ডাক্তারের চেম্বার থেকে: গ্লকোমা রোগ নয়, রোগের সমাহার

0
177

সিদ্ধার্থ নিয়োগী, চক্ষু বিশেষজ্ঞ

চোখের সম্পর্কে নতুন করে কোনো সূচনার দরকার পড়ে না। তাই সরাসরি প্রসঙ্গে চলে আসাই যুক্তিযুক্ত। চোখের সমস্যা বিভিন্ন রকম হলেও গ্লকোমাকে বলা যেতেই পারে চোখের সাইলেন্ট কিলার। বর্তমানে বিশ্বে গ্লকোমা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় উপসর্গহীন এই রোগটি যথাসময়ে ধরা না পড়লে চোখের মৃত্যু অনিবার্য। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা গ্লকোমাকে কোনও রোগ না বলে চোখের অসুখের সমাহার (group of eye disease) বলতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন। গ্লকোমা কেন অদৃশ্য এক অসুখ এবং কী করেই বা এই রোগ নিঃশব্দে আপনার চোখে বাসা বাঁধে তা একটু বিশদ করে বলা দরকার। এই অসুখটি তার প্রাথমিক পর্বে প্রায় উপসর্গবিহীন। অগ্রসর হতে থাকে অপটিক নার্ভের দিকে। এই ঘটনার অনিবার্য পরিণতি হল, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর অপটিক নার্ভকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। এক বার ক্ষতি হয়ে গেলে নার্ভটিকে চিকিৎসার দ্বারা আর আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ অজান্তে, কোনও উপসর্গ ছাড়াই গ্লকোমা নীরবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষীণদৃষ্টি থেকে দৃষ্টিহীন করে দেয়। তবে গ্লকোমাজনিত অন্ধত্ব কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নয় একেবারেই।

গ্লকোমা থেকে বাচতে প্রয়োজন বিষদ জ্ঞান প্রয়োজন। প্রথমেই জেনে নিই গ্লোকমার প্রকারভেদ। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে তিন রকম গ্লকোমা দেখা যায় :

বিজ্ঞাপন

১) ওপেন অ্যাঙ্গল গ্লকোমা

২) অ্যাঙ্গল ক্লোজার গ্লকোমা

৩) স্বাভাবিক চাপের বা নর্মাল টেনশন গ্লকোমা

অ্যাঙ্গল ক্লোজার গ্লকোমার অভিঘাত কখনও কখনও সুতীব্র হতে পারে। যার ফলে চোখে প্রবল যন্ত্রণা, নিরন্তর চোখ জ্বালা এবং নিদারুণ মাথা ধরায় রোগী কষ্ট পান। তবে ওপেন অ্যাঙ্গল এবং নর্মাল টেনশন গ্লকোমা মোটামুটি ভাবে উপসর্গবিহীন। কিন্তু প্রশ্ন হল এই রোগ থেকে বাঁচবেন কী করে ?

১.জন্মগত গ্লকোমা ঠেকানোর রাস্তা নেই।

২.প্রাইমারি গ্লকোমার ক্ষেত্রে রক্তের সম্পর্কযুক্ত কোনও আত্মীয়ের যদি এ রোগ থাকে ৪০ বছর বয়সের পর বছরে এক বার চোখের ডাক্তার দেখান।

৩. সেকেন্ডারি গ্লকোমা: যে যে কারণে সেকেন্ডারি গ্লকোমা দেখা দিতে পারে তা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা। চোখ লাল, চুলকানি, জল পড়া, ব্যথা ইত্যাদি হলে তাড়াতাড়ি চোখের ডাক্তার দেখানো। ছানি অপারশনের প্রয়োজন হলে দেরি না করা। চোখে যাতে চোট না লাগে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা, লাগলে তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো।

যদি দেখেন গ্লকোমা হয়েছে তাহলে কী করবেন তাও জেনে রাখা প্রয়োজন:

  • সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা। অনেক সময় ওষুধেই কাজ হয়।
  • চিকিৎসা চলাকালীন কিছু নিয়ম মেনে চলুন। যেমন —
  • মাথা বা চোখে চাপ পড়ে এমন ব্যায়াম করবেন না, বিশেষ করে শীর্ষাসন।
  • জল খাবেন ধীরে ধীরে। এক সঙ্গে এক গ্লাসের বেশি নয়।
  • মানসিক রোগের কিছু ওষুধ চোখে চাপ বাড়াতে পারে। কাজেই এই সব ওষুধ খেতে হলে চোখের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।
  • অজ্ঞান করার ওষুধেও চোখের চাপ বাড়তে পারে। কাজেই অপারেশনের কথা থাকলে অ্যানসথেটিস্টকে রোগের কথা জানিয়ে রাখুন।
  • গ্লকোমাতে অনেক সময় দু’ পাশের দৃষ্টি কমে যায়। সে রকম হলে সাইকেল, স্কুটার চালানো বন্ধ করুন।
  • ওষুধ চলবে সারা জীবন। মানসিক প্রস্তুতি নিন।
  • নিয়মিত চোখের ডাক্তার দেখান।
  • ছ’ মাস বাদে বাদে ভিস্যুয়াল ফিল্ড টেস্টিং করতে ভুলবেন না।

মনে রাখতে হবে চিকিৎসা চালালে এই রোগ আয়ত্তে থাকে। কিন্তু ক্ষতি যা হয়ে গেছে তা আর ঠিক করা যায় না। কাজেই দ্রুত রোগ নির্ণয় জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে একটি প্রকল্প নিয়েছে ভিশন ২০-২০। এই প্রকল্পে বলা হয়েছে যে যেসব রোগ গুলি অন্ধত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ২০-২০ সালের মধ্যে সেগুলিকে বিশ্ব থেকে নির্মুল করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরই।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here