সংখ্যাগুরুর হিংসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাইলকের ‘সওদা’

1

মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

নাটকটির রচনাকাল পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগ। চারশো বছর পার করেও মার্চেন্ট অব ভেনিস একই রকম প্রাসঙ্গিক, আরও একবার প্রমাণ করল বেহালা ব্রাত্যজনের প্রযোজনা ‘সওদা’। শেক্সপিয়রের শাইলক চরিত্রটিকে শুধু খলনায়ক হিসেবে না দেখিয়ে অন্যরকম ভাবনার শুরু হয়েছিল ২০০ বছর আগে। সে সময় অভিনেতা এডমন্ড কিন অভিনয় করতেন শাইলকের চরিত্রে। এডমন্ডের যোগ্য উত্তরসূরিকেই পেয়েছে ‘সওদা’। দেবশঙ্কর হালদার। শাইলক এখানে সালেখ আলি মহম্মদ। অ্যান্তনিয় -অনন্ত, পরশিয়া- মিস প্রিয়া। অ্যান্তনিয়র ঘনিষ্ঠ ব্যাসানিয় এখানে বসন্ত।


রোমান্স, সাসপেন্স, প্রেম, বিদ্বেষ থেকে শুরু করে চিট ফান্ড, রিয়ালিটি শো! কী নেই? আর সব কিছু রাখতে গিয়ে খেই হারিয়েছে কোথাও কোথাও।


সংখ্যালঘুরা সব সমাজেই যুগে যুগে ব্রাত্য থেকেছে। আর সংখ্যাগুরুর হিংসা, অন্যায় অত্যাচার, নিপীড়ন, চিরকালই পেয়েছে রাষ্ট্রের বৈধতা, প্রচ্ছন্ন অথবা প্রত্যক্ষ সমর্থন। আর্থিক দুর্নীতিতে অনন্ত চৌধুরীরা জড়ায় যেন নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার জন্যই। আর একূল ওকূল দুকূল যায় সালেখদের। শুরুতেই বলেছি, শাইলক চরিত্রটির ওপর ন্যায়বিচার করেছেন দেবশঙ্কর। নাটক দেখতে দেখতে নিজের মনে তৈরি হবে দ্বন্দ্ব, মন থেকে মেনে নেবেন কাকে? অনন্ত নাকি সালেখ আলি? গোটা নাটকে এমন একটাও সংলাপ নেই, যাতে তাঁর প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি নরম হয় অথচ সালেখের জন্য কোথায় একটা সহানুভূতি তৈরি হবেই। আর এই দ্বন্দ্বটা আপনাকে তাড়া করে বেড়াবে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। সেখানেই পরিচালক সুপ্রিয় চক্রবর্তীর ম্যাজিক।

বিজ্ঞাপন

অভিনয় চলাকালীন মঞ্চ থেকে নেমে এসে দর্শকের মাঝে বসে সংলাপ বলার চল নতুন নয়। সওদা নাটকে বেশ স্বতঃস্ফূর্ত লেগেছে সেরকম কিছু দৃশ্য। বসন্তের চরিত্রে কিঞ্জল নন্দ যথাযথ। তাঁর দুই বন্ধু ললিত এবং গৌতমের চরিত্রে বিশ্বজিৎ ঘোষ মজুমদার এবং শান্তনু ঘোষ বেশ ভাল। ললিত-জেসমিনের নাটকীয় প্রেম আর গৌতমের কমিক রিলিফ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। তবে নাটকের চলন অনেকটা সিনেমাটিক। অবশ্য আগেও বেশ ক’বার মঞ্চস্থ হওয়া ‘সওদা’-র ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমির ভর্তি দর্শকাসন দেখে মনে হয় এইরকম উপস্থাপনাই মানুষকে বেশি টানে আজকাল। তবু চলচ্চিত্র আর নাটক তো শিল্পের দুটো আলাদা মাধ্যম, তাদের ভাষাও আলাদাই। সেটা মাথায় রাখলে ভালো হয়।

নাটকের মূল বিষয়-বস্তু একই রয়েছে। শুধু সমাজ এবং সময়, এই দুই-এর উপযোগী করে তোলার জন্যই সামান্য বদল। এক কথায় জমকালো উপস্থাপনা। রোমান্স, সাসপেন্স, প্রেম, বিদ্বেষ থেকে শুরু করে চিট ফান্ড, রিয়ালিটি শো! কী নেই? আর সব কিছু রাখতে গিয়ে খেই হারিয়েছে কোথাও কোথাও। প্রিয়ার স্বয়ম্ভর সভার দৃশ্যে বসন্ত ছাড়া প্রিয়ার বাকি দুই পাণিপ্রার্থী অবিশ্বাস্য রকম হাস্যকর। বসন্তকে জেতাতে হলে বাকি দুই প্রতিযোগীর চরিত্র এতটাই খেলো করার প্রয়োজন ছিল কি?  চাইলে বেশ খানিকটা কমানো যেত নাটকের দৈর্ঘ্য। সংলাপ আর চিত্রনাট্যের বাঁধুনি আর একটু মজবুত হলে অবশ্য ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটের ‘সওদা’য় বুঁদ হয়ে থাকাই যায়।

আরও পড়ুন: ‘কোজাগরী’- অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখে ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here