দেবসেনাপতি কার্তিকের উৎস সন্ধানে

0
460

papya_mitraপাপিয়া মিত্র  

কার্তিকঠাকুর হ্যাংলা, একবার আসে মায়ের সঙ্গে, একবার আসে একলা।

যতই এ সব কথা লোকসমাজে বলা হোক না কেন, দুগগামায়ের বাকি ছেলেমেয়েকে নিয়ে কিন্তু এত লেখালিখি হয়নি। কার্তিককে নিয়ে পৌরাণিক বা লৌকিক কথন শুরু করলে শেষ করতে বেশ অসুবিধেই হবে। তাই সামান্য ক’টি কথা আজ শুনিয়ে রাখি।

কার্তিকেয় বা কার্তিক হিন্দুদের যুদ্ধদেবতা। শিব ও দুর্গার কনিষ্ঠ সন্তান। বৈদিক দেবতা তিনি নন, তিনি পৌরাণিক দেবতা। বাংলায় কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে এই পুজোর আয়োজন করা হয়। কার্তিক হিন্দুদের উর্বরতার দেবতা। প্রধানত এই পুজোর পরেই আসে নবান্ন। প্রাচীন ভারতে এই পুজোর প্রচলন ছিল। উত্তর ভারতেও প্রাচীন দেবতা রূপে পূজিত হয়। অন্য হিন্দু দেবদেবীর মতো কার্তিকের একাধিক নাম আছে। কৃত্তিকাসুত, বিশাখ, আম্বিকেয়, ষড়ানন, শক্তিপাণি, ক্রৌঞ্চারতি, স্কন্ধ, দেবসেনাপতি, শিখিধ্বজ, তারকারি, বাহুলেহ, গুহ, সৌরসেন, কুমার, নমুচি, অগ্নিজ ইত্যাদি। দক্ষিণ

কার্তিকের বাহন ময়ূর। দেবতা ও তার বাহনে সৌন্দর্য ও শৌর্য দুই বিদ্যমান। ময়ূরের পায়ে জড়ানো থাকে সাপ। ময়ূর ও সাপ অতি তৎপর, আর যিনি দেবসেনাপতি তিনি তো এক তেজঃপুঞ্জ পুরুষ হবেন। দক্ষিণ ভারতে কার্তিক পুজো বেশি জনপ্রিয়। তামিল ও মালয়ালাম ভাষায় কার্তিক মুরুগান বা মায়ূরী কন্দসামী নামে পরিচিত। এরা বিশ্বাস করে মুরুগান জীবনের রক্ষাকর্তা। কন্নড় ও তেলুগু ভাষায় সুব্রহ্মণ্যম নামে পরিচিত। দক্ষিণ ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া মরিশাস‑ যেখানে তামিলবাসীর বসবাস, সেখানেই কার্তিক বা মুরুগানের পুজোর প্রচলন রয়েছ।

কৃত্তিকা নক্ষত্রে কার্তিকের জন্ম এবং ছয় কৃত্তিকার দ্বারা তিনি পুত্ররূপে গৃহীত ও প্রতিপালিত হন তাই তাঁর নাম কার্তিকেয় বা কার্তিক। ব্রহ্মার বরে মহাবলী তারকাসুরের নিধনের জন্যই নাকি অমিতবিক্রম যোদ্ধা কার্তিকের জন্ম হয়েছিল। দৈববলে অজেয় শক্তিসম্পন্ন এই দেবশিশু কার্তিকেয় তারকাসুর নিধন করেছিলেন।

মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে ‘কুমার’ তথা কার্তিকের জন্মের পূর্বকথা আলোচনা করেছেন। এই কাব্যে ১৭টি সর্গ থাকলেও পণ্ডিতদের মতে প্রথম আটটি সর্গ কালিদাসের রচনা, বাকি অংশ পরবর্তীকালে নানা পুরাণ থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত হয়েছে।

কার্তিক সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণা আছে। তারকাসুর নিধন করে দেবকুলে কার্তিক হলেন দেবসেনাপতি। তাই কার্তিকের পুজো হয় মহাসমারোহে। বায়ুপুরাণ, স্কন্ধপুরাণ, বরাহপুরাণ, কালিকাপুরাণ, মৎস্যপুরাণ ইত্যাদি থেকে কার্তিকের জন্মের যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে কার্তিকের গর্ভধারিনী কে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। যেমন শিব-পার্বতীর মিলনে যে অমিতবীর্য পুত্র জন্মাবে সে ইন্দ্রের শক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে। এই আশঙ্কায় ইন্দ্র-সহ দেবতারা শিব-পার্বতীর কাছে রতিবিরতির জন্য প্রার্থনা জানান। তাঁরা সম্মত হলেও শিবের স্খলিত বীর্য আকাশগঙ্গার গর্ভে সঞ্চারিত হয়ে এক সন্তানের জন্ম হয়। আকাশগঙ্গা তাকে শরবনে ত্যাগ করেন। ছ’জন কৃত্তিকা ওই কুমারকে দেখতে পেয়ে লালন করেন বলে তার নাম কার্তিক। একই সঙ্গে পালনকারী ছ’জন কৃত্তিকা্র স্তন্য পান করার ব্যগ্রতায় কুমারের ছ’টি মুখ তৈরি হয়। তাই কার্তিক কোথাও ষড়ানন।

আরও একটি উৎস অনুযায়ী শিবের অন্য রূপ রুদ্র অগ্নির সঙ্গে এক হওয়ার পরে মহাদেব সপ্তর্ষিপত্নীদের রূপে কামমোহিত হয়ে পড়েন। তাঁকে তুষ্ট করতে স্বাহা অরুন্ধতী ছাড়া বাকি ছয় সপ্তর্ষিপত্নী যথা সম্ভূতি, অনসূয়া, ক্ষমা, সন্নতি, প্রীতি ও লজ্জা ছদ্মবেশে ছ’বার অগ্নির সঙ্গে মিলিত হন। এর ফলে ছ’মাথা, দ্বাদশ বাহুযুক্ত যে কুমারের জন্ম হয় তিনি কার্তিক।

আবার অন্য মতে হর-পার্বতীর মিলনের ফলে সৃষ্ট তেজধারা পার্বতীর গর্ভ অতিক্রম করে ছ’বার পৃথিবীতে পড়ে। পার্বতী সেই তেজঃপুঞ্জকে এক করলে ছ’মাথা ও দ্বাদশ হাতযুক্ত এক বিক্রম কুমারের জন্ম হয়।

কার্তিকঠাকুর নিয়ে খানিক হেলাফেলা ছেলেখেলা চলে। কিন্তু সন্তানহীনাদের কাছে কার্তিকঠাকুরের মূল্য অপরিসীম। সুঠাম, বীর, সুন্দরের প্রতীক এমন সন্তান সব মা চান। গৃহস্থবাড়িতে সন্তানসন্ততি না হলে অনেকেই মজা করে কার্তিকঠাকুর ফেলে যান। বঙ্গদেশে কার্তিক সন্তানসন্ততির দেবী মা ষষ্ঠীর স্বামী হিসেবেও চিহ্নিত। তাই সন্তানহীন দম্পতিদের বাড়িতে কার্তিকপুজোর রেওয়াজ আছে। কার্তিকঠাকুর বারাঙ্গনাদের আরাধ্য বলেও পরিচিত। কারণ স্বামী-পুত্র-কন্যা নিয়ে ভরা সংসারের স্বপ্ন তো সবাই দেখেন। বারাঙ্গনারাও ব্যতিক্রম নন। তাঁদের সেই বাসনারই বহিঃপ্রকাশ কার্তিকপুজো।  

নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন প্রথা। হিন্দুবিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্নপ্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে হিন্দুরা পার্বণবিধি অনুযায়ী নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়।

তারাপীঠে মূর্তি পুজোর প্রচলন নেই। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় কার্তিকপুজো হয়।  আবার এই নবান্নকে কেন্দ্র করে কার্তিক পুজো হয়।

কাটোয়ার কার্তিকপুজোয় একটা সময় ‘কার্তিকলড়াইয়ের’ মূল আকর্ষণ ছিল ‘থাকা’। পুরাণের কাহিনি অনুসারে পিরামিডের আদলে তৈরি বাঁশের কাঠামোর ধাপে ধাপে পুতুল সাজিয়ে তা ফুটিয়ে তোলা হত। বিসর্জনের দিন রাতভর চলত শোভাযাত্রা। শোনা যায়, এক সময়ে ভাগীরথীর তীরে চুনারিপাড়ায় বারাঙ্গনাদের আস্তানা ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য কাটোয়ায় আসতেন বিভিন্ন এলাকার বাবু সম্প্রদায়ের মানুষ। ওই চুনারিপাড়ায় ঠাঁই নিতেন তাঁরা। সেখান থেকেই কার্তিকপুজোর উৎপত্তি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য শহরের নামী ও গুণী মানুষজনের হাত ধরে কার্তিকপুজো প্রসার পায়। কার্তিকপুজো নিয়ে চর্চা লেগেই থাকত। কোন ক্লাবের ঠাকুর কত বড়ো বা কার শোভাযাত্রা কত মানুষ টানতে পারে এই নিয়ে রেষারাষি ছিল তুঙ্গে। পরে এটি হয়ে দাঁড়ায় কাটোয়ার ‘কার্তিকলড়াই’। এই লড়াই কার্তিকপুজোকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here