anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

১৯৯৭-তে তো নয়ই। এমনকি ২০০৫-এও নয়। ৭০ বছরের মৈত্রী নিয়ে কতটা বদলে গিয়েছে দুই দেশ, তার আসল চেহারাটা দেখা গেল এবারেই। এবং স্বীকার না করলেই নয়- সেই বদলে যাওয়া চেহারা নিয়ে পুরোদস্তুর চমকে দেবে ৪২তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার থিম কান্ট্রি ফ্রান্সের প্যাভিলিয়ন।

চমকের সূত্রটা আসলে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির দুনিয়ায়। ১৯৯৭ আর ২০০৫, যে দু’বারেই শহরের এই বইয়ের হাটে থিম কান্ট্রি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ফ্রান্স, তখন প্রযুক্তি এমন করে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। ফলে মনোরম অন্দরসাজ আর মননশীল তত্ত্বে-তথ্যেই কলকাতার বুকে বাজিমাত করেছিল ফরাসি দেশ।

কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে অনেকটাই বদলে গিয়েছে দুনিয়াদারি। শুধুই সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য নয়, ভারত আর ফ্রান্স দুই দেশ এখন প্রযুক্তিসূত্রেও পরস্পরের বড়ো কাছের। তবে সেই প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং রূপকল্পের সোনার কাঠির ছোঁয়া লাগল বইমেলায় ফ্রান্সের প্যাভিলিয়নেই।

বিজ্ঞাপন

পরিণামে প্রথম দেখা থেকেই মনে ঝড় তুলতে শুরু করবে ফ্রান্সের প্যাভিলিয়ন। দেখা যাবে, ভাঙাচোরা অক্ষরেরা একে অপরের গা বেয়ে উঠছে নামছে, ক্রমশ এক বিন্দুতে এসে মিলে গিয়ে তৈরি করছে শব্দের আক্ষরিক কায়া। সাহিত্যের মূল কথাও তো তা-ই, মনে অবিন্যস্ত অক্ষরের পাতায় বিন্যাসের রূপ নেওয়া।

এ ভাবে শুরু থেকেই ফ্রান্সের প্যাভিলিয়ন বদলে যাওয়া সময় আর প্রযুক্তিকে দুই হাতে ধরে রেখে বইমেলার মেজাজ আর সাহিত্যের মূল্যবোধটিকে মনে গেঁথে দেয়। আর ভিতরে পা রাখলে?

তখন বিশুদ্ধ বিস্ময় ছাড়া আর কিছুই অনুভবে আসে না। কেন না, প্রথম কক্ষটি থেকেই প্রযুক্তি তার মায়াজালে বেঁধে ফেলতে থাকে অস্তিত্বকে।

এই জায়গায় এসে না বললেই নয়- এবারে ফ্রান্সের প্যাভিলিয়নটি বিন্যস্ত হয়েছে তিনটি কক্ষে। প্রথম কক্ষে রয়েছে সাহিত্য এবং সংস্কৃতির নির্যাস, দ্বিতীয়টিতে কারিগরির দুনিয়া আর তৃতীয়টিতে রস ও রসনার যুগলবন্দি। তিনটিই অননুভূত অভিজ্ঞতা নিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পাঠককে, দর্শককে।

প্যাভিলিয়নের প্রথম কক্ষে পা রেখেই তাই চমকে উঠতে হয়। চোখে পড়ে, শূন্য থেকে পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে, আলপনার মতো চক্রাকারে ঘুরছে লেখারা। ফরাসি এবং ভারতীয়- অনেকগুলি লিপিতে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছে তারা। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না- ভারতীয় অভ্যর্থনার মেজাজকে অক্ষুণ্ণ রেখেই ফরাসি সংস্কৃতি নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে তার খাতে।

সেই খাতে অতীতের উদয় শঙ্করের ফরাসি নৃত্যসঙ্গিনী সিমকি যেমন রয়েছেন, তেমনই বাদ যায়নি হালফিলের বলিউডের ‘বেফিকরে’-ও। প্রথম এই কক্ষটিতে বিশেষ করে চোখ টানবে টেবিলে রাখা একটি বই, যার পাতা উল্টালেই সেন্সর প্রযুক্তিতে ছবিরা জীবন্ত হয়ে উঠবে দেওয়ালে। প্রথম কক্ষ লাগোয়া আরও একটি কক্ষে পা রাখলেই পর্দায় দেখা যাবে নিজেকে, দুই পাশ থেকে তখন সঙ্গ দেবে ভার্চুয়াল দুনিয়া।

দ্বিতীয় কক্ষে রয়েছে ফরাসি দেশের নানা কারিগরি দিক এবং পণ্ডিচেরি-চন্দননগর-চণ্ডীগড়ের সূত্রে দুই দেশের নানা পরিকাঠামোর বিন্যাস। এই কক্ষেও রয়েছে এমন একটি স্থান, যেখানে পা রাখলে ফের পর্দায় নিজেকে দেখার পালা, মাথার উপরে, দুই পাশে বিমানের উড়ে যাওয়ার অতুলনীয় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নেওয়া। যা আরও জীবন্ত করে তুলবে শব্দ প্রক্ষেপণের কুশলতা।

তিন নম্বর কক্ষটির দেওয়ালে মজার নানা খেলার মধ্যে দিয়ে চিনে নেওয়া যাবে, শিখে নেওয়া যাবে ফরাসি হেঁশেলের খুঁটিনাটি। যার নির্মাণে ভারতীয় টিফিন কৌটোর ব্যবহার চোখকে আরাম দেবে। কিন্তু পর মুহূর্তেই বিস্ময়ের অভিঘাতে সচকিত হওয়ার পালা। কেন না চূড়ান্ত উপহার হিসাবে তিন দিক ঘেরা পর্দায় চলতে থাকবে ভারত আর ফ্রান্সের মৈত্রীর স্বরূপটি বুঝে নেওয়ার ছায়াছবি। রাজস্থানি লোকসঙ্গীতের সুরে, ফরাসি নির্মাণের ছবিতে যা আপ্লুত করার পক্ষে যথেষ্ট।

আন্তর্জাতিক তকমা পেলেও এই শহরের বইমেলা এমন বিস্ময় আগে কখনই অনুভব করেনি!

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here