মা দুর্গাকে ঘরে আনার কারিগর যাঁরা সারা বছর তাঁরাই ভোগেন দুশ্চিন্তায়

0
191

smitaস্মিতা দাস 

তাঁদের হাতে তৈরি প্রতিমাই কত ধুমধাম করে পুজো পাচ্ছেন প্রবাসের মাটিতেও। কিন্তু তাঁদের জীবনের অভাব অন্ধকার এখনও কাটেনি। চারদিকে আলোর রোশনাই,  তাঁদেরই সৃষ্টিকে ঘিরে হবে কত আয়োজন, অথচ তাঁদের মনের ভেতরের সেই দুশ্চিন্তার শিখাটা ঠিক ধিকিধিকি জ্বলছে। কী হবে, কীভাবে চলবে সারাটা বছর?

কুমোরটুলির প্রায় ৮০% মৃৎশিল্পীরই এখনও অবধি বছরের অনেকগুলো দিনই হাঁড়ি চড়ে ঋণের টাকায়। এই ক’মাসে হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে যে ক’টা টাকা রোজগার হয় তার সবটাই চলে যায় ঋণ মেটাতে। তারপর ? পুনর্মূষিক ভবো  ফের হাত পাততে হয় ঋণদাতাদের সামনে। এমন ভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর।

durga-13

আবার সরকার, স্থানীয় বিধায়ক কাউকেই সেইভাবে পাশে পাননি এই দীনহীন পটুয়ারা। আগেও যেমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতেন, আজও তেমনই আছেন। মোহময়ী তিলোত্তমা কলকাতার এটা একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক।  দায়সারা ভাবে কয়েকটা জলের কল, পাইপলাইন, ভেপার বসানো ছাড়া তেমন কোনও কাজই সঠিক উদ্যোগের অভাবে করাই হয়নি। একটা কেমন যেন চাপা অভিযোগ, ক্ষোভ রয়েছে মৃৎশিল্পীদের মনের ভেতর।

তবে এত অভাবের মাঝেও এই কুমারটুলিই আবার অনেকের মুখে দুমুঠো অন্নের ব্যবস্থা করে হাসি ফোটাচ্ছেঅনেক গ্রাম থেকে দরিদ্র পরিবারের কেউ কেউ এসে ঠাকুর তৈরির কাজ করে কিছু টাকা উপার্জন করে নিয়ে যাচ্ছেন। ঠাকুর তৈরির মরশুম শেষে দেশে ফিরে যান এঁরা। বছরের বাকি সময়টা সেখানে ভাগচাষ বা নিজের জমি চাষ করেন। ঘুরতে ঘুরতে তেমনই এক জনের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। মুর্শিদাবাদের, জীবন। জীবন বেশ ক’বছর ধরেই এখানে আসছেন। পেটের দায়ে শহরে এসে এখানেই তাঁর এই কাজে হাতেখড়ি। তাঁর পরিবারের কেউই কোনো দিন ঠাকুর তৈরির কাজ করেননি। জীবনের কাছেই জানলাম, ৯টা থেকে ৯টা তাঁর ডিউটি। মাঝে ১ ঘণ্টা বিশ্রাম। তার মধ্যেই নিজে হাতে রান্না করে, খেয়ে, বিশ্রাম করে, আবার হাত দিতে হয় কাজে। এখন যে দারুণ ব্যস্ততা। কথা বলা কেন, দাঁড়িয়ে নিশ্বাস ফেলার মতো সময় নেই কারও। জীবনরা আগস্টের আগেই চলে আসেন। এর পর টানা কয়েকটা মাস এখানেই থাকেন। মরশুম শেষ হলে গ্রামে ফিরে আবার চাষের কাজে হাত লাগান। জীবনই জানালেন, তাঁর মতো এমন অনেকেই এখানে এসে কাজ করছেন। তবে সব কাজ সবাই করতে পারেন না। দানবদলনীর চক্ষুদানের কাজ করেন বিশেষ কয়েক জন শিল্পী। এমন চক্ষুদাতার সংখ্যা ৪-৫ জন। এই ৪-৫ জনই গোটা পটুয়াপাড়ায় দেবতার চোখ আঁকার কাজ করেন।

নাম বলতে অনিচ্ছুক এক জনের কাছে জানা গেল, একটা কাঠামো তৈরি থেকে প্রতিমার সাজসজ্জা পর্যন্ত গোটা পর্বটা মিটতে সময় লাগে ১৫ দিন। তবে হাতে এখনও অনেক কাজ। তাই কেউই বিশেষ কথা বলতে ইচ্ছেপ্রকাশ করছেন না। তিনিই বললেন, ফাল্গুন চৈত্রমাসটা এক্কেবারে ভাঁটার সময়বলতে গেলে হাতে কোনো কাজই থাকে না। নাম না জানা এই দাদার কাছ থেকে জানতে পারলাম তাঁদের সমিতির কথা। সেখানে গেলে নাকি জানতে পারা যাবে সব কিছুই।

durga-12

পৌঁছোলাম পটুয়া সমিতির জয়েন্ট সেক্রেটারির রঞ্জিত সরকারের কাছে। জানলাম, এখনও ‘থিম’ আর ‘সাবেক’ পুজোর মধ্যে লড়াইয়ে এগিয়ে ‘সাবেক’। ‘থিম’-এর পরিমাণ ৩০% হলে,  ‘সাবেক’ ৭০%।  যাঁরা ‘থিম পুজো’  প্রায় ৫-৬বার করেছেন তাঁরাও ফিরছেন ‘সাবেকে’। অন্যদিকে বিদেশে প্রতিমা পাঠানোর হারও ক্রমশ বাড়ছে বলে জানালেন তিনি।  ইতিমধ্যেই গত বছরের তুলনায় বেশ কয়েকটা ঠাকুর বেশিই পাঠানো হয়েছে। সেখানে চাহিদা অনুযায়ী এক চালচিত্র বা ছাড়া ছাড়া চালচিত্রের ঠাকুর বানানো হয়। আর তার আকার আর কাজের ওপর নির্ভর করে কোনোটা ৮০ হাজারে,  কোনোটা আবার একদেড় লাখেও বিক্রি হয়।  তিনি বললেন, আজকাল শোলার ঠাকুরের চাহিদা ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকেছে, ১০%। বাড়ছে ফাইবারের তৈরি ঠাকুরের চাহিদা।

durga-3

রঞ্জিতবাবু জানান, এখানকার ২০% ছাড়া বাকি ৮০% পটুয়াই বছরভর দারিদ্রতায় ভোগেন।  ঋণের বোঝা সারা বছরই তাঁদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে। বাম আমলে এই এলাকার উন্নয়নের জন্য একটা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল। অনেকদিন আগেই তা হিমঘরে চলে গেছে। তারপর থেকে এ ব্যাপারে আর কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি  এর সঙ্গেই ঠাকুর তৈরির কাঁচা মালের দাম যে হারে বাড়ছে সেই তুলনায় ঠাকুরের দাম পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে  তাই লক্ষ্মীসরস্বতীর মতো ছোটো পুজোগুলোতে কুমোরটুলি প্রায় ফাঁকাই থাকে। সামগ্রিক বিচারে কুমোরটুলি আছে সেই তিমিরেই

du-13

বাপ-ঠাকুরদার এই পেশার ভবিষ্যৎ কী? সরকার বাবু বললেন, এমন অনেকেই আছেন যাঁরা ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছেন। যেমন অনেক প্রবীণ শিল্পীর কন্যা সন্তান বা স্ত্রীরাও হাল ধরেছেন। রীতিমতো কোমর বেঁধে লেগে রয়েছেন। নিজে হাতে ঠাকুর তৈরি করা, রঙ করা, ব্যবসা দেখা থেকে শুরু করে সবটাই করছেন – ছোটো থেকে কাজটাকে ভালোবেসে বা পেটের দায়ে। এলাকার এই মহিলা শিল্পীরা হলেন মালা পাল, কাকলি পাল, চায়না পাল, মীনাক্ষী পাল। আবার অনেকেই এই পেশায় আর তেমন ভাবে আগ্রহী নন। তাই তাঁরা অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।  তবে ব্যক্তিগত ভাবে তাঁরই পরের প্রজন্ম এই পেশায় কতটা যুক্ত থাকবেন তা জানার জন্য সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।  তাই গোটা কুমোরটুলির ভবিষ্যৎ কী তা তো ভবিষ্যতই বলতে পারবে।

durga-5

তবে আলো অন্ধকার জীবনের দারিদ্র-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে এই ক’টা মাস কুমোরটুলি ব্যাপক জমজমাট। এখন দিকে দিকে শুধু রঙের ঢল। বড়ো-ছোটো প্রতিমা সব ঘরে ঘরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। অপেক্ষা এবারের বোধনের। তা সত্ত্বেও আসন্ন উৎসবের মধ্যেই যে লুকিয়ে আছে বিষাদের সানাইয়ের সুর। শিল্পীদের হাতে আসবে কিছুটা অর্থ। জ্বলবে আলো, ভরবে পেট, মিটবে ঋণ। কিন্তু তারপর ? আবার সেই অন্ধকার আর ঋণের বোঝায় মাটিতে নুইয়ে যাবে মাথা। অপেক্ষা আবার একটা বছর।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here