রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত বসুমল্লিকদের দালান মাতৃবন্দনার জন্য প্রস্তুত

0
717
puja dalan of basumallick
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় এখন শিউলি, শিশির দেখতে মাঠে-ময়দানে যেতে হয় না। ছুটতে হয় না কাশফুল দেখতে শহর পার হয়ে গ্রামের ধার। এখন সবটাই হাতমুঠোয়। সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পা-বালিশের অনুষঙ্গে সেটিও জানান দিয়ে দিচ্ছে আর কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। সুতরাং মুখ ফিরিয়ে থাকার দিন আর নেই, ঘরে ফেরার ডাক এসেই গিয়েছে।

বাড়ির পুজোগুলিতে দেবীপক্ষ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মীয়স্বজনের ভিড় বাড়তে থাকে। কোলাহলের গন্ধটাই অন্য রকম। নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে দেহগন্ধীর সুবাসে হাওয়া যায় বদলে। কর্পোরেট পোশাক ছেড়ে ধুতি বা আলিগড়ি পাজামা-পাঞ্জাবি আর শাড়িতে বেশ দেখতে লাগে চার ধার। এখানেই দেবীদুর্গার আকর্ষণী শক্তি। দেখা হল পুরোনো কলকাতার সাবেক পটলডাঙার বাড়ির ৩১তম পুরুষ ঐষিকী বসুমল্লিকের সঙ্গে। নানা কথায় খানিক সময় কাটল বেশ ভালো।

বাড়ির পুজোর ঘনঘটা ছেড়ে এই বসুমল্লিক পরিবারের ইতিহাস আজ পুজোর আবহে জানতে ভাল লাগবে। কিছুক্ষণের জন্য ফিরে দেখা। স্বদেশি যুগে কংগ্রেসের চরমপন্থী দলের অন্যতম নেতা রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক এই পরিবারের সন্তান। ২৭ অক্টোবর, ১৯০৫ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়ির ঠাকুরদালানে ছাত্রসভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও নানা সময়ে রাজনৈতিক সভাও হয়েছে এই দালানে। এই দালানকে এখন মাতৃবন্দনার জন্য সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। রঙের প্রলেপ পড়েছে পাঁচ খিলান যুক্ত দু’ দালান বিশিষ্ট ঠাকুরদালানের। দ্বার-দালানের বাইরে উপর দিকে আছে বিষ্ণুর দশ অবতারের ছোটো মূর্তি সারিবদ্ধ ভাবে দেওয়ালে গাঁটগাথা।

মধ্য কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই পরিবার। কৌলিক পরিচয়ে দক্ষিণ রাঢীয় কায়স্থ সমাজের মাহিনগরের বসু তথা কাঁটাগড়ের বসুমল্লিক পরিবার। সমাজ সংস্কারক গোপীনাথ বসুর (পুরন্দর খাঁ) উত্তরপুরুষ। গোপীনাথ ছিলেন গৌড়ের হুসেন শাহের উজির। গোপীনাথ ও তাঁর ভাই বল্লভ পাঠান সুলতানি দরবার থেকে ‘মালিক’ উপাধি লাভ করেন। কালক্রমে তা মল্লিকে রূপান্তরিত হয়। পাঠান যুগের পরে বাংলায় মুঘল রাজত্ব শুরু হলে মাহিনগরের বসুমল্লিকদের অনেকে রাজনৈতিক কারণে বাংলার নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তারই একটি শাখা হুগলি-জেলার পান্ডুয়ার কাছাকাছি কাঁটাগড় গ্রামে বসতি শুরু করে।

oishiki basumallick
ঐষিকী বসুমল্লিক।

কাঁটাগড় থেকে রামকুমার বসুমল্লিক ১৭৯৪-তে কলকাতায় চলে এলেন। পুরোনো কলকাতার পটলডাঙা বা এখনকার কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলের বাসিন্দা জনৈক কৃষ্ণরাম আইচের কন্যা শঙ্করীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তান রাধানাথ (১৭৯৮-১৮৪২) পটলডাঙা পরিবারের প্রাণপুরুষ। ইনি ১৮৩১-এ পঞ্চাননতলা লেনে ঠাকুরদালান সহ ভদ্রাসন নির্মাণ করে (বর্তমানে ১৮এ, রাধানাথ মল্লিক লেন) দুর্গাপুজো শুরু করেন।

বসুমল্লিকবাড়ির পুজো অনুষ্ঠিত হয় প্রতিপদাদি কল্পে অর্থাৎ আশ্বিন মাসের মহালয়ার পরের দিন থেকে বেল-কাণ্ডকে দেবীরূপে কল্পনা করে বোধন হয়। মহাষষ্ঠীর বরণের পরে প্রতিমার পুজো শুরু হয়। এখানকার প্রতিমা একচালা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। ডাকের সাজের পাশাপাশি দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে যথাক্রমে বেনারসি ও সিল্কের ধুতি পরানো হয়। সিংহের মুখ ড্রাগন আকৃতির। কলাবউ স্নান করানো হয় দালানেই তীর্থবারি দিয়ে। অষ্টমীর দেবীবরণ, সন্ধিপুজোয় ও নবমীর চালকুমড়ো বলির সময়ে বন্দুক ফাটানো বসুমল্লিকবাড়ির রীতি। দশমীর সকালে ও বিকালে বরণ অনুষ্ঠানের পরে নিমতলা ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়।

এক সময়ে দুর্গাপুজো উপলক্ষে আঞ্চলিক ইতিহাস ও পারিবারিক নথিপত্রের প্রদর্শনী করা হত। প্রকাশিত হত ‘বসুমল্লিকবাড়ি সংবাদ’ পত্রিকাটি। আসর বসত ভক্তিগীতি সহ নানা নৃত্য-সঙ্গীতের। হবে নাই বা কেন? কত্থক বিশেষজ্ঞ নরেন্দ্রচন্দ্র বসুমল্লিক এই বাড়ির সন্তান। তিনি ছিলেন এলাহাবাদ সঙ্গীত সম্মেলনের কত্থক নৃত্যের প্রথম বাঙালি বিচারক। এই ঠাকুরদালানে অনুষ্ঠিত হয়েছে তৎকালীন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত-নৃত্যের অনুষ্ঠান ‘শংকর উৎসব’। কলকাতা পুরসভার ‘ঐতিহবাহী বাড়ির’ তালিকায় রয়েছে ভদ্রাসন-সহ এই ঠাকুরদালানটি।

এ ছাড়াও ২২ রাধানাথ মল্লিক লেন ও ৪৬ শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের শরিকবাড়ি দু’টিতে এখনও দুর্গাপুজো হয়। দু’টি বাড়ির ঠাকুরদালান ঢালাই লোহার কারুকার্যে সজ্জিত। বাড়ি দু’টির পুজোর সূচনা করেন ক্ষেত্রচন্দ্র বসুমল্লিক (১৮৯১) ও শ্রীগোপাল মল্লিক (১৮৯৬)।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here