কুমোরটুলি: আশা-নিরাশার দোলাচলে এক অনন্য শিল্পালয়

0
178

wrivuশ্রয়ণ সেন

“আমার ছেলে এই লাইনে আসবে বলে মনে হয় না। ও এখন কলেজে পড়ছে, এরপর চাকরির খোঁজখবর নেবে” — কিছুটা হতাশ গলায় বললেন রঞ্জিত সরকার, এখানকার মৃৎশিল্পী  সাংস্কৃতিক সমিতির সম্পাদক।

ঘণ্টাখানেক কুমোরটুলির পটুয়াপাড়ার অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে সাক্ষাৎ হল রঞ্জিতবাবুর সঙ্গে। তিনি নিজে প্রতিমাশিল্পী, কিন্তু তাঁর দুর্গা মাটির নয়, শোলার। আগে শোলার দুর্গার বিদেশে খুব বড়ো বাজার ছিল, কিন্তু এখন সেই বাজার দখল করেছে ফাইবারের দুর্গা। তাই মার খাচ্ছে তাঁর শোলার দুর্গার ব্যবসা।

রঞ্জিতবাবু আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন তাঁর ব্যবসার ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো নয়। এর চেয়ে চাকরিবাকরির লাইনেই চলে যাওয়াই ভালো। শুধু রঞ্জিতবাবুই নয়। একই গল্প পটুয়াপাড়ার অধিকাংশ পরিবারে। এখানকার প্রায় আশি শতাংশ পরিবারই আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল। ঋণ নিয়ে কাজ করেন, তবে যে ভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে অনেকেরই ঋণ শোধ করতে কাল ঘাম ছুটে যায়।

এই প্রসঙ্গেই নব প্রজন্মের প্রতি সমর্থনের সুরে রঞ্জিতবাবু যোগ করেন, “আমাদের সময় এত সুযোগসুবিধা ছিল না। এখন ছেলেমেয়েদের কাছে অনেক সুযোগ, অনেক রাস্তা খোলা। তাঁরা চাইছে ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো চাকরি পেতে।”

অবশ্য চিত্রটা একটু ভিন্ন প্রতিমাশিল্পী প্রদীপ পালের স্টুডিওয়। প্রদীপবাবু এখন আর নেই, তাঁর ব্যবসা দেখছেন কন্যা মীনাক্ষীদেবী। পটুয়াপাড়ার গুটিকয়েক আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবারের একজন এই পাল পরিবার। তাঁর তিন তিনটে স্টুডিও। তিনটেতেই জোর কদমে কাজ চলছে। কাজ করে চলেছেন প্রায় দশ পনেরো জন কর্মচারী। না, কর্মচারী নয়, এঁরাও এক একজন শিল্পী। কেউ ব্যস্ত প্রতিমার হাতে রঙ করতে, কারও দায়িত্ব পড়েছে মূর্তির ওপর নতুন ভাবে মাটির প্রলেপ দেওয়ার। একজন এখন কাঠামোয় খড় দিতেই ব্যস্ত। একজনের থেকে জানা গেল, কাঠামোয় খড় দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিমাকে সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলা, এই পুরো কাজটা করতে অন্তত দিন পনেরো সময় লাগে।kumor-2

এঁদের সবার বাড়িই মুর্শিদাবাদে। রথের সময় থেকেই চলে এসেছেন এখানে। পুজোর পালা শেষ হয়ে গেলেই ফিরে যাবেন নিজেদের গ্রামে। মন দেবেন চাষবাসের কাজে। এ তো গেল কর্মচারীদের কথা। কিন্তু পুজোর কাজ যখন থাকে না, তখন পটুয়াপাড়ার পরিবারগুলো কী করে?

দুর্গা, তারপর কালী, আর সব শেষে জগদ্ধাত্রী। এই তিনটে পুজো শেষ হয়ে গেলেই ভাটা পড়ে এখানকার কাজে। কারণ সরস্বতীপুজোর বাজার খুব একটা ভালো নয়। সাধারণ ক্রেতার মধ্যে দুর্গা বা কালীপ্রতিমা কেনার যে উৎসাহ থাকে, সেই উৎসাহ সরস্বতীপ্রতিমা কেনার ক্ষেত্রে থাকেনা। এর বড়ো কারণ খরচা।

রঞ্জিতবাবুর কথায়, গত এক বছরের মধ্যেই ঠাকুর গড়ার খরচা প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে। কাঁচা মালের দাম শুধু নয়, বেড়েছে সুতো আর পেরেকের দামও। বিশাল ভাবে বেড়েছে শ্রমিক খরচও। তার ওপর ক্রেতার অভাব। সরস্বতীঠাকুর তৈরি করা পটুয়াদের পক্ষে আর লাভজনক হচ্ছে না। এই হতাশাজনক পরিস্থিতির সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিকাঠামোর অভাব। প্রদীপ পালদের মতো স্বচ্ছল শিল্পীদের যদিও বা ভালো বড়ো স্টুডিও রয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ শিল্পীর কাজ করতে হয় ছিটেবেড়ার ঘরে। তার ওপর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। কোনোরকম ভাবে প্লাস্টিকে মুড়ে কাজ করতে হচ্ছে মৃৎশিল্পীদের।kumor-3-1

পুনর্বাসনের একটা কথা উঠেছিল না বছর কয়েক আগে?

“ওটা কথাবার্তার স্তরেই ছিল। বাস্তবায়িত হয়নি। আর হবে বলে মনে হয় না। শুধু একটা-দুটো জলের কল বসেছে। কুমোরটুলির উন্নয়ন বলতে এই টুকুই” — তির্যক মন্তব্য রঞ্জিতবাবুর।

তা হলে কি পটুয়াপাড়া জুড়ে শুধুই হতাশা?

না, তিনি আশান্বিত, কুমোরটুলির এখনই ভেঙে পড়ার কোনও কারণ নেই। মহারাষ্ট্রের গণেশপুজোর রমরমা এখন কলকাতায়ও। দু’তিন বছর হল গণেশপ্রতিমার গড়ার হিড়িক লেগেছে এখানে। এর ফলে আর্থিক দিক থেকে বেশ কিছুটা লাভবান হচ্ছেন শিল্পীরা। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বাইরে দেবী দুর্গার অর্ডার বেড়েছে।kumor-1

দেশ-বিদেশের অনেক জায়গা থেকেই অর্ডার আসছে। বিশেষ করে বেঙ্গালুরু। রাজ্যের বাইরে সব থেকে বেশি বাঙালি এখন থাকেন এই শহরেই। সেখানে পুজোর সংখ্যাও দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। চাহিদা বাড়ছে এখানকার মৃৎশিল্পীদের। অনেকেই এখন বেঙ্গালুরুতে গিয়েছেন প্রতিমা গড়ার কাজে। কেউ দিল্লি বা মুম্বইও আছেন। সে দিক থেকেও আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরছে অনেক মৃৎশিল্পীর পরিবারে। এক দিকে হতাশা, অন্যদিকে আশা। দাঁড়িপাল্লায় ঝুলে রয়েছে এখানকার জীবন।  

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here