শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর সত্য চৌধুরীকে

0
3656
remembrance of satya chowdhury
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

আধুনিক গানের প্রচলিত সুরের সমুদ্রে সপাটে ধাক্কা দিল এক নবীন শিল্পী। গায়কীতে এমন মাদকতা আগে শোনা গিয়েছে বলে তেমন মনে হয়নি সেই সময়ের শ্রোতাদের। পুজোবাজারের আকাশে ছড়িয়ে গেল ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’, রেকর্ড নম্বর এন-২৭৫৪৩। এখানেই শেষ নয়। ঠিক শুরু বলা যেতে পারে। অবাংলাভাষীরা অবাক হয়ে শোনে সেই গান। তাদের চাহিদামতো কমল দাশগুপ্তের সুরে, সত্য চৌধুরীর কণ্ঠে সেই গান শোনা গেল, অনুবাদক অমরনাথ। কথক বেতারের সহকর্মী ঘোষক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি শিশির মঞ্চের প্রেক্ষাগৃহে ছড়িয়ে গেল ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’। উপহার মিলল সত্য চৌধুরীর সকন্ঠের নানা ধারার গান।

কলকাতায় ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে শিশির মঞ্চের গেটের বাইরে বেশ ভিড়, লম্বা লাইন। ষাটোর্ধ্ব মানুষ ও লাঠি-নির্ভর মানুষদের একে একে প্রেক্ষাগৃহে আসন নিতে দেখে মনে হল কলকাতার মানুষ সংস্কৃতির দাম দিতে জানে। শতবর্ষে একবার ফিরে তাকানো। যাঁরা শুনেছেন শিল্পীর গান, তাঁরা ঘরে বসে থাকতে পারেননি। ভরাট আসনে যে কোনো পরিবেশনাই অন্য মাত্রা পায়। শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে কথায় ও গানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালেন মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় ও গানের ভাণ্ডারী সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়।

satya chowdhuryসুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহ থেকে গ্রামোফোন রেকর্ডে শোনা গেল ১৯৩৭-র প্রথম রেকর্ড অনুপম ঘটকের সুরে ও বিমল মিত্রের কথায় ‘নতুন চাঁদের তিথি এল আকাশে’ গানটি। মিহিরবাবু বলে চলেছেন আপাত গম্ভীর অথচ অসম্ভব রসিক সত্য চৌধুরীর নানা কথা। ‘ভালো যদি লেগে থাকে আমার এ গানখানি’র মতো আধুনিক গানের পাশাপাশি গেয়েছেন ভক্তিগীতি, লোকগীতি, কীর্তন, ভজন, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতি। অনেক কথার স্রোত। কাজী নজরুল নিজে গান শিখিয়েছেন সত্যকে। একটি নজরুলগীতির কথা জানানো অবশ্য প্রয়োজন। ১৯৩৭-এর ১০মে, তৎকালীন বেতার প্রযোজক সুরেশ চক্রবর্তীর পরিচালনায় সত্য গাইলেন ‘কে তোরে কী বলেছে মা, ঘুরে বেড়াস এলো চুলে’। গানটি শুনেছেন বাবা যতীন্দ্রমোহন চৌধুরী। মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দরজায়। দেখা পাওয়া মাত্রই পরিয়ে দিয়েছিলেন গলায়। ওকালতি জীবন না বেছে নাও বাইলেন সুরের জগতে। তাই ক্ষুব্ধ পিতার প্রশয় ছিল না, তবে অনুমোদন ছিল প্রচ্ছন্ন।

কথা আর সুরের সাগরে ডুব দিয়েছেন শ্রোতারা। কৃষ্ণচন্দ্র দের কীর্তন শুনে সত্য চৌধুরীর ভক্তিমূলক গানে প্রবেশ। মা বিমলাদেবীর সঙ্গে ‘সীতা’ নাটক দেখতে গিয়ে মন দিয়ে শুনেছিলেন ‘গেঁথেছি এ ফুলের মালা’ গানটি। দ্বারস্থ হলেন গীতিকার শৈলেন রায়ের। পরে নিতাই ঘটকের পরিচালনায় গাইলেন ‘শুনালো তোরা, শুনালো কৃষ্ণকথা’। কাজী নজরুলের দরজায় যে দিন দাঁড়িয়েছিলেন সত্য, সে দিন তাকে ডেকে একটি খাতা এগিয়ে দেন। যে পাতাটি সত্য নিজে খুলেছিলেন দেখেছিলেন ‘ঘুমায়ে রয়েছে রজনীগন্ধা বনের বিধবা মেয়ে’ গানটি লেখা হয়ে গিয়েছে। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে যখন কলকাতা বেতারে অনুরোধের আসরের স্থায়ী সূচনা হল তখন কিছু দিনের মধ্যেই একটি সিগনেচার সং-এর কথা উঠল। গোপেন মল্লিকের সুরে সত্য চৌধুরী গাইলেন ‘তোমারে যে গান শোনাব’। স্মৃতিচারণ করলেন আরও এক সহকর্মী বাচিকশিল্পী পার্থ ঘোষ। কথায় শ্রদ্ধা জানালেন নির্বেদ রায় ও সৈকত মিত্র।

dwijen mukhopadhyay
প্রদীপ প্রজ্বলনে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবীণ শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সত্য চৌধুরীর গান পরিবেশন করেন শম্পা কুণ্ডু, দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অলক রায়চৌধুরী, নূপুরছন্দা ঘোষ। অনুষ্ঠানে পরম পাওয়া সত্য চৌধুরীর দুই ছাত্রছাত্রীকে। লিপিকা হালদার পরিবেশন করেন ‘পথে পথে ওই বকুল পড়িছে ঝরিয়া’ ও বিমল চক্রবর্তী নিবেদন করেন ‘ভালো যদি লেগে থাকে’ গানটি। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিবেশন করেন দেবাশিস বসু।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here