ছ’শো দোকান নিয়ে পাথরপ্রতিমার গোবিন্দেশ্বরের মেলা জমজমাট

0
262

papya_mitraপাপিয়া মিত্র

এখন শীত মানবজীবনে বন্ধুত্ব পাতায় না বললেই চলে। মাথার আকাশ ব্যস্ত থাকে আগুন নিয়ে ফাগুনকে স্বাগত জানাতে। আর এই ফাগুনের তিথি নক্ষত্র মেনে আসে কতই না মেলা-পাব্বণ। তাকে ঘিরে গ্রামাঞ্চলের মেলাই উৎসব। প্রান্তবাসীর ক’টা দিন আনন্দে মেতে ওঠা। এমনই এক প্রান্তদ্বীপ পাথরপ্রতিমা ব্লক। কলকাতা থেকে যার দূরত্ব ১১৩ কিলোমিটার। এখানেই এখন ঘনঘটা শতাব্দীপ্রাচীন শিব চতুর্দশীর মেলার।

পুব দিকে মৃদঙ্গভাঙা আর পশ্চিম দিকে গোবদিয়া নদী। ফি বছরের মতো এ বারেও ভিড় করেছে ডিঙ্গি নৌকা আর আধুনিক যন্ত্রযুক্ত জলযান। জলপথে যাঁরা আসেন তাঁদের তো এটাই ভরসা। আর ডাঙার মানুষের জন্য নানা যানবাহন। বহুদূর থেকে সংসার-সরঞ্জাম, নানা খেলার কেরামতি, মুখচার খাবারের পসরা, শিশুভোলানো পুতুল, পোশাক, আসন-পিঁড়ি নিয়ে চলে এসেছেন হলধর-বাসন্তী-পরান মালতীরা। মেলার সঙ্গে তুলে নিয়ে এসেছেন নিজেদের সংসারের পরিজনদের। কাঁধে-কাঁখে ছেলেমেয়ের সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ি মায় ননদ-দেওরও। রাতের অন্ধকারে দোকানের ঝাঁপের সঙ্গে সঙ্গে চলমান সংসারের পর্দা পড়ে যাচ্ছে।

জল-জঙ্গল আর অসংখ্য খাঁড়িতে সম্মিলিত সুন্দরবন। এখানে জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ আর গাছে সাপ। মীন ধরা আর কৃষিকাজ এখানকার মানুষের জীবিকা। এই মানুষেরা বছরভর অপেক্ষা করে থাকেন শিবরাত্রির মেলার জন্য। নানা মানুষের কোলাহলে মুখর মেলাপ্রাঙ্গণ।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার পাথরপ্রতিমার ব্লকের রামগঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতে দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রাম। খড়ের চালে, মাটির ঘরে আরাধ্য গোবিন্দেশ্বর, জমিদার নন্দ পরিবারের এক ঐতিহ্য। ১৩২১ বঙ্গাব্দে শ্যামাচরণ নন্দের জমিদারির সময় ভূগর্ভস্থ এই শিবলিঙ্গ পাওয়া যায়। দেবতাকে না সরিয়ে মন্দির তৈরি হয়েছে সেই ভাবে। মাত্র কুড়ি বছর হল মাটির ঘর থেকে দেবতা পাকা মন্দিরে এসেছেন। ভক্তের টানে ভগবান জাগ্রত হন। তাই পাকা মন্দির হোক বা মাটির ঘর হোক, ঠাসাঠাসি ভিড়ে দোকানপাট বসেছে বিস্তৃত জমিতে। গোবিন্দেশ্বর মন্দিরের ডান দিকে শিবপুকুর, বাঁ দিকে নারায়ণ পুকুর। মন্দিরের চাতাল দিয়ে নেমে গিয়েছে সিঁড়ি, সেখানেই বিরাজ করছেন ১০৩ বছরের স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। অনুমান করা যায় গঙ্গাসাগর মেলার পরে সবচেয়ে বৃহত্তম মেলা পাথরপ্রতিমার শিবচতুর্দশীর মেলা।

কুড়ি একর জমিতে প্রায় ছ’শো দোকান বসেছে নানা পসরা নিয়ে। মেদিনীপুরের সবং থেকে সুতলি মাদুরের পাশাপাশি ঠাঁই করে নিয়েছে মাটির বাসন। এই বাসনের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। হুগলির জনাই থেকে যেমন এসেছে মিষ্টির খাবার, তেমনই এসেছে ডায়মন্ড হারবার থেকে ঝাঁকাঝুড়ি। আমতলা থেকে কাঠের আসবাব, হাওড়ার মাটির জিনিসের সঙ্গে নানা ফসল। দূরের জেলা থেকে দোকানিরা যেমন এসেছেন, এসেছেন নদীর পর নদী পার হয়ে মহব্বতপুর, রামগঙ্গা, মাধবপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ, পশ্চিম সুরেন্দ্রনগর, গোপালনগর, সাগর থেকে মানুষেরা। হাজার হাজার মানুষের পায়ের ধূলোয় চার দিক ধূসর। মৃদঙ্গভাঙার কোল আলো করার সঙ্গে সঙ্গে মেলার হাঁকডাক শুরু হয়ে গিয়েছে। দূরের মানুষেরা থেকে যাওয়ার সম্বলটুকু নিয়ে মেলায় চলে এসেছেন। অভাব নেই কোনো কিছুর। কলকাতার মেটিয়াবুরুজের শীতপোশাকের সঙ্গে ছোটো ছেলেটির বায়নার ঘুড়িও পেয়ে যান বাবা। মেয়ের হাতে জয়নগরের মোয়া তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে কাচের চুড়ি কিনতে যান মা।

গোবিন্দেশ্বর মন্দিরের মুখোমুখি রাসমঞ্চ, মঞ্চ ঘিরে দোকান। এখানে পুজো দেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি নেই। প্রধান পুরোহিত শিবপ্রসাদ নন্দ ও আরও কয়েকজনের সাহায্যে পুজোপাট এগিয়ে চলে। পুজোকমিটির সদস্য অশোক পাত্র জানালেন, মেলার মূল আকর্ষণ যাত্রা। শান্তিনিকেতন থেকে ছাত্রছাত্রীরা  এসেছেন রবিঠাকুরের গান ও নৃত্য পরিবেশন করার। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজস্ব অনুষ্ঠান করছেন, তার জন্য মহড়া চলেছে দীর্ঘ দিন ধরে। ম্যাজিক, নাগরদোলা, ঘোড়ারদোলার নানা আওয়াজে মেতে উঠেছেন প্রান্তবাসী।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here