কাজে নেই মন, পুজো এল বলে

0
203

papya_mitraপাপিয়া মিত্র

শ্রাবণের মেঘধোয়া আকাশ ভাদ্রকে স্বাগত জানায়। কানে কানে কয়ে যায় ভুলো না আমায়। যে কোনও মুহূর্তে ঝরে পড়তে পারি অভিমানের বোঝা ভারী হলে। কৃষির কাজে আমাকে কাজে লাগিয়ে এখন আগমনী হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেবে সেটি হবে না, এই বলে রাখলাম।    

মন আলো করা ভাদ্র ভাবল বেশ তা-ই হবে। উৎসবসভা মাঝে শ্রাবণের বীণা না হয় বাজল। সবাইকে নিয়েই তো উৎসবের মজা। রাস্তা সারাই থেকে আলোভরা নগর। ঢাকে পালক সাজানো থেকে তোরঙ্গ থেকে কাঁসর বের করা, শ্রীচরণকে সাজিয়ে তুলতে দোকানে দোকানে গুঁতোগুঁতি থেকে কাজের মাসির সঙ্গে পুজোর বোনাস নিয়ে বাড়ির গিন্নির বিবাদ, শেষ মুহূর্তে রেলের টিকিট পাওয়া থেকে আরও কী কী ফ্যাশানেবল কুর্তা-শাড়ি-শার্ট এল তা দেখে নেওয়া কোলযন্ত্রটিতে। কিন্তু ওই যে ‘কাল’ বলে যে শব্দটি আছে, তার অহং বাড়ল। ভাদ্র এক পা করে হাঁটছিল। কখনও মেঘ, কখনও রোদের চটা। শরৎ ভাবল ভয় কী? ভাদ্র ও আশ্বিনকে নিয়ে তো সে ‘কাল’, শরৎকাল। পাশ থেকে ফোড়ন দিল পুব হাওয়া, ‘ওর যে সময় গেল চলে’। আকাশে উড়ে যাওয়া টুকরো মেঘের দল গলা বাড়িয়ে বলে যায়, ‘ভয় কী সময় গেল ব’লে…কালো মেঘের আর কি আছে দিন/ ও যে হল সাথিহীন’। ব্যাস, হুড়মুড়িয়ে ঝরনার গান বাজিয়ে নামল বাদলধারা।  

বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে নীল-স্বচ্ছ সাদা-গোলাপি-হলুদ প্লাস্টিকে ঢেকে গেল মাসলম্যান অসুরের দেহ। গণেশের ভুঁড়ি হোক বা কার্তিকের বাহন, সব সেঁধিয়ে গেল ঘেরাটোপে। এ অলস দুপুর নয় যে বাদলধারার সঙ্গে স্বপ্নের মায়াজাল বোনা হবে। ফি-বছরের আশা-ভরসা, তাই হুড়োহুড়ি। কুমোরপাড়াতে এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। পর পর ঘর, গায়ে গায়ে কাজ। মাটি, টিন, কাঠ, বাঁশ – এই শহরের মধ্যে যেন এক মাটির পুতুলের গ্রাম। মেটে রঙের মা দুগগা তাঁর প্লাস্টিকের ভেতর থেকে দশ হাত বের করে বৃষ্টি থামাতে চায়। ভাদ্রের আকাশে আবার রোদের ঝিলিক। এই মাটির পুতুলি-সংসারে আবার তৎপরতা ওঠে। লুঙ্গি-ধুতি-গামছা পরিহিত মর্ত্য-দেবতারা তাঁদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে গড়ে চলেছেন ভুবনমোহিনী তেজপুঞ্জ।  

উড়ু উড়ু মনে দোল দিয়ে যায় শরতের হাওয়া। ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে পাগল মন খুঁজে বেড়ায় প্রিয় পোশাকটি। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম। চায়ের কাপ হাতে দৈনিক কাগজের পাতা ওলটাতেও পিছপা হয় না আধুনিকা-ললনারা। শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায় – এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে রিনি, লাট্টু, গাবলু, ডাব্বু- এদের দোষ কী? এই চঞ্চলতা, এই অস্থিরতা যদি ঘরে ঘরে চলতে থাকে তাদের যে পরীক্ষা চলছে? তাদের মন কোথায় যায়। শহুরে ছেলেমেয়ের মন পড়ে আছে শপিং মলে, কিন্তু পাঠশালা শব্দটি এখনও যেখানে আছে, সেখানের মন উড়ে যায় চণ্ডীমণ্ডপে। কে জানে এতক্ষণে সিংহরাজের কেশর লাগানো হয়ে গেল কিনা! কুমোরদাদু মাটির ওপরে সাদা রং লাগিয়ে ফেলল কিনা! নামতার বইগুলো কেন যে এই সময় হারিয়ে যায় না…উঁহু এ সব বলে না। ওই দেখো শ্রাবণমেঘ ভাদ্রের আকাশ ছেয়ে নেমে পড়ল মাঠেঘাটে, ছাদে, চালে, মণ্ডপের গা বেয়ে, কংক্রিটের রাস্তা ধুয়ে, লাল মোরামের গ্রাম্যপথ ভিজিয়ে। বলে ছিল না সে বড়ো অভিমানী।puja-padma

বাড়ির বাইরে পা রাখলেই চোখ আটকে যায় বিজ্ঞাপনে। থিমমেকারদের নিয়ে আহ্লাদে আটখানা পুজোকমিটি। আগমনীবার্তা দিকে দিকে। তবে আনন্দময়ীর আগমনে এখন জামাকাপড়েই ক্ষান্ত নয় মানুষ। অনুষঙ্গ হিসেবে আসবাব থেকে গহনা, মিউজিক সিস্টেম থেকে ঘর সাজানোর উপকরণ, গাড়ি বুকিং, উপচে পড়া পার্লার, বাজারচলতি থিম রঙের সঙ্গে বাড়ি রং করার হিড়িক পড়েছে দিকে দিকে।  এরই মাঝে কানমলা বা চোখ পাকানো পিছু ছাড়ছে না রিনি, লাট্টু, গাবলু, ডাব্বুদের। স্কুলের পরীক্ষা চলছে যে! সিরিয়াল দেখার আগে পরে নানা বিজ্ঞাপন, পুজোবার্ষিকী এসবই তো মনকে দোলা দিয়ে যায়।

শারদলক্ষ্মীর আগমনী পথ ছেয়ে রেখেছে কাশ, নেই নেই করে শেফালিকাও গন্ধ ছড়িয়েছে। আকাশনীল পথে নতুন ধানের মঞ্জরী দিয়ে ডালা সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। ছেলেমেয়ের দল বৃষ্টি থামলেই শরৎ আকাশের সোনাঝরা আলো দেখলে ছুট দেবে মণ্ডপে। সময় যে আর নেই। ঘরে আর যাওয়া নেই। বনদেবীর দ্বারে যে শঙ্খধ্বনি বাজছে তা আকাশবীণার তারে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে। পুজোর গন্ধ নিয়ে বাজারে দেখা দিয়েছে পদ্ম। শিশিরভেজা ব্যাকুলতা নিয়ে অপেক্ষায় উঠোন। মৃন্ময়ী মায়ের মোহন রূপ দেখে ভুল হয়ে যায় চেনা পথ।

শ্রাবণঘন আকাশকালো মেঘের অবগুণ্ঠন সরিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের জিয়াদারা, হুগলির খন্যান, বৈঁচি থেকে প্রতাপপুর, কুলতলি, জয়নগরের ঢাকিরা। ঢাকের গায়ে চটকদারি জামা পরানো হয়। জরির লেস বসিয়ে আরও জাঁক করে তোলা হয়। বাঁয়ায় লাগানো হয় হাঁসের পালক, পায়রার পালক, ময়ূরের পালক। এরই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে। ঢাকি যত নাচবে বোল তত ফুটবে। ঢাকের কেশর তত দুলবে।  

উমামায়ের আগমনের সুর ভেসে আসে অনেক দূর থেকে। শ্রীবাণীকুমার আর শ্রীবীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র পাখিপড়া করে শিখিয়েছেন দেবীর আয়ুধবর্ণনা। আগের রাতের জেগে থাকার মজলিশ এখন আর নেই। ফেলে আসা দিনে ছিল রাত জাগার প্রবণতা। মহালয়ার দিনে নানা প্রশ্নোত্তরে জিতে যাওয়ার পুরস্কার। একটা ঘণ্টা বেশি থাকা দুর্গামায়ের কাছে। এখন রাত জাগা হয়, কিন্তু সেখানে থাকে আগমনীর অনাদর। তাই তো শরতের অমল মহিমা বিদীর্ণ করে নেমে আসে অকাল বর্ষণ। আমাদের প্রার্থনা, ভেজা পথ ধরেই শারদ প্রাতে উঠোনে ফুটে উঠুক অমল কমলখানি।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here