ফের মালগাড়ির ধাক্কায় হাতির মৃত্যু, দায় নিয়ে রেল-বন চাপানউতোর

0
240
killed elephant

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: প্রবাদ আছে, “রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”। যদিও এখানে প্রাণটা উলুখাগড়ার নয়, একটি বিশালাকার হাতির। ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মৃত্যুর ট্র্যাডিশন চলছেই। সঙ্গে চলছে রেল ও বন দফতরের মধ্য বাগযুদ্ধ।

যেমন রবিবার রাতে ফের মালগাড়ির ধাক্কায় মৃত্যু হল একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতির। ডুয়ার্সের চাপড়ামারি অভয়ারণ্যের পানঝোরা বিটের ঘটনা। ঘটনার পরই কার দোষ তা নিয়ে রেল ও বন দফতরের মধ্যে ফের শুরু হয়ে গিয়েছে চাপানউতোর ।

জলপাইগুড়ির চাপড়ামারি অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে আলিপুদুয়ার পর্যন্ত রেলপথ। এর মধ্যে অনেক জায়গাই হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণী চলাচলের করিডর। প্রায় প্রতি দিন রাতেই হাতি বা হাতির দল রেললাইন পার হয়ে বনাঞ্চলের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করে। রবিবার রাত সাড়ে নটা নাগাদ একটি পুরুষ হাতি লাইন পার হচ্ছিল। সেই সময় আলিপুরদুয়ার থেকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনগামী একটি মালগাড়ি আসছিল। তার ইঞ্জিন ধাক্কা মারে ওই পুরুষ হাতিটিকে। ধাক্কার তীব্রতা এতই ছিল যে হাতির দেহটি ইঞ্জিনের ভেতর ঢুকে যায়। সেখানেই মৃত্যু হয় তার। খবর পেয়ে রেল এবং বন দফতরের আধিকারিকরা আসেন ঘটনাস্থলে। ভোররাতে ইঞ্জিনের ভেতরে থাকা হাতির দেহটিকে কেটে বের করা হয়।

the spot where the goods train knocked down the elephant
সেই জায়গা, যেখানে মালগাড়ি ধাক্কা দেয় হাতিটিকে।
বিজ্ঞাপন

ঘটনার পরই উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন। যেখানে বনাঞ্চলের মধ্যে ট্রেনের গতিবেগ বেঁধে দেওয়া আছে, লাইনে হাতি থাকলে চালককে সতর্ক করার ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে কেন বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে পশু ও পরিবেশপ্রেমী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি। নেচার অ্যাণ্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র অনিমেষ বসুর অভিযোগ, দুই দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই বারবার এই ঘটনা ঘটছে। পরিবেশকর্মী স্বরুপ মণ্ডল অভিযোগ করেছেন, এই নিয়ে বারংবার দুই দফতর আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিচ্ছুই হচ্ছে না।

যদিও আজকের ঘটনায় রেলের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছে বন দফতর। রাজ্য বন দফতরের সাম্মানিক ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন সীমা চৌধুরীর অভিযোগ, ট্রেনের গতিবেগ বেশি থাকার জন্যই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাঁর আরও অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর বনকর্মীরা আসার আগেই ট্রেনের কর্মীরা বিদ্যুতের তার দিয়ে বেঁধে হাতির দেহটিকে যে ভাবে বের করার চেষ্টা করেছে তা নিন্দনীয়। রেলের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাজ্যের বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মণ জানিয়েছেন, এটি রেলেরই গাফিলতি। ফের এই বিষয়ে রেল মন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলা হবে জানিয়েছেন তিনি। যদিও উত্তর-পূর্ব রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক প্রণবজ্যোতি শর্মা জানিয়েছেন, মালগাড়িটি তার বেঁধে দেওয়া গতিবেগেই চলছিল। কিন্তু রাতের বনাঞ্চলে ঘন কুয়াশার জন্য লাইনের ওপর হঠাৎ চলে আসা হাতিটিকে চালক দেখতে পাননি।

দিনকয়েক আগে জলপাইগুড়ি এসে ভারতীয় রেলের ইস্টার্ন জোনের চিফ কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি শৈলেশ কুমার পাঠক জানিয়েছিলেন, শুধু ডুয়ার্স নয়, গোটা দেশেই ট্রেনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যু একটা বড়ো সমস্যা। তা রুখতে বন দফতরের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদিও পরিসংখ্যান বলছে ২০০৪ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত শুধু ডুয়ার্সেই ট্রেনের ধাক্কায় ৬০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বন্যপ্রাণীর মৃত্যুও ঘটেছে। কিছু দিন আগে অসমের শোণিতপুরে ট্রেনের ধাক্কায় মারা গিয়েছিল ছয়টি হাতি। তার পর রবিবারের এই ঘটনা, যা প্রমাণ করল রেল বা বন দফতর যে ব্যবস্থা নিচ্ছে তা কার্যকর হচ্ছে না। কবে কী ভাবে তা কার্যকর হবে এবং বন্যপ্রাণ মৃত্যুর ট্র‍্যাডিশন বন্ধ হবে নেই তার কোনো সদুত্তরও ।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here