদি তাই-ই হয়, সেক্ষেত্রে সংলাপকে হতে হবে আরও দৃঢ়, আরও শক্তিশালী। আর দেশের লক্ষ লক্ষ প্রাথমিক স্কুলের অবস্থা পানিমালার থেকে খুব কিছু আলাদা না। শুধু প্রাকৃতিক নয়, সামাজিক দুর্যোগও এর পেছনে বড়ো একটা কারণ। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করলে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারত ‘প্রিয় পাঠশালা’।

 যেটুকু না থাকলে নয়, সেটুকু দিয়েই সেজেছে মঞ্চ। বন্যায় ভেসে যাওয়া খুদে পড়ুয়ার দল যতবার বেঁচে উঠেছে কল্পনায়, আলো-ছায়ার পরিমিত ব্যবহারে তৈরি হয়েছে স্বপ্নের ক্লাসঘর। সাইক্লোনের কোরিওগ্রাফিও বেশ ভাল। দু’একটা দৃশ্য বেখাপ্পা হলেও নাটকের সার্বিক চলন বেশ সহজ সরল।

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের নাটক ‘প্রিয় পাঠশালা’র বিষয় বস্তু এমনই, টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি দিয়ে শেষ করতে ইচ্ছে হয় না মোটেই। শেষে ওই স্বপ্নের রেশটুকুই থেকে যায়। অভয় মাস্টারের স্বপ্ন তমালের হাত ধরে পৌঁছে যায় দর্শকের কাছে। পানিমালা প্রাথমিকে অভয় মাস্টাররা এভাবেই বেঁচে থাকুক। আমার ছোটবেলার লাল সাদা বাড়িটাতেও পৌঁছে যাক কোনও এক তমাল মাস্টার।

ছবি: ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং থিয়েটার গ্রুপের সৌজন্যে

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

  1. প্রিয় পাঠশালা নাটক টি সম্পর্কে মধুমন্তী দেবির লেখা টি মনোযোগ দিয়ে পড়ে, বিস্মিত হলাম। উনি নাটক টির পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সব গল্পের বা স্বপ্নের কি পরিণতি একান্তই জরুরী, আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তাতে কি সব সময় লজিক বা যুক্তি থাকতেই হয়.? তমাল মাস্টার কেন থেকে গেল, সেটা কি বলতেই হবে, আমরা কি ধরে নিতে পারিনা যে, অভয় মাস্টারের মেয়ে আর তমাল মাস্টারের মধ্যে যে একটা সম্পর্কের ইশারা দেখানো হয়েছে, সেই সম্পর্কের পরিণতির আশায়, অথবা, অভয় মাস্টারের স্বপ্ন কে বাস্তবায়িত করতেই তমাল মাস্টারের এই প্রয়াস। আমি সামান্য এক নাট্যকর্মী হিসেবে এই নাটক ও ফ্র‍্যাংকলি স্পীকিং এর আরও আরও শ্রী বৃদ্ধি কামনা করি।
    নমস্কারান্তে
    কৌস্তুভ সেন গুপ্ত

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here