ডাক্তারের চেম্বার থেকে: আপৎকালীন চিকিৎসা

0
1182

ডাঃ সৌম্য ডিঙ্গল (আপৎকালীন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ)

হঠাৎ কোনও দুর্ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাতিব্যস্ত বাড়ির সকলে। বয়স্করা অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে শুরু করে দেন  চিকিৎসা। ‘পুড়ে গেছে পেস্ট লাগা। মৌমাছি কামড়িয়েছে চুন লাগা, কেটে গেছে চিনি লাগা, পায়ে চোট লেগেছে চুন হলুদ গরম করে লাগিয়ে দে’। এই সব ঘরোয়া টোটকা অনেক সময়েই উপকারের থেকে অপকার করে বেশি। এর জন্য রয়েছে আপৎকালীন চিকিৎসা। চোটআঘাত বা কেটে পুড়ে গেলে ঘরে বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যাবেন না। কয়েকটি সাধারণ কথা মাথায় রাখবেন-

পুড়ে গেলে

 

মাথায় রাখবেন পেস্ট, ডিমের সাদা অংশ, আলুর রস লাগালে পোড়া জায়গায় উপকার হয়, এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এই সব জিনিস থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কোনো জায়গা পুড়ে গেলে প্রথমেই বেশ খানিকক্ষণ পোড়া জায়গাটি জল দিয়ে ধুতে থাকবেন, ভালো হয় বহমান জলের তলায় পোড়া অংশটি রেখে দিতে পারলে। পোড়া জায়গাটি উন্মুক্ত করে দেবেন। গয়নাগাটি বা শরীরের কোথাও কিছু পড়া বা বাঁধা থাকলে খুলে দেবেন। মাথায় রাখবেন ১০ শতাংশর নীচে আগুনে পোড়ার ক্ষেত্রে আমরা বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করতে পারি। কারণ, তার জন্য কোনো আইভি স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এর বেশি হলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। পোড়ার পরিমাণ ৪০ শতাংশ বা তার বেশি হলে আমরা একে জটিল হিসেবে ধরি। তবে প্রথমেই উচিৎ স্থানীয় কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। তিনিই বিচার করবেন রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিৎ কি না।

কেটে গেলে

রান্নঘরে কাজ করতে গিয়ে হাত পা কেটে যাওয়া নিত্যদিনের সমস্যা। প্রথমেই একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে কাটা স্থানটি চেপে রাখুন। কাটা জাযগাটা উঁচু করে রাখুন। রক্ত বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্কার জল দিয়ে জায়গাটা ধুয়ে নিন। ধোওয়া হয়ে গেলে পাতলা স্তরে অ্যান্টিবায়োটিক মলম দিয়ে ঢেকে দিন। গজ দিয়ে হালকা করে জায়াগটা মুড়ে রাখুন। দিনে একবার করে পরিষ্কার করুন। ব্যথা না কমলে বা জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কেটে যাওয়ার পর আধঘণ্টা চেপে রাখার পর রক্ত বন্ধ না হলে বা ক্ষত ছয় মিলিমিটার পুরু হলে সেলাই প্রয়োজন হতে পারে সে ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যান।

শিশুরা আঘাত পেলে

শিশুরা মাথায় আঘাত পেয়ে সামান্য কেটে গেলে ক্ষত স্থানটি জীবাণুনাশক কোনো তরল দিয়ে পরিষ্কার করে এ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে দিন। অল্প কেটে গেলে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। যদি কাটা স্থান থেকে অল্প অল্প রক্ত বের হয়, হাত দিয়ে ক্ষত স্থানের ওপরে খানিকটা সময় চেপে ধরে রাখুন, রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর কাটা স্থান জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করে এ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে দিন। ক্ষত যদি হাতে হয়, তবে শিশুর হাতটি উঁচু করে রাখুন। এতে তাড়াতাড়ি রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। শিশুর কোথাও সামান্য পুড়ে গেলে পোড়া স্থানে প্রচুর পরিমাণে ঠান্ডা জল ঢালতে থাকুন। এরপর অ্যান্টিবায়েটিক ক্রিম লাগিয়ে দিন। সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার কাপড় কিংবা গজ দিয়ে পোড়া স্থান ঢেকে দিন। পুড়ে ফোসকা পড়ে গেলে ফোসকা গলানো উচিত নয়। অনেকেই পোড়া স্থানে পেস্ট লাগিয়ে দেন। এটা করা উচিত নয়। আঘাত লাগার কারণে শিশুর মাথা যদি খুব বেশি ফুলে ওঠে, বেশি রক্ত পড়তে থাকে, শিশু যদি অজ্ঞান হয়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।  বমি করলে কিংবা নাক, কান, মুখ দিয়ে রক্ত বের হলে, খিঁচুনি হলে দ্রুত নিউরো সার্জনের কাছে বা হাসপাতালে যেখানে নিউরো সার্জারি বিভাগ আছে সেখানে নিয়ে যাওয়া উচিত।

হাড়ে চোট লাগলে

পড়ে গিয়ে বা অন্য কোনোভাবে আঘাতে হাড় ভেঙে যেতে পারে অথবা চোট পেতে পারে। সাধারণত হাড়ে চোট পেলে আশে পাশের মানুষজন সেই জায়গা নিয়ে টানাটানি করতে থাকে, এটি কিন্তু খুবই মারাত্মক ভুল। কারণ, ভাঙা হাড় নড়াচড়া করলে ভাঙা অংশ আশপাশের মাংসপেশী, রক্তনালিকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এতে হাড় ভাঙ্গা পরবর্তী অংশ রক্তশূন্যতার কারণে পচেও যেতে পারে। কোনো কারণে হাড়ে ব্যথা পাওয়ার পর যদি সেটি অনেক ফুলে যায়, নড়াচড়া করলে প্রচণ্ড ব্যথা হলে প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে তার পরামর্শ অনুযায়ী এক্স রে করুন। অনেকে হাড় ভেঙে গেলে বাঁশের চাটাই দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেন। এতে হাতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হাত পচে যেতে পারে।

 

সাপে কামড়ালে

আমাদের দেশে সাপের কামড়ে বিষক্রিয়ায় যত না মানুষ মারা যান তার থেকে অনেক বেশি মানুষ মারা যান ভয়ে। বিষধর সাপের কামড়ের দাগটি চেনা খুব জরুরি। যদি সাপে কামড়ানো জায়গায় প্রায় এক ইঞ্চি ব্যবধানে দাঁতের চিহ্ন দেখা যায়, মাঝে মাঝে কাটা স্থান অনেক স্পষ্ট হয়, এরকম হলে আপনাকে বুঝে নিতে হবে কোনো বিষধর সাপ দংশন করেছে। সাপে কামড়ালে প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। মনে রাখবেন কোনও রকম গুনিন বা ওঝা আপনার রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে

কারও শরীরে বিদ্যুতের তার জড়িয়ে গেলে বা কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে সাথে সাথে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো কারণে সুইচ বন্ধ করতে না পারলে শুকনো কাঠ দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে দিতে হবে। শ্বাসক্রিয়া না চললে কৃত্রিমভাবে শ্বাসকার্য চালাতে হবে।  যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। গলা, বুক, ও কোমরের পোশাক আলগা করে দিতে হবে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here