বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে ধাক্কা লাগলেও বাহুবলীর কাঁধে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় সিনেমা হলগুলি

0
614
শৈবাল বিশ্বাস

২৫০ কোটি টাকা বাজেটের বাহুবলী-২ ছবিটি নির্মাণের সময় পরিচালক এস এস রাজামৌলি বলে দিয়েছিলেন, এর ব্য‌বসা হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। সেই হাজার কোটি টাকার গণ্ডি কবেই পেরিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি তাতে মুক্তি পাওয়ার ২৩ দিনের মাথায় ছবিটি ব্য‌বসা করেছে ১৫১৬ কোটি টাকা আর এ মাসের শেষে ব্য‌বসা গিয়ে দাঁড়াবে ২২৭৭ কোটি টাকায়। এ যাবৎ কোনও ভারতীয় সিনেমার কাছে এটা স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। হিন্দি ছবি যেখানে ১০০-১৫০ কোটি টাকার ব্য‌বসা ছুঁলে লোকে আহ্লাদে আটখানা হয় সেখানে একটা হিন্দিতে ডাব করা তেলেগু ছবি এই হারে ব্য‌বসা করবে এটা সত্য‌িই আশাতীত ঘটনা।

বাহুবলীর ব্য‌বসার সঙ্গে বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পের বিতর্ক ইতিমধ্য‌েই এতটা জড়িয়ে গিয়েছে যে এখন নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছে, সত্য‌িই এ রাজ্য‌ের চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্পকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য‌ আদৌ কিছু করা দরকার কিনা।

সারা দেশে দৈনিক ৬৫০০ হাজার শো নয়ে বাহুবলী রিলিজ করেছিল। এর মধ্য‌ে পশ্চিমবঙ্গে ৩০টি সিনেমায় দৈনিক চারশো শো-এ বাহুবলী দেখানো হত। কিন্তু নিরন্তর হাউসফুলের ঠেলায় বাহুবলীর স্ক্রিনিং ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে যেমন হলের সংখ্য‌া বাড়ছে তেমনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শো-এর সংখ্য‌া। এই মুহূর্তে কলকাতা,দুর্গাপুর, আসানসোল,শিলিগুড়ি মিলিয়ে মোট ৪৮টি হলে বাহুবলী চলছে। শুধু তাই নয়, গ্রামগঞ্জের অসংখ্য‌ হলেও তিনটি শো-এ বাহুবলী বড়োপর্দায় চালানো হচ্ছে যার হিসাবটা এখনও পুরোপুরি এসে পৌঁছয়নি। তবু আন্দাজের ওপর ভর করে বলা যায় এ রাজ্য‌ের ১০০ টি হল এখন বাহুবলীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

ক্রমাগত শো-এর সংখ্য‌া বেড়ে চলায় চলতি বাংলা ছবির মুক্তি বিপদের সামনে পড়েছে। উত্তর কলকাতার একটি হলে যেমন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা পরিচালিত পোস্ত মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। শিক্ষিত রুচিসম্পন্ন হল মালিক নিজে থেকে যেচে অনেক আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবকে পোস্ত দেখার আমন্ত্রণ করেছিলেন। দুর্ভাগ্য‌ের বিষয় তাঁর হলের চারটি শো-ই এখনও বাহুবলীর খপ্পর থেকে বেরোতে পারছে না। কী করেই বা বেরোবে? রোজ যেখানে বিক্রি বাড়ছে,দর্শকদের চাহিদা বাড়ছে সেখানে তো আর দুম করে হল থেকে ছবি তুলে নেওয়া যায় না। শুধু উত্তর কলকাতা কেন, গ্রামেগঞ্জে যে হলগুলি কোনওরকমে টিঁকে ছিল সেগুলিতে বাহুবলীর জেরে রঙের পোঁচ লেগেছে। দর্শক সমাগম দেখে প্রাচীন হলমালিকরা ভাবছেন বলিউড-টলিউডের সেই স্বর্ণযুগ বুঝিবা ফিরে এল। পোস্তর মতো হিট ছবিও ঠিক সময়ে শো-এর জন্য‌ জায়গা পাচ্ছে না। কলকাতার হলে যদি বা জায়গা জোটে মফসসলের হলে নৈব নৈব চ। পোস্ত তবু নিজগুণে কিছু একটা ব্য‌বসা করে নেবে কিন্তু কী হবে বাকি ছবিগুলির? কৌশিক গঙ্গোপাধ্য‌ায়ের বিসর্জন ছবিটি ভালই চলছিল। কিন্তু বাহুবলী নেমে পড়ায় ছবিটি বহু হল থেকে উঠে যেতে বাধ্য‌ হয়েছে। সরকারি হলেও ঠিকসময়ে ছবিটি দেখানো যাচ্ছে না কারণ সেখানে রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্কে ছবি চালানোর খেলা।

স্বভাবতই ক্ষুব্ধ কৌশিক গঙ্গোপাধ্য‌ায় টুইটারে এক রাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, কী হবে বাংলা ছবির? তাঁকে সমর্থন করেছেন শ্রীজিত মুখোপাধ্য‌ায়, বীরসা দাশগুপ্ত, অতনু ঘোষের মতো পরিচালকরাও। একই ধরনের টুইট করেছেন বিসর্জন ছবির মুখ্য‌ অভিনেতা আবীর চট্টোপাধ্য‌ায়। কৌশিক তাঁর টুইটবার্তায় বলেছেন,-‘ They are Bahubalis and we are Bengalis.They rule and we surrender! But for how long? Bishorjon losing theatres and shows in its own state! SAD’  আবীর চট্টোপাধ্য‌ায় বলেছেন, ‘Would you prefer to see a Bengali film or otherwise? Choice is yours and now is the time to say it loud.’

ভিন্ন মত কিন্তু প্রদর্শকদের। তাঁরা বলছেন, পুজোর আগে কয়েকমাস বাহুবলী যে ব্য‌বসাটা দিল তাতে হলগুলির চেহারা বদলে যাবে। হলের শ্রমিকদের মুখেও হাসি ফুটবে। শুধু মাল্টিপ্লেক্সের কথা ভাবলে চলবে না, মফসসলের হলের শ্রমিকদেরও এবার নিয়মিত মাইনে জোটার ব্য‌বস্থা হল। কিন্তু কী হবে বাংলা ছবির? প্রিয়া সিনেমার মালিক অরিজিৎ দত্ত বললেন, ‘বাহুবলীর জন্য‌ আদৌ বাংলা ছবির ক্ষতি হচ্ছে না। যে ছবিটা ব্য‌বসা করার সেটা ঠিকই ব্য‌বসা করছে। এই তো দেখুন না পোস্ত ছবিটা আমার হলে প্রাইম টাইমে দুটো শো-এ চলছে। শুধু তো নিজেদের কথা ভাবলে চলবে না। হলের ব্য‌বসার দিকটা তো দেখতে হবে।’ অরিজিৎবাবুর মতে, বহুদিন বাদে একটা ছবিকে কেন্দ্র করে হলের ব্য‌বসায় যে জোয়ার এলো তাকে পিছন থেকে টেনে রাখাটা উচিৎ নয়। তাঁর মন্তব্য‌,‘যেটা চলার সেটা ঠিকই চলবে। কাজেই আমি মনে করি না বাহুবলী এসে গিয়েছে বলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে এই মুহূর্তে বিরাট কিছু ভাবনার প্রয়োজন আছে।’ অরিজিৎবাবুদের মতো আরও কিছু হল মালিক বলছেন, দর্শকদের যে আবার হলমুখো করা গিয়েছে এটাই যথেষ্ট। হলে ছবি দেখার কালচার ফিরিয়ে আনতে হলে এ রকম স্পেকটাকুলার কিছু ছবি ছাড়া উপায়ও নেই।

দ্বন্দ্ব অনেক,মত অনেক,কিন্তু আসল সত্য‌টা কী?সত্য‌িই কি বাহুবলী বিনোদন শিল্পে ক্ষুদ্র পুঁজি বনাম বৃহৎ পুঁজির দ্বন্দ্বকে সামনে এনে দিল? উত্তরের জন্য‌ কয়েকদিন অপেক্ষা করতেই হবে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here