সুন্দরবনে বাঘ আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাসন্তীর সোসাইটি

0

পাপিয়া মিত্র:

এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপ, বাদাবনের ফিসফাস ‘বড়ো মিঞা’, ‘বড়ো শিয়াল’, কখনও বা দক্ষিণ রায়। অসংখ্য দ্বীপ আর খাঁড়িতে ভরা সুন্দরবনে মানুষবসতি আর ‘তার’ রাজ্যপাট পাশাপাশি। তাই এক একটা বসতি শুধুই হাহাকারে পূর্ণ।

মনে করা যাক ২০১৪ সাল। বাসন্তী হাইস্কুলের এক শিক্ষক গোসাবা বালি দ্বীপের এক স্কুলে গিয়েছিলেন। স্কুলের পাশেই একটি গ্রামে তখন হুলস্থুল অবস্থা। পরিবারের প্রধানকে নিয়ে গিয়েছে বাঘে, ঘন ঘন মুর্চ্ছা যাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী। ছোটো ছোটো তিন ছেলেমেয়ের আর্তনাদ আজও ভুলতে পারেননি শিক্ষক অমল নায়েক। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ওখানেই রয়েছে ৫০টি পরিবার যাদের কর্তারা মধু-কাঁকড়া-মাছের খোঁজে বাদায় গিয়ে আর ফিরে আসেননি। আর এর চেয়েও বেশি সংখ্যক পরিবার আছে, যেখানে বাঘে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি। কারও মাথার এক দিকে খোবলানো, তো কারও থাইয়ের মাংস নেই, কারও বা পিঠে আঁচড়। ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা শোনাতে শোনাতে বললেন ওই শিক্ষক, “তখনই ঠিক করি, এঁদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। আমার ও স্ত্রীর বেতনের কিছু অংশ দিয়ে শুরু করলাম প্রথম কাজ। ৭০-৮০ জন মা-কে সাহায্য করলাম।”

বিজ্ঞাপন

গোসাবার আমলামেথির স্কুলটি প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এখান থেকেই শুরু হল শিক্ষাপাঠের সরঞ্জাম দেওয়া ও সন্তানদের স্কুলমুখী করা। এ সব করতে গিয়ে দেখলেন সংসারগুলির নিরন্নতার ছবি। বড়ো মিঞার মতো চুপি চুপি হাজিরা নয় উপোষী দিনের। উপোষী দিন রোজকার ছবি। পরনের ছিন্ন বস্ত্রে মায়েদের লজ্জা নিবারণ দায় হয়ে পড়েছে। প্রায় এক বছর নিজেই সামলে দিলেন মাস্টারমশাই। কিন্তু খোঁজ শুরু আরও। তালিকা লম্বা হল – ঝড়খালি, লাহিড়ীপুর, জেমসপুর, সাতজেলিয়া, দয়াপুর, নেতিধোপানী, ত্রিদিবনগর, সর্দারপাড়া, বাগমারি – আরও কত নাম। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াইশোর মতো পরিবার। খোঁজ চলেছে আরও। বিস্তীর্ণ জায়গা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে গ্রাম। সেগুলিকে এক করা মুখের কথা নয়। ২০১৫ সাল থেকে ভাবনা শুরু হল অন্য রকম। টানা এক বছর স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, এ কাজ একার পক্ষে সম্ভব নয়। তখনই ডাক উঠল – সেভ টাইগার অ্যাফেকটেড ফ্যামিলি। যদি বন্ধু হও, পাশে দাঁড়াও। অমলবাবুর ডাক বৃথা হয়নি। সুন্দরবনকে আন্দোলিত করতে পেরেছে।

ঝড়খালির বাগমারির উঠোনে ২৬ মার্চ দুপুর একটায় একে একে জড়ো হতে থাকেন সাবিত্রী-উষা-গীতা-পুতুল-মালতি মায়েরা। কারওর কাঁখে শিশুকন্যা, কেউ বা ছেলের হাত ধরে। একে একে হাতে নেন মশারি-শাড়ি-জামা-লেখাপড়ার সরঞ্জাম-খাদ্যসামগ্রী-অর্থ। বছরে এক বার নয়, যখন যেমন প্রয়োজন পাশে থাকেন ‘সেভ টাইগার অ্যাফেকটেড ফ্যামিলি’ বা স্টাফ-এর প্রতিনিধিরা। নিজের সংস্থা ‘চম্পা মহিলা সোসাইটির’ কাজের জন্য অমলবাবু পাশে পেয়েছেন ‘তরুণতীর্থ’-এর সদস্যদের। পাশে পেয়েছেন নিজের স্কুলের ১৫ জন শিক্ষককে। পেয়েছেন কিছু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাকে। তবে শুধু বন্ধু হলেই চলবে না, বার্ষিক ৫০০ টাকা ‘স্টাফ’ তহবিলে জমা দিতে হবে। এ ডাক-ও বৃথা যায়নি।

সাহায্য নিতে আসা মায়েদের মুখে নানা কথা। কথা ছাপিয়ে আসে জল। মোহনার নোনা জল আর চোখের জল একাকার। মাতলা, বিদ্যাধরী, গোমর, হেড়োভাঙার জল আজ মায়েদের চোখে। চামটা, দোবাঁকি, হলদিবাড়ি, হেড়োভাঙার জঙ্গল আজ মায়েদের দুঃস্বপ্নের রাত-দিন-দুপুর। কেউ ভাত চেয়ে স্নান করতে গেছেন, কেউ ভাত খেয়ে দুপুরে নৌকায় বসে জাল বুনতে গেছেন, কেউ বা বনবিবির পুজো সেরে দল নিয়ে ভোর রাতে জঙ্গলে পা ফেলেছেন মধু নিতে। আর ফেরেননি। তবে ভাগ্যবান কয়েক জন ফিরে এসেছেন শরীরের কিছু কিছু দক্ষিণ রায়কে দক্ষিণা দিয়ে।

অমল নায়েক সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত তরুণ বয়স থেকেই। পরে খোলেন চম্পা মহিলা সোসাইটি বা আশ্রম। নানা ধরনের সেবামূলক কাজ চালানোর পাশাপাশি চালিয়ে গিয়েছেন শিক্ষকতার কাজ। ভালো করে চিনেছেন সুন্দরবনের মাটি-জলবায়ু। তাই পুষ্টিবাগান করার জন্য মায়েদের হাতে নিয়মিত তুলে দেন নানা ধরনের বীজ, চারাগাছ। এ দিয়ে মায়েরা সবজি ফলাচ্ছেন, নিজেদের খাওয়ার জন্য যেটুকু প্রয়োজন তা রেখে দিয়ে বাকিটা বিক্রি করে সংসারের আর্থিক সুরাহা করছেন।

নিরন্ন সংসারের ছেলেমেয়েরা একটু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতামুখী হয়। তাদের পড়াশোনা ও অন্য কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন অমলবাবু ও তাঁর ‘স্টাফ’-এর প্রতিনিধিরা। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী পড়ছে অমলছায়ায়, তাঁর আশ্রমে বা অন্য স্কুলে। পরীক্ষার ফি দিয়ে তাদের পরীক্ষায় বসারও সুযোগ করে দিচ্ছেন অমলবাবু। আসলে সেই যে ‘সমাজবন্ধু’ শব্দবন্ধটি ছোটোবেলায় শেখা, সেটি মনে হয় ব্যর্থ হয়নি বাসন্তী হাইস্কুলের ইংরিজির শিক্ষক অমলবাবুর জীবনে।          

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here