ডাক্তারের চেম্বার থেকে: শিশুর মনোজগৎ

0
323

ডাঃ ভার্গবী চ্যাটার্জি ভট্টাচার্য (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ)

আমাদের চেম্বারে প্রায়ই বাবা আর মা নিয়ে আসেন তাঁদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাঁদের অভাব অভিযোগের অন্ত নেই। মাঝেমাঝে মনে হয় তাঁরা যেন মুদি দোকানে এসেছেন ফিরিস্তি নিয়ে। এই এই তাঁদের অসুবিধে, এইগুলো ঠিক করে দিতে হবে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, কেন মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের বুঝতে চাইছেন না। তারা তো যন্ত্র নয় যে শুধু টিউশন আর স্কুলের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে আর বাবা-মার মন মতো রেজাল্ট করবে। তারাও মানুষ, তাদেরও সুখ দুঃখ আছে, মন আছে, আছে নিজস্ব জগৎ। কেউ সেই জগতে পা রাখতে চায় না। মা বাবারা চান, ছেলেমেয়ে তাঁদের ইচ্ছে মতো চলুক, তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করুক।

অথচ শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর পৃথিবী। তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখা এক অপার্থিব অনুভূতি। শিশুকে বুঝতে গেলে প্রথমে সেই চোখটা তৈরি করতে হবে। আসুন দেখি কেমন করে শিশুর মানসিক বিকাশ হয়।

আরও পড়ুন: ডাক্তারের চেম্বার থেকে: শিশুর ঠিক যত্ন নিন

প্রথমে আসি মনের জন্ম প্রসঙ্গে। ইংরেজিতে একে বলে ‘Theory of Mind’ বা মনের তত্ত্ব। আমরা কিন্তু মন নিয়ে জন্মাই না। চার-পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে আমাদের মন জন্মায়। সেইসময় আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তা জগৎ আছে। আমার মন বা আমার চিন্তা, তোমার মন বা তোমার চিন্তা থেকে আলাদা। মন জন্মেছে কিনা বুঝতে গেলে যে পরীক্ষা করা হয়, তার নাম স্যালি অ্যান টেস্ট (Sally Anne Test)

স্যালি অ্যান টেস্টে দুটো পুতুল থাকে। একজনের নাম স্যালি, আরেকজনের নাম অ্যান। স্যালির একটা ঝুড়ি আছে আর অ্যানের আছে বাক্স। স্যালি ঝুড়িতে বল রেখে বাইরে গেল অল্প সময়ের জন্য। এই ফাঁকে অ্যান দুষ্টুমি করে স্যালির ঝুড়ি থেকে বলটা বের করে নিজের বাক্সে পুরে ফেলল। আচ্ছা, এখন স্যালি এসে কোথায় খুঁজবে বল? যে শিশুর মন জন্মেছে, সে বুঝতে পারবে যে স্যালি জানে না যে অ্যান বলটি লুকিয়ে রেখেছে তার নিজের বাক্সের মধ্যে। কাজেই বল খুঁজবে সে তার নিজের ঝুড়িতেই। আর যে শিশুর মন জন্মায়নি, সে তো নিজে জানে যে বলটা আছে বাক্সের মধ্যে, ঝুড়িতে নয়। তার মনে হয় যে সে যা জানে স্যালিও তাই জানে। কাজেই সে উত্তর দেবে, কেন স্যালি এসে বাক্সে খুঁজবে। সেখানেই তো আছে বলটা।

ধাপে ধাপে শিশুর মনের বিকাশ ঘটে। একদম ছোট্টো শিশু ‘টুকি’ জানে না। সামনে যে আছে সে আছে, যে নেই সে নেই। তাই ‘এই আছে, এই নেই’ খুব মজা লাগে তাদের। শিশুর সামনে খেলনা থাকলে, সে খেলনা ধরতে যায়। খেলনা লুকিয়ে ফেললে আর খোঁজ করে না খেলনার। কারণ তাদের জগতে যা চোখে দেখা যায়, তার বাইরে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। যেই সে একটু বড়ো হয়, তখন সে বুঝতে শেখে যে কোনো জিনিস ওরকম হঠাৎ নেই হয়ে যায় না। তখন সে লুকোনো জিনিস খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে।

শিশুদের পৃথিবী, বড়োদের পৃথিবী থেকে অনেক আলাদা। সেখানে সবার প্রাণ আছে। একে বলে অ্যানিমিজম (animism)। মানুষের মতো কথা বলে শেয়াল পণ্ডিত, বাঘমামা, টুনটুনি। শুধু বাংলার টুনটুনির বই নয়, ইংরাজি গল্পেও শেয়াল, মুরগি, ভালুক- এরা মানুষের ভাষায় কথা বলে। রুশ, চিন, জাপান সব দেশের উপকথাতে জন্তুজানোয়ার মানুষের মতো ঘরসংসার করে। সব দেশের শিশুরাই তো এক।


বাচ্চার সঙ্গে মা-বাবার মানসিক যোগসূত্র তৈরি হওয়াটা ভীষণ জরুরি। বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য, এটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আর বাবা-মায়ের জন্যও এটা দরকার। হঠাৎ একদিন দেখবেন, ‘এই যে আমার ছোট্ট মেয়ে, রইল নাকো ছোট্ট আর’।


শুধু অ্যানিমিজম নয়, বাচ্চাদের জগতে সবকিছুর কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। আকাশের চাঁদ আমাদের সঙ্গে পথ চলে, এসে পৌঁছয় আমাদের বাড়িতে। নদী বয়ে যায় নদীর দুধার সুন্দর করবে বলে। মাটিতে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে মনে হয় মাটি ইচ্ছে করে ব্যথা দিয়েছে। তাই মাটিকে বকুনি দিলে বা মারলে, বাচাদের খুব আনন্দ হয়। বাচ্চার দোষ নয়, দোষ মাটির, তাই তো সে বকুনি খেয়েছে।

ছোট্ট ছোট্ট প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয় বাচ্চারা। যদি কোথাও পাঁচটি ছেলে আর তিনটি মেয়ে থাকে, বাচ্চাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যে বল দেখি এখানে বেশি ছেলে আছে না বেশি বাচ্চা আছে- চট করে মুখে উত্তর যোগায় না তাদের। একজন মানুষও আবার ছেলেও??  যদি ছোটো গ্লাস থেকে লম্বা সরু গ্লাসে জল ঢেলে জিজ্ঞাসা করা হয় যে কোন গ্লাসে জল বেশি, বাচ্চারা সঙ্গে সঙ্গে বলবে: কেন লম্বা গ্লাসে বেশি  জল। ছোটো গ্লাস থেকে লম্বা গ্লাসে জল ঢাললে জলটা যে ‘বেড়ে’ যায় না, এ কথা বাচ্চাদের বোঝানো মুশকিল।

আরও পড়ুন: ডাক্তারের চেম্বার থেকে: বসন্তে সাবধান

বাচ্চার সঙ্গে মা-বাবার মানসিক যোগসূত্র তৈরি হওয়াটা ভীষণ জরুরি। বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য, এটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আর বাবা-মায়ের জন্যও এটা দরকার। হঠাৎ একদিন দেখবেন, ‘এই যে আমার ছোট্ট মেয়ে, রইল নাকো ছোট্ট আর’। ছেলে মেয়েরা পরিণত বয়সে বাপ মায়ের বন্ধু হয়ে ওঠে। তাই তো সংস্কৃতে একটি উক্তি আছে, “প্রাপ্ত তু ষোড়শে বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ”। অর্থাৎ যোল বছর বয়স হলে ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করা উচিত। ছোটো বয়স থেকেই তাই বাচ্চাকে বুঝতে হবে, তাদের পৃথিবীতে প্রবেশ করে। তারপর আপনার হাত ধরে সে এগিয়ে যাবে অনেক দূরের দিকে।  

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here