পুজোয় বেঙ্গালুরু পরবে ধোতি-শাড়ি, কুর্তা ও পালাজো প্যান্ট, লঙ জ্যাকেট আর লেহেঙ্গা স্কার্ট

0
435

flসৃজিতা সরকার, বেঙ্গালুরু

ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি ‘কলকাতার পুজোর মতন পুজো কোথাও হয় না মশাই’। আর এটাকেই বেদ বাক্য মনে করে বেশ চলছিল জীবনের ২৭টা বছর। তারপর হঠাৎ করে কোথেকে ‘আই টি বুম’-এর চক্করে পড়ে কলকাতার ভিটে-মাটি ছেড়ে এসে পড়লুম বেঙ্গালুরুতে। মা-বাবা অবশ্য আদি বাড়ি ছাড়তে নারাজ, বললে “নাহ নাহ! এই বয়সে আর নিজের বাড়ি ছেড়ে নতুন শহরে গিয়ে থাকতে পারব না বাপু।” অগত্যা, আমি একাই ঝোলা নিয়ে চলে এলুম দেশের ‘হাইটেক সিটি’-তে।  

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমিও আস্তে আস্তে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলাম এখানকার ‘মল কালচার’-এর সঙ্গে। কলকাতার বিরিয়ানি, ফুচকা আর পোনা মাছের ঝোলের অভাব বুঝতে না বুঝতেই চলে এল সেপ্টেম্বর। প্রায় পেরিয়েও যেতে বসেছে। মন টা হু হু করছে বাড়ির জন্য। আর দু’ দিন পরেই তো মহালয়া। রেডিওয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ, ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’র সুর। কলকাতায় তো এখন পুজো নিয়ে ব্যস্ততা তুঙ্গে। এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে আইস-টিতে চুমুক মারতে মারতে ফিনিক্স মল-এ ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে এল, “আরে! পুজোর সময় জিন্স পরবি নাকি! বিবার নীল চুড়িদারটা কেন”। চেনা ভাষা শুনে চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা তাঁর মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছেন। লোভ সামলাতে না পেরে, এক গাল হাসি নিয়ে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করেই বসলুম “বাঙালি?” ভদ্রমহিলাও কিছুটা বিস্ময়সূচক ভঙ্গিতে ইতিবাচক জবাব দিতেই একগাদা প্রশ্নের বান ছুড়ে দিলাম তাঁর দিকে। বেঙ্গালুরুতে পুজো কেমন হয়, আমাদের অতি পরিচিত ‘পুজোর সেল’ হয় কিনা, দুর্গাপুজোর প্রস্তূতি, পুজোর কটা দিন কী ভাবে কাটায় প্রবাসী বাঙালিরা ইত্যাদি ইত্যাদি।fashion-1  

পরিচিত মাতৃভাষা ও আমার প্রফুল্লতা দেখেই বোধকরি ভদ্রমহিলা আমার প্রতিটি প্রশ্ন গল্পের ছলে উত্তর দিলেন। হালফিল ফ্যাশন মাথায় রেখেই বাতলে দিলেন নিজের পছন্দের সাজ।

বললেন, “হ্যাঁ শাড়ি তো বটেই! শাড়ি ছাড়া আর যা-ই হোক দুর্গাপুজো জমে না!”

তবে কি বাঙালির অতিপ্রখ্যাত লালপেড়ে সাদা শাড়ি এখন ব্রাত্য?

“নাহ, ওটা বড্ডো ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। কেন রঙের কি অভাব আছে নাকি? আর লালের সঙ্গে হেন রং নেই যে যায় না।”

কনট্রাস্ট?

“আলবাত! এখন কি আর আগের মতন ম্যাচিং করে কেউ শাড়ই-ব্লাউজ পরে!”

অতএব শাড়িতে ব্যবহৃত ন্যূনতম রংটি বেছে নিতে হবে শাড়ির ব্লাউজ হিসেবে। “আজকাল অবশ্য বেশির ভাগ শাড়িই ব্লাউজপিসের সঙ্গে আসে, তবে ব্লাউজপিসের ফিটিংস ও ডিজাইন হতে হবে খাসা।”

তাহলে তাঁতের জমানা চলে গেল?

“তা কি হয় কখনও, তাছাড়া পুজোর চারটে দিন, অষ্টমীর সকালে না হয় তাঁত পরলে।”

আর বাকি দিন গুলো?

“কত কী আছে, ডিজাইনার শাড়ি, বেঙ্গালুরু সিল্ক, মাইসোর সিল্ক, কেরালা কটন। তার সঙ্গে হেভি জাঙ্ক জুয়েলারি কিন্তু বেশ মানাবে, ওই যে সিলভার অক্সিডাইজড মেটাল বলে বোধহয়। আর কপালে একটা বড় গোল টিপ।”  fashion-2

“মম, আই উইল বাই এ ধোতি-শাড়ি কিন্তু”, ভদ্রমহিলার সঙ্গে গল্পে মেতে প্রায় ভুলেই গেছিলাম তাঁর কন্যাটির কথা। “এ বছরে দীপিকা পাডুকোন, সোনম কাপুর রকড ধোতি-শাড়িজ।” “অ্যাঁ! সে তো মহারাষ্ট্রের মহিলারা পরে!”

ভদ্রমহিলার অভিব্যক্তিতে কিছুটা সংশয় বুঝতে পেরে আমিই প্রশ্ন করলাম কন্যাকে, “তুমি কি হাফ-শাড়ির কথা বলছো? যেগুলো মাথা কিংবা পা দিয়ে গলিয়ে নেয়?”

“এগজ্যাক্টলি! অবশ্য অ্যাসিমেট্রিকাল শাড়িও ভীষণ ইন।”

কন্যার মা কিঞ্চিৎ বিস্ময় ও কিঞ্চিৎ নাক কুঁচকে বললেন, “কী সব বাহার বুঝি না বাবাঃ! কেন চুড়িদার-কুর্তা কী দোষ করেছিল?”

কন্যা প্রতিবাদ জানাল – “প্রচন্ড ব্যাকডেটেড। তাছাড়া কুর্তার সাথে আজকাল পালাজো প্যান্ট পরা স্টাইল অথবা লঙ জ্যাকেটের সাথে লেহেঙ্গা স্কার্ট।” হাতে রাখা স্মার্ট ফোনটি থেকে সঙ্গে সঙ্গে বের করে দেখিয়ে দিল পোশাকের কয়েকটি নমুনা। আর সাজসজ্জা? আরেকটু উৎসাহিত হয়ে কন্যা বলল, “রেড লিপস্টিক কিংবা ব্রাউন, তার সঙ্গে প্যাস্টেল শেডের নেলপালিশ।” প্যাস্টেল শেড অর্থাৎ আকাশি রং, কচি কলা পাতার রং, ধূসর রং, বাসন্তী রং ইত্যাদি। আর কেশসজ্জা? “একদিক করে ডাচ ব্রেইড (সাগর চটি) বা টপ নট।”fashion-3

কথোপকথন গড়িয়ে এল শেষের দিকে। মা ও কন্যাকে ফ্যাশন সংক্রান্ত নানা পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে আমিও রওনা দিলাম ওখান থেকে। আলাপ-আড্ডার মধ্যে সময়ের হিসেব প্রায় ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল ফোনে অনেক কটা মিস-কল।

“হ্যালো, হ্যাঁ মা, তোমার কথাই ভাবছিলাম। এখানে একটা খুব ভালো বেঙ্গালুরু সিল্ক-এর দোকান আছে। তোমার জন্য একটা শাড়ি আর বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনে পাঠিয়ে দিচ্ছি, পুজোয় পোরো।” ওপার থেকে নাক টানার আওয়াজ আর হালকা কাঁপা গলায় উত্তর এল, “কবে বাড়ি আসবি, উমা? এক বছর হতে চলল দেখিনি তোকে…।”

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here